রাষ্ট্র কেন ব্যর্থ হয়

ডারোন আসিমোগলু এবং জেমস এ. রবিনসন তাদের বই ‘হোয়াই নেশনস ফেইল: দি অরিজিনস অফ পাওয়ার, প্রসপারিটি অ্যান্ড পোভার্টি’-এ একটি জাতির ব্যর্থতার কারণগুলো ব্যাখ্যা করেছেন। বইয়ের উপসংহার  হচ্ছে, কোনো দেশের অর্থনৈতিক সাফল্য বা ব্যর্থতা ভৌগোলিক অবস্থান, সংস্কৃতি বা প্রাকৃতিক সম্পদের দ্বারা নির্ধারিত হয় না। নির্ধারিত হয় রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে।

এই বইয়ে দু’টি বিপরীতধর্মী প্রতিষ্ঠানের আলোচনা আছে। প্রথমটি হলো অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রতিষ্ঠান, যা লেখকদের মতে, সমৃদ্ধির মূল চাবিকাঠি। কারণ, এগুলো দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও স্থিতিশীলতার ভিত্তি তৈরি করে। এই প্রতিষ্ঠানগুলো নির্ধারিত হয় নিরাপদ সম্পত্তির অধিকার দ্বারা (যেখানে রাষ্ট্র ব্যক্তির ও ব্যবসার মালিকানা ও বিনিয়োগ সুরক্ষিত রাখে), আইনের শাসনের প্রতি প্রতিশ্রুতি, ন্যায্য ও উন্মুক্ত বাজার ব্যবস্থা, রাজনীতিতে জনগণের ব্যাপক অংশগ্রহণ আর সৃষ্টিশীল ধ্বংস (সৃষ্টিশীল ধ্বংস— একটি প্রক্রিয়া যা নতুন উদ্ভাবনকে উৎসাহিত করে, যদিও এটি প্রচলিত শিল্প ও ক্ষমতাসীন অভিজাতদের জন্য চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করতে পারে)।

দ্বিতীয় ধরনের প্রতিষ্ঠান হলো শোষণমূলক প্রতিষ্ঠান, যা লেখকদের মতে দারিদ্র্যের মূল কারণ। কারণ, এসব প্রতিষ্ঠান সম্পদ ও ক্ষমতা একটি ক্ষুদ্র অভিজাত গোষ্ঠীর হাতে কেন্দ্রীভূত করে, যা সামগ্রিক সমৃদ্ধিকে বাধাগ্রস্ত করে। শোষণমূলক প্রতিষ্ঠান কয়েকটি বৈশিষ্ট্য দ্বারা চিহ্নিত হয়: দুর্বল সম্পত্তির অধিকার (যেখানে সরকার বা অভিজাতরা ইচ্ছামতো সম্পদ দখল করতে পারে), স্বৈরতান্ত্রিক শাসন (যেখানে একটি ছোট গোষ্ঠী রাজনৈতিক ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ করে এবং সাধারণ জনগণের অংশগ্রহণ বাধাগ্রস্ত হয়), সীমিত অর্থনৈতিক স্বাধীনতা (শুধুমাত্র অভিজাতদের লাভবান হওয়ার সুযোগ থাকে), উদ্ভাবনের দমন (যে কোনো নতুন প্রযুক্তি বা ব্যবসাকে বাধা দেওয়া হয় যদি তা বিদ্যমান অভিজাতদের স্বার্থের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায়)।

ইতিহাস নির্মিত হয় সংকটকালীন সন্ধিক্ষণ দ্বারা— গবেষণাধর্মী এ বইয়ের এটা হল উল্লেখযোগ্য আবিষ্কার। সংকটকালীন সন্ধিক্ষণ  যেমন গণভ্যুত্থান, যুদ্ধ, বিপ্লব ইত্যাদি, যা একটি জাতির গতিমুখ পরিবর্তন ক’রে দিতে পারে। তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, একটি দেশের বিদ্যমান প্রতিষ্ঠানগুলোই নির্ধারণ করে যে, দেশটি এসব সন্ধিক্ষণের সুযোগ কাজে লাগাতে পারবে কিনা। ফলে, সব দেশ সমানভাবে এই পরিবর্তন থেকে উপকৃত হয় না।

লেখকদ্বয় এ বিষয়ে ১৬৮৮ সালে সংঘটিত ইংল্যাণ্ডের গ্লোরিয়াস রেভল্যুশনের উদাহরণ দিয়েছেন। এই বিপ্লবের আগে ইংল্যান্ড ছিল একটি নিরঙ্কুশ রাজতন্ত্রের শাসনে পরিচালিত। কিন্তু বিপ্লবের মাধ্যমে ক্ষমতা সংসদের হাতে স্থানান্তরিত হয়, যা আরও অন্তর্ভূক্তিমূলক রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের পথ সুগম করে। এই পরিবর্তন এমন একটি পরিবেশ সৃষ্টি করেছিল যেখানে ব্যবসা ও উদ্যোক্তারা বিকাশ লাভ করতে পেরেছিলেন। এর ফলে শিল্প বিপ্লব ত্বরান্বিত হয় এবং দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জিত হয়।

বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ ছিল ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ। পশ্চিম পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে, বাঙালি জাতির সামনে একটি নতুন পথ নির্মাণের অনন্য সুযোগ এসেছিল, যা পূর্বের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বঞ্চনা থেকে মুক্তি পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি করেছিল। এই স্বাধীনতার মুহূর্তটি সমৃদ্ধি ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি বহন করেছিল। তবে, ১৬৮৮ সালের গ্লোরিয়াস রেভল্যুশনের মতো, যা ইংল্যান্ডে অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রতিষ্ঠানের ভিত্তি স্থাপন করেছিল, বাংলাদেশ একই ধরনের অগ্রগতি অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে। ‘হোয়াই নেশনস ফেইল…’ বইয়ের ভাষ্য অনুসারে—বিশেষ করে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে— শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তির অভাব  দেশের স্বাধীনতার সুফল পুরোপুরি কাজে লাগানোর ক্ষমতাকে বাধাগ্রস্ত করেছে।

গবেষণাপত্রটির যুক্তি হল, দরিদ্র দেশগুলো দারিদ্র্যের ফাঁদে আটকে থাকে কারণ শাসক শ্রেণি পরিবর্তন প্রতিহত করে এবং বিস্তৃত অর্থনৈতিক ও সামাজিক অগ্রগতির চেয়ে নিজেদের ক্ষমতাকে অগ্রাধিকার দেয়। এমনকি যখন অর্থনৈতিক সংস্কার চালু করা হয়, তখনও সেগুলো অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির পরিবর্তে অভিজাতদের স্বার্থ রক্ষার জন্য ব্যবহৃত হয়। পাকিস্তান এই প্রবণতার একটি উজ্জ্বল উদাহরণ। স্বাধীনতার পর থেকেই দেশটি এমন শোষণমূলক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলে, যা ক্ষমতাকে একটি ছোট অভিজাত গোষ্ঠীর হাতে কেন্দ্রীভূত করে। শাসকেরা বিভিন্ন ধরনের দুর্নীতি ও অভিজাতদের নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা বজায় রাখে, ফলে প্রকৃত অর্থে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার সম্ভব হয়নি। যুক্তরাষ্ট্র সরকার ও আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থাগুলোর কাছ থেকে প্রচুর পরিমাণে বৈদেশিক সহায়তা পাওয়া সত্ত্বেও, এই সম্পদ মূলত শাসক শ্রেণি ও সামরিক বাহিনীর হাতেই কেন্দ্রীভূত থেকেছে, সাধারণ নাগরিকদের উন্নয়নে বা অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে তুলতে ব্যবহার করা হয়নি।

লেখকগণ একটি সংক্ষিপ্ত কাঠামো উপস্থাপন করেছেন, যা দেখায় কীভাবে একটি দেশ সাফল্য অর্জন করতে পারে। তাদের মতে, দারিদ্র্য থেকে মুক্তি পেতে হলে শোষণমূলক প্রতিষ্ঠান থেকে অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রতিষ্ঠান-এ রূপান্তর করা একান্ত দরকার। অর্থনৈতিক উন্নয়ন তখনই টেকসই হয়, যখন তার পূর্বে কার্যকর রাজনৈতিক সংস্কার ঘটে। ক্ষমতার বিস্তৃত বণ্টন উদ্ভাবন, স্থিতিশীলতা এবং দীর্ঘমেয়াদি সমৃদ্ধিকে উৎসাহিত করে। দেশগুলো দুর্ভাগ্য বা সম্পদের অভাবের কারণে ব্যর্থ হয় না; বরং তারা এমন একটি ব্যবস্থার মধ্যে আটকে থাকে, যেখানে ক্ষমতা ও সম্পদ একটি ক্ষুদ্র গোষ্ঠীর হাতে কেন্দ্রীভূত থাকে। একমাত্র পথ হচ্ছে অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা, যা রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক জীবনে সকলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করবে এবং সবার জন্য সুযোগ সৃষ্টি করবে।

বাংলাদেশের অবস্থান ‘হোয়াই নেশনস ফেইল’ বইয়ের আলোকে বিশ্লেষণ করা দরকার, যে বই লিখে এই লেখকেরা নোবেল প্রাইজসহ বিশ্বব্যাপী স্বীকৃতি অর্জন করেছেন। লেখকদের মতে, একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হয় তার প্রতিষ্ঠানের শক্তি ও প্রকৃতির দ্বারা। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানের প্রকৃতির কারণে কি বাংলাদেশ রাষ্ট্র ব্যর্থতার ঝুঁকিতে রয়েছে? দেশটি কি জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিতকারী অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পেরেছে, নাকি শোষণমূলক প্রতিষ্ঠান দ্বারা শাসিত হচ্ছে, যেখানে ক্ষমতা ও সম্পদ একটি ক্ষুদ্র গোষ্ঠীর হাতে কেন্দ্রীভূত? দুর্ভাগ্যবশত, বাস্তবতা হতাশাজনক। বিচার বিভাগ, নির্বাচন কমিশন, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম ও মানবাধিকার কমিশনের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোকে কখনোই সত্যিকারের অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে উঠতে দেওয়া হয়নি। বরং, একের পর এক সরকার আসার সঙ্গে সঙ্গে এসব প্রতিষ্ঠানের গুণগত মান আরও অবনতি হয়েছে। শেখ হাসিনার সরকার শোষণমূলক ব্যবস্থা আরও গভীরভাবে প্রোথিত করেছে, ক্ষমতা আরও কেন্দ্রীভূত করেছে এবং গণতান্ত্রিক শাসন ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য অপরিহার্য প্রতিষ্ঠানগুলোকে ধ্বংস করে দিয়েছ।

দেশ ভবিষ্যতে সমৃদ্ধির দিকে যাবে কিনা, তার একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্ণায়ক হল, সমাজ কতটা বিভাজিত। একটি বহুবিভাজিত সমাজের পক্ষে উন্নতির পরাকাষ্ঠায় পৌঁছানো কঠিন। এখানে ‘বিভাজন’ বিষয়টা ভালো ক’রে বোঝা দরকার। ইংল্যান্ড, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, নিউজিল্যান্ড, ইউরোপ বহু অভিবাসীর দেশ।  অভিবাসীরা বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন দেশ থেকে এ সব দেশে পাড়ি জমিয়েছেন। অতএব, তাঁদের ধর্ম, বর্ণ, বিশ্বাস, মত, পথ— সব আলাদা। কিন্তু তাঁরা যখন কাঙ্ক্ষিত দেশটিতে গিয়ে উপস্থিত হন, তখন তাঁরা ঐ দেশটির দর্শন, আদর্শ, সংবিধান, জাতীয় সঙ্গীত, জাতীয় পতাকা হৃদয়ে গ্রহণ ক’রে ঐ সমাজেরই অংশ হয়ে যান। ফলে সমাজের বিভাজিত হওয়ার সুযোগ থাকে না।  

বাংলাদেশের মতো জাতিগত বিভাজনবিহীন দেশ খুবই কম আছে পৃথিবীতে। ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীভূক্ত মানুষের সংখ্যা খুবই অল্প। যাঁরা আছেন, তাঁরাও জাতীয় মূল ধারাকে গ্রহণ করেছেন। অর্থাৎ রাষ্ট্রের দর্শন, আদর্শ, সংবিধান ইত্যাদি তাঁরা মেনে নিয়েছেন। বরং মেনে নেন নি বাঙালিদেরই একটি বড় অংশ। এই অর্থেই বাংলাদেশের সমাজ একটি বহুবিভাজিত সমাজ। ধর্মীয় বা জাতিগত বিভাজনের চেয়েও ভয়ংকর ক্ষতিকর রাষ্ট্র সম্পর্কিত দর্শন ও ইতিহাস বিষয়ে মতনৈক্য। বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সৃষ্টির বিরুদ্ধে যাঁরা ছিলেন, তাঁরা স্বাধীন বাংলাদেশের দর্শন, আদর্শ, সংবিধান মানেন না। যাঁরা পক্ষে ছিলেন, তাঁরাও বহুধাবিভক্ত, যেমন জাতির পিতা, রাষ্ট্রধর্ম, স্বাধীনতা সংগ্রামে ও মুক্তিযুদ্ধে কার কী অবদান ইত্যাদি বিষয় এই মতনৈক্যের জায়গা। সংবিধান সংস্কার প্রস্তাবে রাষ্ট্রের মূলনীতি, বাংলাদেশের রাজনৈতিক নাম পরিবর্তন, জাতির পিতার বিধান বাতিল, রাষ্ট্রধর্ম বহাল রাখা ইত্যাদি সমাজে আরও বিভাজন তৈরি করবে বলে মনে হচ্ছে। আওয়ামী লীগের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বি.এন.পির প্রতিষ্ঠাতা প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রধর্ম করার বা জাতির পিতার নাম বাদ দেওয়ার চিন্তা করেন নি। দেখা যাচ্ছে,  বি.এন.পি ও বামদলগুলো সংস্কার প্রস্তাবের মূল বিষয়গুলোর সাথে দ্বিমত পোষণ করছে। তার মানে, সমাজে বিভাজন বাড়ছে।

বাংলাদেশে ঐক্যমত্য হয় না কারণ মানুষের মুক্তি আমাদের লক্ষ্য নয়। প্রত্যেকেই প্রত্যেকের নিজস্ব বিশ্বাস বা পূর্বধারণা কার্যকর দেখতে চায়। আমাদের কাছে সত্যের ওপরে বিশ্বাসের স্থান। ভারতের হিন্দু জাতীয়তাবাদীরা গান্ধীকে হত্যা করেছে, কিন্তু বি.জে.পির মতো হিন্দু জাতীয়তাবাদী দলও গান্ধীকে জাতির পিতা মানে। কংগ্রেসের পররাষ্ট্রনীতিও বিজেপি অনুসরণ করেছে। এ রকম উদাহরণ অজস্র, কিন্তু জাতি হিসেবে আমরা দূর্ভাগা। আমাদের কোন কিছুতেই ঐক্য নেই।  

দেশে উন্নয়ন ঘটলেও ধ্বংস হয়ে গেছে সব অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রতিষ্ঠান। আর আমদের বিভাজিত সমাজ। তবে কি ব্যর্থতায় পর্যবসিত হবে আমাদের সব আয়োজন?     

রাজনৈতিক দলের অনুদান গ্রহণও দুর্নীতি

রবার্ট ক্লিটগার্ড (১৯৮৮) দুর্নীতির সর্বাধিক স্বীকৃত সংজ্ঞাটি প্রদান করেছেন। তাঁর মতে, ‘দুর্নীতি হল ব্যক্তিগত লাভের জন্য রাষ্ট্রীয় পদের অপব্যবহার।’ দুর্নীতির বিভিন্ন রূপের মধ্যে ঘুষ, চাঁদাবাজী, কমিশন, রেন্ট-সিকিং, তহবিল আত্মসাৎ, পৃষ্ঠপোষকতা, স্বজনপ্রীতি, গোষ্ঠীপ্রীতি, পক্ষপাতিত্ব ইত্যাদি অন্তর্ভুক্ত। বিশেষভাবে, রাজনৈতিক অনুদানকেও রেন্ট-সিকিং তথা অন্যায়ভাবে রাষ্ট্রীয় সুবিধা লাভের জন্য ঘুষ প্রদানের চেষ্টা বৈ আর কিছুই নয়।  

ঠিক একই সুরে, খ্যাতনামা বাংলাদেশি অর্থনীতিবিদ, প্রফেসর মুশতাক খান তার বিখ্যাত ‘ডিটারমিন্যান্টস অফ করাপশন…’ বইয়ে যুক্তি দেন যে, লবিং ও রাজনৈতিক অনুদানও রেন্ট-সিকিং আচরণের অংশ।

এই প্রবণতা বিভিন্ন ক্ষেত্রে দেখা যায়। এর মধ্যে নোবেল পুরস্কারের মতো মর্যাদাপূর্ণ সম্মান অর্জনের প্রচেষ্টাও অন্তর্ভুক্ত। এটি সর্বজনবিদিত যে, কিছু ব্যক্তি এই ধরনের সম্মান লাভের সম্ভাবনা বাড়ানোর জন্য লবিস্ট নিয়োগ করেন যাতে তাঁরা বিশাল অর্থ ব্যয় করেন। যখন কোন ব্যক্তি এ ধরনের পন্থা গ্রহণ করেন, তাঁরা শুধু ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করেন না, বরং সামগ্রিকভাবে সমাজে দুর্নীতির বিস্তারেও ভূমিকা রাখেন।

বাংলাদেশে রাজনীতির, ব্যবসার এবং প্রভাব খাটানোর সংস্কৃতি একটি উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। এটা এখন সবারই জানা যে, যাঁরা আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির ও বিপুল আর্থিক সম্পদের অধিকারী, তাঁরা বাইরের শক্তির সাহায্যে প্রচলিত আখ্যান পরিবর্তন করতে, রাজনৈতিক আন্দোলন গঠন করতে এবং এমনকি রাষ্ট্রের উচ্চ পদ কুক্ষিগত করতেও সক্ষম। শক্তিশালী দেশের শক্তিশালী ব্যক্তির বা এজেন্সির সাথে লবিং-ই এখন মনে হচ্ছে ‘সকল ক্ষমতা উৎস।’ আন্তর্জাতিক খ্যাতি গড়া এবং সম্মান অর্জনের জন্য লবিস্ট নিয়োগের এই প্রক্রিয়া দীর্ঘদিন ধরেই অভিজাতদের একটি অস্ত্র, যেখানে পর্দার আড়ালে বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করা হয়।

বাংলাদেশে আমরা এখন দেখতে পাচ্ছি যে, নব্গঠিত রাজনৈতিক দল, যাঁরা দেশের রাজনীতির ধারা পরিবর্তনের কথা বলে আসছে, তাঁরাও স্বৈরশাসনের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকা কর্পোরেট মালিকদের ও ব্যক্তিদের কাছ থেকে অনুদান গ্রহণ করছে। একসময় যারা ফ্যাসিস্ট তথা দমনমূলক শাসনের সাথে যুক্ত ছিলেন, তাঁরা এখন সুবিধামতো তাদের আনুগত্য পরিবর্তন করে নতুন ক্ষমতার কাঠামোর সন্ধান করছেন। যখন এ ধরনের একটি দল নিজেদের গণতন্ত্রের রক্ষক হিসেবে উপস্থাপন করেন, অথচ দুর্নীতিকে টিকিয়ে রাখার জন্য ব্যবহৃত একই পন্থার ওপর নির্ভর করেন, তখন তাদের প্রকৃত উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তোলা জরুরি।

উন্নত দেশগুলো ও তাদের সমণ্বয়ে গঠিত সংস্থা উন্নয়নশীল দেশকে দুর্নীতি বিষয়ে জ্ঞান দিয়ে থাকে, কিন্তু তাদের দেশেই দুর্নীতির প্রধান প্রধান উপসর্গ বিদ্যমান। উদাহরণস্বরূপ, যুক্তরাষ্ট্রে রাজনৈতিক প্রচারণার অর্থায়ন কর্পোরেট অনুদানের সাথে গভীরভাবে যুক্ত, যার ফলে এমন একটি ব্যবস্থা সৃষ্টি হয়েছে যেখানে বড় ব্যবসাগুলো নির্বাচিত কর্মকর্তাদের ওপর বিশাল প্রভাব বিস্তার করে। প্রেসিডেন্ট বা অন্য যে কোনো সরকারি পদপ্রার্থী মূলত বড় কর্পোরেশন, বিলিয়নিয়ার এবং বিশেষ স্বার্থগোষ্ঠীগুলোর আর্থিক অনুদানের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। এসব অনুদান কেবল উদারতার বহিঃপ্রকাশ নয়; বরং এগুলো একটি কৌশলগত বিনিয়োগ, যা রাজনৈতিক সুবিধা নিশ্চিত করার জন্য প্রদান করা হয়। এমনকি নির্বাচনী সময়সীমার বাইরেও কর্পোরেশনগুলো রাজনৈতিক দলগুলোতে অর্থ ঢালতে থাকে, যাতে ক্ষমতায় গেলে রাজনীতিবিদরা জনকল্যাণের চেয়ে কর্পোরেট স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেয়।

কর্পোরেট অনুদানের প্রভাব অনেক মার্কিন প্রেসিডেন্টের নীতিতে স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, বারাক ওবামা, যিনি তার প্রচারণায় ওয়াল স্ট্রিটের ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তিনি গোল্ডম্যান স্যাক্স এবং জেপি মরগান চেজ-এর মতো বৃহৎ ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে উল্লেখযোগ্য আর্থিক সহায়তা পেয়েছিলেন। আর্থিক সংস্কারের বিষয়ে তাঁর বক্তব্য সত্ত্বেও, তাঁর প্রশাসন ২০০৮ সালের আর্থিক সংকটের সময় ওয়াল স্ট্রিটকে বেইলআউট দিয়েছিল, যখন লক্ষ লক্ষ আমেরিকান তাদের বাড়িঘর হারিয়েছিল।

ডোনাল্ড ট্রাম্প, যিনি নিজেকে একজন জনগণের নেতা ও বহিরাগত রাজনীতিক হিসেবে উপস্থাপন করেছিলেন, তিনি জীবাশ্ম জ্বালানি কোম্পানি ও বৃহৎ ওষুধ নির্মাতা সংস্থাগুলিসহ কর্পোরেট দাতাদের কাছ থেকে কোটি কোটি ডলার সংগ্রহ করেছিলেন। এর প্রতিদানে, তার প্রশাসন পরিবেশগত বিধিনিষেধ শিথিল করে এবং এমন কর হ্রাস কার্যকর করে, যা মূলত বড় কর্পোরেশনগুলোরই সবচেয়ে বেশি লাভবান করেছে।

জো বাইডেনের প্রচারণার বড় অংশ অর্থায়ন করেছিল গুগল ও মাইক্রোসফটের মতো প্রযুক্তি জায়ান্টরা, পাশাপাশি ওষুধ ও স্বাস্থ্যসেবা খাতের প্রতিষ্ঠানগুলো। মোটেই আশ্চর্যের কিছু নয় যে, তার প্রশাসন বিগ টেক একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ এবং ওষুধের মূল্য সংস্কারের বিষয়ে কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপে ধীরগতিতে অগ্রসর হয়েছে।

এই প্রবণতা সাম্প্রতিক প্রেসিডেন্টদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। জর্জ ডব্লিউ বুশের প্রেসিডেন্ট থাকা অবস্থায়, হলিবার্টন-এর মতো প্রতিরক্ষা ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অনুদান এসেছিল, যা পরবর্তীতে ইরাক যুদ্ধে লাভজনক সরকারি চুক্তি অর্জন করেছিল। বিল ক্লিনটনের প্রশাসন আর্থিক খাতের দাতাদের কাছ থেকে সুবিধা পেয়েছিল, যার ফলে গ্লাস-স্টিগল অ্যাক্ট বাতিলের পথ প্রশস্ত হয়েছিল—এটি ব্যাংকিং খাতের নিয়ন্ত্রণ শিথিল করেছিল এবং ২০০৮ সালের অর্থনৈতিক বিপর্যয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। এমনকি রোনাল্ড রেগান, যিনি মুক্ত বাজার নীতির জন্য প্রশংসিত হন, তিনিও বড় কর্পোরেট স্বার্থের দ্বারা সমর্থিত ছিলেন, যা তাঁর বৈষম্যমূলক কর হ্রাস ও শ্রমিক ইউনিয়ন দমন নীতির মাধ্যমে ব্যাপকভাবে লাভবান হয়েছিল।

এই কর্পোরেট প্রভাবের চক্র গণতন্ত্রকে বিকৃত করে, যেখানে নির্বাচিত কর্মকর্তারা জনগণের প্রতিনিধির পরিবর্তে কার্যত কর্পোরেট আমেরিকার স্বার্থ রক্ষকের ভূমিকায় পরিণত হন। যখন কর্পোরেশনগুলো রাজনৈতিক প্রচারণার জন্য অর্থায়ন করে, তারা এর বিনিময়ে প্রতিদান আশা করে—হোক তা অনুকূল আইনপ্রণয়ন, কর ছাড়, কিংবা নিয়ন্ত্রণ শিথিলকরণের মাধ্যমে। এটি মূলত আইনি দুর্নীতি, যা গণতন্ত্রের মৌলিক নীতিগুলোকে দুর্বল করে দেয়।

সত্যিকারের রাজনৈতিক সংস্কারের জন্য এই চক্র ভাঙা জরুরি, যা কঠোর প্রচারণা অর্থায়ন আইন প্রয়োগ, কর্পোরেট অনুদান নিষিদ্ধকরণ এবং সরকারি অর্থায়নে পরিচালিত নির্বাচন প্রচারের মাধ্যমে সম্ভব। এ ধরনের পদক্ষেপ ছাড়া, মার্কিন রাজনৈতিক ব্যবস্থা ধনী অভিজাতদের খেলার মাঠ হিসেবেই রয়ে যাবে, যেখানে আইন জনগণের জন্য নয়, বরং তাদের জন্য তৈরি হয় যারা প্রভাব কিনতে সক্ষম।

বাংলাদেশে অর্থনীতির ও রাজনীতির বিষাক্ত মিশ্রণ বছরের পর বছর ধরে আরও গভীর হয়েছে। ফলে এমন একটি ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে যেখানে কর্পোরেট স্বার্থ রাজনৈতিক সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে। দশকের পর দশক ধরে, বেক্সিমকো গ্রুপ, বসুন্ধরা গ্রুপ এবং এস. আলম গ্রুপ-এর মতো শক্তিশালী ব্যবসায়িক সাম্রাজ্য দেশের শাসন ব্যবস্থার ওপর প্রভাব বিস্তার করেছে। তারা শাসকগোষ্ঠীর সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলে, নিজেদের জন্য সুবিধাজনক নীতি, লাভজনক চুক্তি এবং লাগামহীন অর্থনৈতিক আধিপত্য নিশ্চিত করেছে। শেখ হাসিনার স্বৈরাচারী শাসনামলে, এই ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলো আরও সমৃদ্ধ হয়েছে, সরকারকে জবাবদিহিতার বাইরে রাখতে সহায়তা করেছে এবং বিপুল আর্থিক সুবিধা ভোগ করেছে।

অনেকে আশা করেছিলেন যে ২০২৪ সালের কথিত ‘জুলাই অভ্যুত্থান’ বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে একটি পরিবর্তন আনবে। কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনাবলি সেই আশাকে নস্যাৎ করে দিচ্ছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, বসুন্ধরা গ্রুপ—যা দীর্ঘদিন ধরে হাসিনা প্রশাসনের ঘনিষ্ঠ পৃষ্ঠপোষক ছিল—এখন নতুন গঠিত ন্যাশনাল সিটিজেনস পার্টি (NCP)-কে আর্থিক সহায়তা দিয়েছে। এই তথ্য অবাক করার মতো এবং একইসঙ্গে গভীরভাবে উদ্বেগজনক। যদি স্বৈরাচারী শাসনের অতীত আর্থিক পৃষ্ঠপোষকরা নতুন রাজনৈতিক শক্তিগুলোকে অর্থায়ন করা অব্যাহত রাখে, তাহলে বাংলাদেশের জনগণ আদতে কী ধরনের পরিবর্তনের প্রত্যাশা করতে পারে?

এই পরিস্থিতি একটি অস্বস্তিকর সত্যকে উন্মোচিত করে এবং তা হল, বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির মৌলিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে। পৃষ্ঠপোষকতার যে চক্রটি কর্পোরেট অভিজাতদের কৌশলগত অনুদানের মাধ্যমে গণতন্ত্রকে নিয়ন্ত্রণের সুযোগ দেয়, তা কোনো বাধা ছাড়াই অব্যাহত রয়েছে। রাজনৈতিক অনুদান এখন আর সদিচ্ছা বা গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণের মাধ্যম নয়; বরং এটি প্রভাব কেনাবেচার হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে, যা ক্ষমতাকে কিছু নির্দিষ্ট প্রভাবশালী গোষ্ঠীর হাতেই সীমাবদ্ধ রাখে।

বাংলাদেশের সাধারণ জনগণের জন্য, এটি এক অন্ধকার ভবিষ্যতের ইঙ্গিত দেয়—যেখানে আশার কোনো আলো নেই। রাজনীতির আনুগত্য পরিবর্তনের এই চক্র কেবল একদল অভিজাতদের পরিবর্তে আরেকদল অভিজাতদের ক্ষমতায় বসানোর কাজ করছে, ফলে জনগণ বঞ্চিত, হতাশ এবং একটি এমন ব্যবস্থার মধ্যে বন্দী রয়ে গেছে, যা জনস্বার্থের পরিবর্তে সুবিধাভোগী শ্রেণির সেবা করে।

বাংলাদেশের রাজনীতি যদি কখনো আর্থিক স্বার্থান্বেষণের কবল থেকে মুক্ত হতে চায়, তবে রাজনৈতিক অর্থায়নের স্বচ্ছতা, লবিংয়ের নৈতিকতা এবং পরিবর্তনের দাবিদারদের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে গভীর আলোচনা হওয়া প্রয়োজন। এই বিষয়গুলো পর্যবেক্ষণের বাইরে থাকলে, ক্ষমতা, সুবিধাভোগিতা এবং দুর্নীতির চক্র অব্যাহত থাকবে, যা সমাজের জন্য দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিকর হয়ে উঠবে।

যদি রাজনৈতিক অর্থায়নে স্বচ্ছতার জন্য কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া না হয়, তবে গভীরতর সংস্কারের প্রতিশ্রুতি শুধুই একটি মরিচিকা হয়ে থাকবে। কর্পোরেট অনুদানের লাগাম টানতে এবং অর্থনৈতিক অভিজাতদের শাসন ব্যবস্থার ওপর কর্তৃত্ব কমাতে কার্যকর বিধিনিষেধ ছাড়া, বাংলাদেশ গণতন্ত্রের মুখোশ পরা একটি ধনিকতন্ত্রে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে থেকে যাবে।