কান্টের শান্তির দর্শন: একটি বৈশ্বিক সম্প্রীতির রূপরেখা

বাংলাদেশ বর্তমানে এক সংকটময় কাল অতিক্রম করছে, যেখানে একদিকে গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারের প্রচেষ্টা চলছে, অন্যদিকে দেশের সবচেয়ে বড় প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক ক্রমশ অবনতির দিকে যাচ্ছে। সম্পর্ক এতটাই অবনতি ঘটেছে যে, বাংলাদেশে কিছু মহল যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।

সংস্কার কার্যক্রমের অংশ হিসেবে, বর্তমান সরকার নতুন একটি সংবিধান প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে, যা প্রধানমন্ত্রী, রাষ্ট্রপতি, সংসদ, নির্বাহী এবং বিচার বিভাগের মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য নিশ্চিত করতে এবং আইনসভার সামগ্রিক কাঠামো নির্ধারণ করতে সহায়তা করবে। একই সময়ে, বিশ্ব বর্তমানে গাজায় এবং ইউক্রেনে দুটি বড় সংঘাত প্রত্যক্ষ করছে, যা কোন না কোনভাবে বিশ্বব্যাপী মানুষের ওপর প্রভাব ফেলছে।

এই প্রেক্ষাপটে, হঠাৎ করেই ইমানুয়েল কান্টের শান্তির দর্শনের কথা মনে পড়ল এবং তৃতীয়বারের মতো তাঁর গুরুত্বপূর্ণ রচনা, ‘Perpetual Peace: A Philosophical Sketch (1795)’ পড়তে শুরু করলাম। Perpetual Peace: A Philosophical Sketch (1795) রাজনৈতিক দর্শনের ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ, যা বিভিন্ন দেশের মধ্যে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য একটি কাঠামো প্রদান করে। এই বইয়ে কান্ট যুদ্ধ এড়ানোর ও বৈশ্বিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবহারিক ও নৈতিক নির্দেশনা উপস্থাপন করেছেন। পশ্চিমা আধুনিক দর্শনের প্রভাবশালী দার্শনিক কান্ট ১৭২৪ সালে জন্মগ্রহণ করেন এবং একাধিক যুদ্ধ প্রত্যক্ষ করেছেন। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, ভবিষ্যতেও যুদ্ধ অনিবার্য। এমন আশঙ্কাই সম্ভবত তাঁকে যুদ্ধ সম্পর্কিত তত্ত্ব এবং তা প্রতিরোধের জন্য বাস্তবসম্মত ব্যবস্থা প্রস্তাব করতে উদ্বুদ্ধ করেছিল।

বইটিতে, কান্ট এমন সব ধারণা উপস্থাপন করেছেন যা পরবর্তীতে গণতান্ত্রিক শান্তির, বাণিজ্যিক শান্তির এবং প্রাতিষ্ঠানিক শান্তির সাথে যুক্ত হয়েছে। তাঁর বইটি আধুনিক গণতান্ত্রিক শান্তিতত্ত্বের সাথে মিল খুঁজে বের করে, কারণ তিনি প্রজাতন্ত্রী রাষ্ট্রগুলি নিয়ে আলোচনা করেন, যাকে তিনি আইনসভা এবং নির্বাহী বিভাগের মধ্যে ক্ষমতার বিভাজনসহ প্রতিনিধিত্বমূলক সরকার হিসাবে সংজ্ঞায়িত করেন। কান্ট যুক্তি দেন, প্রজাতন্ত্রগুলি স্বাভাবিকভাবেই একে অপরের সাথে শান্তিতে থাকবে, কারণ অন্যান্য ধরণের সরকারের তুলনায় তাদের শান্তিবাদের প্রতি বেশি ঝোঁক থাকে। তবে, কান্ট এ-ও বলেন যে, কেবল প্রজাতন্ত্রী সরকারই স্থায়ী শান্তি নিশ্চিত করতে পারে না। সার্বজনীন উদারতার ও বন্ধুত্বের নীতিতে গঠিত মুক্ত রাষ্ট্রের ফেডারেশন চিরস্থায়ী শান্তিতে পৌঁছাতে পারে, কিন্তু তার জন্য কিছু শর্ত পুরণ করতে হবে। এই সব শর্তেরই একটি রূপরেখা প্রফেসর কান্ট দিয়েছেন তাঁর ‘পাপেচুয়াল পিস’ তথা ‘চিরস্থায়ী শান্তি’ শীর্ষক বইয়ে, যা দর্শনশাস্ত্রে  ছয়-দফা কর্মসূচি হিসেবে খ্যাত।

এই ছয়টি নীতি নিম্নরূপ:

১) গোপন চুক্তি নয়: কান্ট জাতিগুলোর মধ্যে প্রতারণা এবং অবিশ্বাস রোধে আন্তর্জাতিক চুক্তিতে স্বচ্ছতার প্রয়োজনীয়তার উপর জোর দেন।

২) স্থায়ী সেনাবাহিনী নয়: তিনি স্থায়ী সামরিক বাহিনী বিলুপ্তির পক্ষে যুক্তি দেন; বলেন,  তাদের সেনাবাহিনীর অস্তিত্ব, শান্তির জন্য একটি স্থায়ী হুমকি সৃষ্টি করে এবং সংঘাতের সম্ভাবনাকে উসকে দেয়।

৩) সামরিক উদ্দেশ্যে জাতীয় ঋণ নয়: যুদ্ধের অর্থায়নের জন্য জাতিগুলোর ঋণ নেওয়া এড়িয়ে চলা উচিত, কারণ এটি অর্থনৈতিক শোষণ এবং দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতকে উৎসাহিত করে।

৪) অন্যান্য রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ নয়: জাতীয় সার্বভৌমত্বকে সম্মান করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ; শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলোকে অন্যদের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করা থেকে বিরত থাকতে হবে।

৫) ভবিষ্যতের আস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে এমন কোনও শত্রুতামূলক কাজ নয়: জাতিগুলোকে এমন কর্মকাণ্ড এড়িয়ে চলতে হবে, যা আস্থা নষ্ট করে এবং ভবিষ্যতের শান্তি আলোচনাকে বাধাগ্রস্ত করে।

৬) জোরপূর্বক সংযুক্তি নয়: বলপ্রয়োগের মাধ্যমে আঞ্চলিক সম্প্রসারণ অন্যায্য এবং আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার জন্য এটি নিষিদ্ধ করা উচিত।

ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের প্রেক্ষাপটে এই নীতিগুলি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। উদাহরণস্বরূপ, দুই দেশের মধ্যে কিছু চুক্তি গোপনীয়তার সাথে সম্পাদিত হয়েছিল, যার ফলে জনসাধারণের মধ্যে ব্যাপক অবিশ্বাস তৈরি হয়েছিল। স্বচ্ছতার এই অভাব ভারত ও বাংলাদেশ— উভয় সরকারের বিরুদ্ধেই ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। হাসিনা সরকার অপ্রয়োজনীয় মিগ-২৯ যুদ্ধবিমান এবং অন্যান্য সামরিক অস্ত্র কেনার জন্য প্রচুর বিদেশী ঋণ নিয়েছে। বাংলাদেশের এই অবস্থা সরাসরি কান্টের তৃতীয় নীতির সাথে মিলে যায়।

কান্টের চতুর্থ নীতি অর্থাৎ অন্যান্য রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা— আজ বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। ভারত, চীন এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো শক্তিশালী দেশের বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে জড়িত থাকার ফলে দেশের জন্য উল্লেখযোগ্য রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। একইভাবে, কান্টের ষষ্ঠ নীতি, যা জোরপূর্বক দখলের নিন্দা করে, সমসাময়িক ভূ-রাজনৈতিক সংঘাতে উদ্বেগজনক অনুরণন খুঁজে পায়। ইউক্রেনে রাশিয়া্র এবং গাজায় ইসরায়েলের আগ্রাসন প্রমাণ করে, সার্বভৌমত্বের লঙ্ঘন কীভাবে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে পরিণত হতে পারে, ইমানুয়েল কান্ট বহু আগেই তা ভবিষ্যৎ বাণী করে গেছেন। শক্তিশালী রাষ্ট্রের অন্য রাষ্ট্রে হস্তক্ষেপের এবং  আগ্রাসনের পরিণতি সম্পর্কে কান্টের দূরদর্শিতা কল্পণাকেও হার মানায়।

কান্টের শান্তির দর্শন আজকের জটিল ও আন্তঃসংযুক্ত বিশ্বেও অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। কান্ট মানবিক যুক্তিবাদ, স্বায়ত্তশাসন এবং আইনের শাসনের ওপর গুরুত্ব প্রদান ক’রে সমসাময়িক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় এক কালজয়ী কাঠামো মির্মাণ ক’রে গেছেন।  আন্তর্জাতিক সংঘাত নিরসরণে, মানবাধিকার লঙ্ঘন রোধে একটি বিশ্বব্যবস্থা তৈরিতে কান্টের তত্ত্ব প্রয়োগ করা জরুরি। আধুনিক ভূরাজনীতির জটিলতা অতিক্রম করার সময়, কান্টের শান্তিময় বিশ্বব্যবস্থার দৃষ্টিভঙ্গি এখনও একটি ন্যায়সঙ্গত ও সুসামঞ্জস্যপূর্ণ বৈশ্বিক সম্প্রদায় গঠনের প্রচেষ্টাকে অনুপ্রাণিত করে।

ইমানুয়েল কান্টের শান্তির দর্শন জাতিসমূহের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী সম্প্রীতি অর্জনের জন্য একটি গভীর ও স্থায়ী রূপরেখা প্রদান করে। রাজনৈতিক, আইনী এবং নৈতিক উপপাদ্যগুলোকে একত্রিত করে, কান্ট যুক্তিবাদ, স্বায়ত্তশাসন এবং আইনের শাসনের ভিত্তিতে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য একটি বিস্তৃত দিকনির্দেশনা প্রদান করেন। আমরা যখন তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি বাস্তবায়নের প্রচেষ্টা চালাই, তখন মানবজাতির জন্য শান্তি ও ন্যায়বিচার অনুসরণের নৈতিক কর্তব্য আমাদের স্মরণে আসে।

দর্শনশাস্ত্রের প্রভাব মূলত মানুষের মনোজগতেই ক্রিয়াশীল, কিন্তু কান্টের ‘শান্তির দর্শন’-এর প্রভাব বাস্তব জগতেও ব্যাপক এবং একটি শান্তিপূর্ণ পৃথিবী নির্মাণে চিরকালই প্রাসঙ্গিক থাকবে। কান্টের ধারণাগুলো জাতিসংঘের মতো আধুনিক আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর এবং আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকারের মতো ধারণার বৌদ্ধিক ভিত্তি স্থাপন করেছে। স্বাধীন রাষ্ট্রসমূহের একটি ফেডারেশন গঠনের জন্য তাঁর আহ্বান কূটনীতি ও আইনি কাঠামোর মাধ্যমে সংঘাত প্রতিরোধের লক্ষ্যে বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সৃষ্টিতে প্রভাব ফেলেছে।

কান্টের শান্তির দর্শনের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে একটি গভীর নৈতিক বাধ্যবাধকতা। তিনি যুক্তি দেন, শান্তি কেবল একটি বাস্তবসম্মত প্রয়োজনীয়তা নয় বরং একটি নৈতিক কর্তব্য যা প্রত্যেক মানবিকবাদী মানুষের অনুসরণ করা উচিত। শান্তির সন্ধান মানবতার সর্বোচ্চ নৈতিক আদর্শের একটি প্রকাশ, যা ন্যায়বিচার, স্বায়ত্তশাসনের প্রতি শ্রদ্ধা এবং সাধারণ কল্যাণের প্রতি আমাদের প্রতিশ্রুতি প্রতিফলিত করে। কান্টের মতে, চিরস্থায়ী শান্তি অর্জন হল মানব অগ্রগতির চূড়ান্ত লক্ষ্য এবং আমাদের নৈতিক সম্ভাবনার পরিপূর্ণতা।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ঠান্ডা যুদ্ধের সময়ে যখন পারমানবিক যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা দেখা দেয়, তখন বার্ট্রান্ড  রাসেলের  ও  আইনস্টাইনের নেতৃত্বে জিবিত সব নোবেল লরিয়েটসহ অজস্র মানুষ যুদ্ধের বিরুদ্ধে বিশ্ব জনমত গঠনে প্রয়াসী হয়। আর বিংশ শতাব্দীর সাড়া জাগানো অর্থনীতিবিদ জে. এম. কেইন্স ভারসাই চুক্তিতে জার্মানীকে মাত্রারিক্ত শাস্তি দেওয়ার প্রতিবাদ জানিয়ে ইংল্যান্ডের প্রতিনিধি দলের প্রধান আলোচকের পদ থেকে পদত্যাগ করেন এবং ‘দি ইকোনোমিক কনসিকুয়েন্সেজ অফ পিস’ লেখেন । উভয় ক্ষেত্রেই মূল সুর ছিল কান্টের শান্তিবাদের ধারণা।

————————————————————————–

এন এন তরুণ অর্থনীতির অধ্যাপক, ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশ। সাউথ এশিয়া জার্নালের এডিটর অ্যাট লার্জ। nntarun@iub.edu.bd

ভারতের ব্যর্থতা, মিডিয়ার আহাজারি ও বাংলাদেশের হিন্দুদের ক্ষতি

https://www.prothomalo.com/opinion/column/npqrzkr0jq

এটি প্রমাণিত সত্য যে, কৃতজ্ঞতার অনুভূতি চিরস্থায়ী নয়, এবং এই সত্য বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের প্রেক্ষাপটে স্পষ্ট প্রতিভাত। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারতের সমর্থন, সাহায্য, সহযোগিতা, সহমর্মিতা ছিল অতুলনীয়, যা তাদের নিজস্ব সামর্থ্যের সীমা অতিক্রম করেছিল। কারণ এটা করতে গিয়ে তাদের অর্থনীতি ধ্বসে পড়ার উপক্রম হয়েছিল এবং মিসেস গান্ধীকে সংসদের বিরোধী দলের সমলোচনা সহ্য করতে হয়েছিল। ভারত কেবল ১ কোটিরও বেশি শরণার্থীকে আশ্রয়ই দেয় নি, তাদের রক্ষণাবেক্ষণেও মানবিকতা এবং সহানুভূতির অসাধারণ উদাহরণ স্থাপন করেছিল। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ভারতের ৩৯০০ জন সৈন্য প্রাণ হারিয়েছেন এবং দশ হাজার আহত হয়েছে্ন, যাঁদের অনেকেই সারা জীবনের জন্য পঙ্গু হয়ে গিয়েছিলেন।  

এর বিপরীতে, ২০১৭ সাল থেকে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের প্রতি বাংলাদেশের প্রতিক্রিয়া একটি ভিন্ন চিত্র তুলে ধরে। বাংলাদেশ তাদের আশ্রয় দিয়েছে ঠিকই, কিন্তু রোহিঙ্গাদের প্রায়শই অবাঞ্ছিত অতিথি হিসেবে দেখা হয়েছে। এটি বাস্তুচ্যুত জনগোষ্ঠীর প্রতি মনোভাবের একটি স্পষ্ট বৈপরীত্য।

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময়, বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে গভীর বন্ধনের গল্প শোনা যায়। বিশেষ করে, পশ্চিমবঙ্গের হিন্দু মায়েরা মুসলিম শরণার্থী ছেলেদের প্রতি যে মমত্ববোধ ও সহানুভূতি দেখিয়েছেন, তা অবিস্মরণীয়। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘পূর্ব-পশ্চিম’ উপন্যাসে এমন একটি আবেগময় চিত্র চমৎকারভাবে ফুটে উঠেছে।

১৬ই ডিসেম্বরের ঐতিহাসিক দিনে, রমনা রেসকোর্স ময়দানে ভারত-বাংলাদেশ যৌথ বাহিনীর কাছে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর আত্মসমর্পণের অবিস্মরণীয় দৃশ্য এবং ঢাকার মানুষের আনন্দধ্বনি আজও আমাদের স্মৃতিতে অমলিন। মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় সেনাদের প্রতি ঢাকাবাসীর উচ্ছ্বসিত অভ্যর্থনাও ছিল অবর্ণনীয়।

কিন্তু সেই গভীর সংহতি ও কৃতজ্ঞতার অনুভূতি কোথায় হারিয়ে গেল? কেন সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তা মিলিয়ে গেল?

এই ইতিবাচক অনুভূতি ম্লান হওয়ার কারণ প্রতিকী দুটি ঘটনার সাহায্যে ব্যাখ্যা করা যায়: ১৯৭৬ সালের ফারাক্কা লং মার্চ, যার নেতৃত্ব দিয়েছিলেন মওলানা ভাসানী, এবং ২০১১ সালে ১৫ বছরের মেয়ে ফেলানীর মর্মান্তিক মৃত্যু।

ফারাক্কা লং মার্চ ভারতের বিরুদ্ধে নদীর পানির ন্যায্য বণ্টনের ব্যর্থতা নিয়ে ব্যাপক ক্ষোভের প্রতীক ছিল, বিশেষ করে গঙ্গার পানি নিয়ে। এটি বাংলাদেশীদের মধ্যে বঞ্চনার অনুভূতি সৃষ্টি করেছিল। একইভাবে, ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে ফেলানীর হৃদয়বিদারক মৃত্যুর মতো হাজারো বাংলাদেশী অনুপ্রবেশকারী হত্যা—বাংলাদেশীদের মধ্যে রাগ ও অবিশ্বাসকে আরও উসকে দিয়েছে। ফলে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক ক্রমে ক্রমে তিক্ত হয়েছে।

১৯৭০-এর দশকের গোড়ার দিকে, বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর নেতৃত্বে, ভারত অসাধারণ কূটনৈতিক সাফল্য দেখিয়েছিল। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের সৃষ্টি মিসেস গান্ধীর ব্যক্তিগত কারিশমা এবং ভারতের কূটনৈতিক দক্ষতার একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

তবে পরবর্তী সময়ে, বিশেষ করে আই. কে. গুজরালের বামপন্থী জোট সরকারের পরে, ভারতের কূটনৈতিক দক্ষতা হ্রাস পেয়েছে।  ‘গুজরাল ডকট্রিন’, যা পারস্পরিক প্রত্যাশা ছাড়াই প্রতিবেশীদের সঙ্গে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক গড়ার ওপর জোর দেয়, একটি তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল সময়কাল সৃষ্টি করেছিল। দুর্ভাগ্যবশত, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভারতের আঞ্চলিক কূটনীতির এই দক্ষতা হ্রাস পেয়েছে, যা প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে উত্তেজনা এবং ক্ষোভ বাড়িয়েছে।

ভারতে বিজেপির হিন্দুত্ববাদী রাজনৈতিক উত্থান বাংলাদেশে ইসলামী মৌলবাদের উত্থানকে পরোক্ষভাবে উসকে দিয়েছে। তদুপরি, ভারতে মুসলিম সংখ্যালঘুদের প্রতি অপমান, বঞ্চনা, হয়রানি ইত্যাদি বাংলাদেশের হিন্দুদের অবস্থা আরও খারাপ  করেছে। প্রতিবেশী দুই দেশের ক্ষেত্রে এটা হল ঐতিহাসিক এবং সামাজিক-রাজনৈতিক দ্বান্দ্বিকতার নিয়ম। এটা অলংঘনীয়।  

২০১৪ সালে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর থেকে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক সরকারি পর্যায়ে উন্নতি হয়েছে, কিন্তু দুই দেশের জনগণের মধ্যে সম্পর্ক তিক্ত হয়েছে, বাংলাদেশে ভারতবিদ্বেষ ব্যাপকভাবে বেড়েছে। এখানেই ধরা পড়ে ভারতীয় কূটনীতির একটি মৌলিক ত্রুটি, যা গুজরাল পরবর্তী সব সরকারের মধ্যে ছিল এবং তা হলো, জনগণের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত হওয়ার পরিবর্তে শুধু ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলার প্রবণতা।

কংগ্রেস ও বিজেপি— উভয় সরকারই শেখ হাসিনা সরকারের প্রতি অন্ধভাবে সমর্থন জানিয়েছে। গণতান্ত্রিক নীতির ওপর ভিত্তি করে রচিত ভারতীয় সংবিধান কোনো ভারতীয় সরকারকেই অন্য দেশের কোন অগণতান্ত্রিক বা বিশুদ্ধভাবে নির্বাচিত হয় নি এমন কোনো সরকারকে সমর্থন করা অনুমোদন করে না। কিন্তু মোদির বিজেপি সরকার শেখ হাসিনার ক্ষেত্রে তাই করেছে। যদিও তাঁর পুনর্নির্বাচন ব্যাপক কারচুপির কারণে কলঙ্কিত। যখন কোনো সরকার এমন অবৈধাভাবে ক্ষমতায় আসে, তখন তা জনগণের আস্থা হারায়। ফলে, শেখ হাসিনার সরকারের প্রতি ভারতের প্রকাশ্য সমর্থন শুধু বাংলাদেশী জনগণকে হাসিনার সরকারের থেকে বিচ্ছিন্নই করেনি, বরং ভারতের প্রতি ক্ষোভকেও বাড়িয়ে তুলেছে।

বাংলাদেশে তাদের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সক্রিয় উপস্থিতি সত্ত্বেও শেখ হাসিনার প্রতি জনসাধারণের ক্ষোভের গভীরতা বুঝতে ভারত পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে। যদি ভারতীয় নীতিনির্ধারকরা পরিস্থিতি সত্যিই অনুধাবন করতে পারতেন, তবে তারা হয়তো হাসিনাকে ভিন্ন পরামর্শ দিতেন—সম্ভবত তাকে স্বাধীন ও সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজন করতে বলতে অথবা উত্তেজনা বৃদ্ধি এড়াতে স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করতে অনুরোধ করতেন।

শেখ হাসিনা ক্ষমতা ছাড়ার পর, বাংলাদেশে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে, যা প্রতিবার সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সব সময়ই ঘটে থাকে। একটি বিশেষভাবে উদ্বেগজনক ঘটনা হল হিন্দু সন্ন্যাসী চিন্ময় কৃষ্ণ দাসের, যাকে রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। উদ্বেগজনক বিষয় হল, তাকে জামিন দেওয়া হয়নি এবং যারা তার পক্ষে মামলা লড়তে চেয়েছেন, তারা ভয়ভীতি ও হুমকির শিকার হয়েছেন, এমনকি কিছু আইনজীবী শারীরিক হামলার সম্মুখীন হয়েছেন বলেও জানা গেছে।

হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ এবং ঘনিষ্ঠ প্রতিবেশী হিসেবে, ভারতকে এই বিষয়গুলোর প্রতি সংবেদনশীলতার সঙ্গে প্রতিক্রিয়া জানানোর দায়িত্ব ছিল। প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর তার নিয়মিত ব্রিফিংয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশের হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর হওয়া নির্যাতনের বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করতে পারে—যেমনটি যুক্তরাষ্ট্র মানবাধিকার বিষয় নিয়ে সোচ্চার থাকে। কিন্তু গঠনমূলক দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণের পরিবর্তে, অনেক ভারতীয় রাজনীতিবিদ এবং সংবাদমাধ্যম ক্রমাগত নিন্দা জ্ঞাপনেই মনোনিবেশ করেছে। বিশেষত, শেখ হাসিনার প্রস্থান পরবর্তী সময়ে ভারতীয় টেলিভিশন চ্যানেলগুলো বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ ঘটনাগুলোর উগ্র এবং নাটকীয় প্রতিবেদন দিয়ে পরিপূর্ণ হয়ে উঠেছে, যার মধ্যে আছে সত্য, অর্ধ সত্য ও অসত্য।

এই অবিরাম নিন্দাবাদ শুধুমাত্র ভারতের একটি দায়িত্বশীল আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে বিশ্বাসযোগ্যতাকে ক্ষুণ্ন করছে না, বরং বাংলাদেশের হিন্দু সংখ্যালঘুদের দুরবস্থাকে আরও খারাপ করার ঝুঁকি তৈরি করছে। সংখ্যালঘু অধিকার সমর্থনে উত্তেজনা বাড়ানো ছাড়াই একটি আরও সংযত এবং কূটনৈতিক প্রতিক্রিয়া অত্যন্ত প্রয়োজন।

বাংলাদেশে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো নিয়ে যারা ক্রমাগত নিন্দা জ্ঞাপন করছেন, তাঁরা বাংলাদেশী হিন্দুদের স্বার্থে কাজ করছেন, তা বিশ্বাস করা কঠিন। তাদের কর্মকাণ্ড মূলত রাজনৈতিক স্বার্থ দ্বারা প্রণোদিত, যেখানে সাম্প্রদায়িক অনুভূতিকে কাজে লাগিয়ে ভোট আদায় করার লক্ষ্যই প্রধান। আসলে তাঁরা বাংলাদেশী হিন্দু সম্প্রদায়ের জন্য কিছুই করছেন না। বস্তুত, করার ক্ষমতাও নেই, করার সদিচ্ছাও নেই।

এই অবিরাম নিন্দাবাদ বাংলাদেশী হিন্দুদের জন্য বরং বড় ধরনের ক্ষতি ডেকে এনেছে। এই ধরনের কর্মকাণ্ড মুসলমান এবং হিন্দুদের মধ্যে অবিশ্বাসের আগুনে ঘি ঢেলেছে এবং বাংলাদেশের সংবেদনশীল সাম্প্রদায়িক সম্পর্কের সূক্ষ্ম বুননকে আরও দুর্বল করেছে। এই বিভাজনের পরিবেশ হিন্দুদের জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে স্পষ্ট চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করেছে। উদাহরণস্বরূপ, আমি এমন অনেক ঘটনার কথা শুনেছি যেখানে হিন্দু পেশাজীবীরা—বিশেষত যারা অফিস এবং একাডেমিক পরিবেশে নেতৃত্বের অবস্থানে আছেন—তাদের মুসলিম অধীনস্থদের কাছ থেকে প্রতিরোধ, অসম্মান এবং এমনকি প্রকাশ্যে শত্রুতার মুখোমুখি হচ্ছেন। এই বিষাক্ত পরিবেশ, যা মূলত ভারতীয় মিডিয়ার প্রচারিত মেরুকৃত বর্ণনার দ্বারা তীব্রতর হয়েছে, হিন্দুদের জন্য তাদের দায়িত্ব পালন এবং অবস্থান ধরে রাখা ক্রমেই কঠিন করে তুলছে।

ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে সুস্থ্য সম্পর্ক গড়ে তোলা হিন্দু ও মুসলমানদের মধ্যে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের জন্য অত্যন্ত জরুরি, শুধু বাংলাদেশেই নয়, ভারতেও। দায়িত্বশীল কূটনীতি এবং পরিমিত ভাষা ব্যবহার পারস্পরিক আস্থা গড়ে তুলতে এবং সংখ্যালঘু বিষয়ক সমস্যাগুলি কার্যকরভাবে সমাধান করতে সহায়ক। এই ধরনের একটি পদ্ধতি গ্রহণে ব্যর্থতা অঞ্চলে বিভাজনকে আরও গভীর করবে এবং ক্ষোভ ও সংঘাতের চক্রকে দীর্ঘস্থায়ী করবে। ভারতীয় মিডিয়া বা রাজনীতিক যারা নিন্দাবাদে লিপ্ত, তারা যদি একটি যথার্থ ধর্মনিরপেক্ষ দেশ নির্মাণ করেন, যেখানে সব নাগরিকের সমান সুযোগ থাকবে, তাহলেই বাংলাদেশের হিন্দুরা ভালো থাকবে। এ দেশের হিন্দুরা অত্যাচারিত হলে, তখন তাঁদের সমালোচনার করার নৈতিক অধিকার থাকবে।

————————————————————————–

এন এন তরুণ অর্থনীতির অধ্যাপক, ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ। সাউথ এশিয়া জার্নালের এডিটর অ্যাট লার্জ। nntarun@iub.edu.bd