রাজনীতির ব্যাকরণ

একটি টক শোতে বিএনপি নেত্রী ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানাকে যা বলতে শুনলাম, তার সারমর্ম এ রকম: বাংলাদেশে এখন একজন রাজনীতিকের ইমেজ হলো ক্লাস ফাইভ পাস, উঠতি লোকাল মাস্তান থেকে বড় মাস্তান, তারপর জাতীয় পর্যায়ের মাস্তান। চাঁদাবাজির রেট অনেক হাই। দুই নম্বরি ব্যবসা থেকে বিশাল টাকার মালিক। তারপর এমপি এবং একসময় হয়তো মন্ত্রী।

জানা কথা হলেও নতুন করে মন বিষণ্ন হলো। অথচ এই দেশেও একদা রাজনীতি ছিল শিক্ষিত, ত্যাগী ও মানবিক মানুষের ব্রত। কোথায়, কীভাবে হারিয়ে গেল সেই সব দিন? এমন চিন্তা থেকেই ‘রাজনীতিক’দের জন্য লিখতে ইচ্ছা হলো। জানি, প্লেটো-কাঙ্ক্ষিত ‘ফিলোসফার কিং’ আমাদের এ পোড়ার দেশে কখনোই হবে না। তবুও ভালো রাজনীতির কথা নিরন্তর বলে যেতে হবে, লিখে যেতে হবে।

বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় ও তৃতীয় দশকে মানব ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলো ঘটে, যেমন প্রথম বিশ্বযুদ্ধ, ভার্সাই চুক্তি, রুশ বিপ্লব ও সমাজতন্ত্রের সূচনা, ইতালিতে মুসোলিনির আবির্ভাব ও দুনিয়াব্যাপী ফ্যাসিজমের উত্থান, মহামন্দা, ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ক্ষয়িষ্ণু প্রবণতা যা ইন্ডিয়া অ্যাক্টে প্রতিফলিত, ব্রিটিশ রাজনীতিতে লেবার পার্টির উত্থান ও শ্রমিকের অধিকার রক্ষার দিকে মনঃসংযোগ। এরই প্রেক্ষাপটে ব্রিটিশ দার্শনিক ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানী হেরাল্ড লাস্কির চিন্তাজগতে ঘটে এক বিস্ময়কর বৈপ্লবিক পরিবর্তন। ১৯২৫ সালে লাস্কি রচিত মহাগ্রন্থ গ্রামার অব পলিটিকস এসব বৈশ্বিক ঘটনাবলির ও লাস্কি চিন্তাজগতের পরিবর্তনেরই প্রতিফলন।

লাস্কি এই গ্রন্থে রাষ্ট্র, সার্বভৌমত্ব, অধিকার, স্বাধীনতা এবং গণতন্ত্রের প্রকৃতি নিয়ে সমালোচনামূলক বিশ্লেষণ করেন। তিনি রাজনৈতিক কর্তৃত্বের একটি বহুবিধ ধারণা এবং এমন একটি সমাজতান্ত্রিক অর্থনৈতিক কাঠামোর পক্ষে যুক্তি উপস্থাপন করেন, যা সামাজিক ন্যায়বিচার ও অর্থনৈতিক সমতার ওপর গুরুত্ব দেয়।

লাস্কি রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বের প্রচলিত ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করেন। বলেন, ক্ষমতা রাষ্ট্রে কেন্দ্রীভূত না হয়ে বিভিন্ন সামাজিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে বণ্টিত হওয়া উচিত। তিনি হবস এবং অস্টিন উত্থাপিত আইনি সার্বভৌমত্বের ধারণার সমালোচনা করেন। এর পরিবর্তে তিনি সার্বভৌমত্বের একটি বহুত্ববাদী ধারণা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, রাষ্ট্রের পাশাপাশি একাধিক কর্তৃত্বের কেন্দ্র (যেমন শ্রমিক ইউনিয়ন, পেশাগত সংগঠন, স্থানীয় সরকার এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান) রাজনৈতিক জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এসব কর্তৃত্বকেন্দ্রের সহাবস্থানের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন তিনি।

তাঁর মতে, রাষ্ট্রই একমাত্র কর্তৃত্বের উৎস নয়। রাষ্ট্র বরং এমন একটি প্রতিষ্ঠান, যা অন্যদের সঙ্গে মিলেই শাসনব্যবস্থায় অংশগ্রহণ করে। লাস্কির এই বহুত্ববাদী দৃষ্টিভঙ্গি জি ডি এইচ কোল এবং লিয়ন দুগুইয়ের মতো চিন্তাবিদদের দ্বারা প্রভাবিত। তাঁরা মনে করতেন সমাজের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ক্ষমতা বণ্টন করা জরুরি, যেন স্বেচ্ছাচারিতা ও দমন-পীড়ন ঠেকানো যায়।

লাস্কি জোর দিয়ে বলেন, সরকারের কাজ শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করা নয়। সরকারের প্রধান কাজ হলো সবার জন্য কল্যাণ নিশ্চিত করা। তিনি বৈষম্য মোকাবিলায় অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ ও সামাজিক ন্যায়বিচারে রাষ্ট্রের সক্রিয় ভূমিকার পক্ষে মত দেন। লাস্কি বলেন, রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব নিরঙ্কুশ নয় এবং তা সামাজিক ও অর্থনৈতিক বিবেচনার মাধ্যমে সীমাবদ্ধ হওয়া উচিত। তিনি সতর্ক করেন, একটি অনিয়ন্ত্রিত রাষ্ট্র সার্বভৌমত্বের নামে ব্যক্তিস্বাধীনতা দমন করতে পারে। এর পরিবর্তে তিনি এমন একটি বিকেন্দ্রীকৃত শাসনব্যবস্থার কথা বলেন, যেখানে একাধিক প্রতিষ্ঠান সম্মিলিতভাবে কর্তৃত্ব ভাগ করে নেয়। তিনি অনিয়ন্ত্রিত পুঁজিবাদ তথা বাজার অর্থনীতির সমালোচনা করেন। কারণ, এটি অর্থনৈতিক বৈষম্য ও সামাজিক অন্যায্যতার সৃষ্টি করে। তাঁর মতে, সরকারের উচিত শ্রমজীবী শ্রেণির স্বার্থ রক্ষার জন্য হস্তক্ষেপ করা।

লাস্কি তাঁর বইয়ে ব্যক্তিস্বাধীনতার একটি নতুন তত্ত্ব উপস্থাপন করেন। কেবলমাত্র রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের অনুপস্থিতিই ব্যক্তিস্বাধীনতা নয়; বরং ন্যায়ভিত্তিক সমাজে ব্যক্তির সম্ভাবনা বিকাশের সামর্থ্য হিসেবে তিনি ব্যক্তিস্বাধীনতাকে সংজ্ঞায়িত করেন। তিনি অর্থনৈতিক বৈষম্যকে স্বাধীনতার জন্য একটি মৌলিক হুমকি হিসেবে দেখেন এবং বলেন, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ছাড়া রাজনৈতিক অধিকার অর্থহীন। কারণ, বৈষম্য গরিব ও শ্রমজীবী শ্রেণির জন্য সুযোগ সীমিত করে দেয়।

লাস্কি স্বাধীনতাকে দুটি ভাগে ভাগ করেন—আনুষ্ঠানিক স্বাধীনতা ও বাস্তব স্বাধীনতা। আনুষ্ঠানিক স্বাধীনতার মধ্যে রয়েছে আইনি ও রাজনৈতিক অধিকার। যেমন মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, ভোটাধিকার, ও আইনের সুরক্ষা। বাস্তব স্বাধীনতা এমন সামাজিক ও অর্থনৈতিক শর্তের কথা বলে, যা ব্যক্তিকে তাঁর অধিকারগুলো অর্থবহভাবে প্রয়োগ করতে সক্ষম করে। অর্থনৈতিক নিরাপত্তা না থাকলে আনুষ্ঠানিক স্বাধীনতা অর্থহীন হয়ে পড়ে। একটি উদাহরণ দিয়ে লাস্কি ধারণাটি ব্যাখ্যা করেন: ভোটাধিকার আছে এমন একজন দরিদ্র মানুষের যদি যথাযথ শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা বা ন্যায্য মজুরি না থাকে, তাহলে প্রকৃতপক্ষে তিনি স্বাধীন নন।

লাস্কির এই বক্তব্য বাংলাদেশের জন্য খুব প্রাসঙ্গিক। এখানে প্রত্যেক নাগরিকের ভোটাধিকার আছে। কিন্তু গরিব মানুষ নিজের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে পারেন না। সামান্য টাকার বিনিময়ে তিনি তাঁর ভোট বিক্রি করে দিতে বাধ্য হন অথবা গ্রামের মাতবর বা এলাকার প্রভাবশালী নেতার পছন্দ অনুযায়ী তিনি ভোট দিতে বাধ্য হন। কারণ, সেই মাতবর বা প্রভাবশালী নেতা তাঁকে ‘বিপদে’ রক্ষা করেন, প্রয়োজনের সময় কিছু টাকাপয়সা দেন এবং এক সময় জমি বা ভিটা লিখে নেন।

৭৫ বছর পরে এসে অমর্ত্য সেন স্বাধীনতাকে নতুনভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। নেগেটিভ ফ্রিডম, পজিটিভ ফ্রিডম। স্কুলে যাওয়ার অধিকারকে প্রফেসর সেন নেগেটিভ ফ্রিডম বলছেন। এখানে রাষ্ট্রের, সংগঠনের বা ব্যক্তির কাছে থেকে বাধা নেই, কিন্তু বাধা না থাকাই যথেষ্ট নয়। যাঁর স্কুলের বেতন দেওয়ার, বই কেনার টাকা নেই, সে এই স্বাধীনতা কী করবে? সে জন্য তিনি বলছেন, নেগেটিভ ফ্রিডম হলো প্রয়োজনীয় শর্ত; কিন্তু পর্যাপ্ত শর্ত নয়। পজিটিভ ফ্রিডমের মানে হলো আপনি যা মূল্যবান মনে করেন, তা করার বা হওয়ার বাস্তব সক্ষমতা থাকা। এটি শুধু স্বাধীনভাবে থাকতে পারার বিষয় নয়, এটি ক্ষমতায়নের বিষয়।

সেনের ক্যাপাবিলিটি অ্যাপ্রোচ তথা ক্ষমতাপদ্ধতিতে বিবৃত ‘ক্ষমতাসম্পন্ন স্বাধীনতা’র ধারণা আরও গভীর। এটা ব্যাখ্যা করতে তিনি ‘বাস্তব স্বাধীনতা’ শব্দটি ব্যবহার করেন। ব্যক্তি যে ধরনের জীবনকে মূল্যবান মনে করে, সেই জীবনযাপন করার সক্ষমতাই বাস্তব তথা কার্যকর স্বাধীনতা। তিনি জোর দিয়ে বলেন, স্বাধীনতা কেবল অধিকার থাকার বিষয় নয়; বরং সেই অধিকারগুলোকে অর্থবহভাবে ব্যবহার করার উপায় ও পরিবেশ থাকাও জরুরি। যেমন শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং সামাজিক সহায়তা।

গণতন্ত্রের দৃঢ় সমর্থক লাস্কি পুঁজিবাদী গণতন্ত্রের সমালোচনা করেন। কারণ, পুঁজিবাদী গণতন্ত্রে অর্থনৈতিক ক্ষমতা অভিজাত ও পুঁজিপতি শ্রেণির হাতে কেন্দ্রীভূত থাকে, তাঁরা সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখে আর সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ জীবনধারণের জন্য সংগ্রাম করে। এভাবে পুঁজিবাদ শ্রেণি বিভাজন সৃষ্টি করে। এ জন্যই তিনি এই ব্যবস্থাকে অন্যায্য মনে করেন এবং বিশ্বাস করেন, অর্থনৈতিক ক্ষমতার আরও ন্যায্য বণ্টন প্রয়োজন।

লাস্কির মতে, প্রকৃত গণতন্ত্র তখনই সম্ভব, যখন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতা সমানভাবে বণ্টিত হয়। গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে অংশগ্রহণমূলক এবং শ্রমজীবী শ্রেণির চাহিদার প্রতি সাড়া দেওয়ার মতো হতে হবে। তিনি সতর্ক করেন, যদি না অর্থনৈতিক ক্ষমতার গণতন্ত্রীকরণ হয়, তবে রাজনৈতিক গণতন্ত্র কার্যকর হয় না। লাস্কি এমন এক অংশগ্রহণমূলক গণতন্ত্রের পক্ষে কথা বলেন, যেখানে শ্রমিক ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় বেশি অংশগ্রহণ থাকবে। তিনি বিশ্বাস করেন যে নির্বাচনের বাইরে গণতান্ত্রিক অনুশীলনের সম্প্রসারণ দরকার এবং কর্মক্ষেত্রে গণতন্ত্র ও ট্রেড ইউনিয়নের অংশগ্রহণ একটি ন্যায়সংগত সমাজ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ।

লাস্কি এমন একটি সমাজতান্ত্রিক কাঠামোর পক্ষে যেখানে অর্থনৈতিক সম্পদ ব্যক্তিগত স্বার্থের দ্বারা নয়; বরং গণতান্ত্রিকভাবে নিয়ন্ত্রিত হয়। তিনি পুঁজিবাদকে স্বভাবতই শোষণমূলক হিসেবে দেখেন এবং ন্যায় ও সমতা নিশ্চিত করতে প্রধান শিল্পগুলোর যৌথ মালিকানার প্রয়োজনীয়তা বিশ্বাস করেন। তিনি এমন একটি বিশ্বের রূপকল্প রচনা করেন, যেখানে রাষ্ট্রগুলো আন্তর্জাতিক সংস্থার মাধ্যমে সংঘাতের সমাধানে সহযোগিতা করে। তিনি যুদ্ধ ও অর্থনৈতিক শোষণ রোধে বৈশ্বিক শাসনকাঠামোর পক্ষে সমর্থন জানান।

রবীন্দ্রনাথের মতো হেরাল্ড লাস্কিও জাতীয়তাবাদের বিপদ সম্পর্কে আমাদের সতর্ক করেন। তাঁর পর্যবেক্ষণ হলো, জাতীয়তাবাদ প্রায়ই সংঘাত ও যুদ্ধের দিকে নিয়ে যায়। তিনি এমন একটি বিশ্ব কল্পনা করেন, যেখানে রাষ্ট্রগুলো বিরোধ মীমাংসা ও অর্থনৈতিক সমতা এবং শান্তির মতো যৌথ লক্ষ্য অর্জনের জন্য পারস্পরিক সহযোগিতা করবে। তিনি এমন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাকে সমর্থন করেন, যেগুলো বাণিজ্য, শ্রমমান ও মানবাধিকারের নিয়মনীতি নির্ধারণ করবে। তাঁর মতে, শক্তিশালী দেশগুলোর অর্থনৈতিক শোষণকে আন্তর্জাতিক সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের মাধ্যমে চ্যালেঞ্জ করা প্রয়োজন।

সাম্রাজ্যবাদ-উপনিবেশবাদের কঠোর সমালোচক, প্রফেসর লাস্কি যখন বলেন ‘সাম্রাজ্যবাদ-উপনিবেশবাদ পুঁজিবাদী শোষণের সম্প্রসারিত রূপ’, তখন তার মধ্যে মার্ক্সীয় তত্ত্বের প্রতিধ্বনি শোনা যায়। উপনিবেশমুক্তি ও নিপীড়িত জাতিগুলোর আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের পক্ষে লাস্কির জোরালো অবস্থান আমাদের প্রেরণা জোগায়।

লাস্কির গ্রামার অব পলিটিকস রাজনৈতিক তত্ত্বে একটি প্রভাবশালী রচনা হিসেবে বিবেচিত, যা রাষ্ট্রক্ষমতার সমালোচনা করে, বিকেন্দ্রীকৃত ও গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার পক্ষে মত দেয়, এবং সমাজতান্ত্রিক নীতির মাধ্যমে অর্থনৈতিক ও সামাজিক ন্যায় প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানায়। তাঁর চিন্তাধারা এখনো গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র এবং রাজনৈতিক বহুত্ববাদ নিয়ে আলোচনায় আমাদের উদ্দীপ্ত করে।

  • এন এন তরুণ অর্থনীতির অধ্যাপক, ইনডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ, সাউথ এশিয়া জার্নালের এডিটর অ্যাট লার্জ nntarun@gmail.com

‘ও গঙ্গা তুমি বইছো কেন?’

গাজায় যে হত্যাযজ্ঞ এবং জাতিগত নির্মূলের ও বাস্তুচ্যুতির অভিযান চলছে, তা আজ অতীতের সব মানবতাবিরোধী নারকীয় ঘটনার বিভৎসতার সীমা অতিক্রম করেছে। ইতিহাসের কোন পর্বে কোন দেশে এত শিশুর বোমাবর্ষণে বা গুলিতে কিংবা অনাহারে মৃত্যু ঘটেছে কিনা আমার জানা নেই। প্রশ্ন হল, এর শেষ কোথায়? আদৌ কি শেষ হবে? কীভাবে হবে? আমি জানি না। কিন্তু বিশ্বব্যবস্থার আমুল পরিবর্তন ছাড়া যে এর শেষ নেই, সেটা জানি।

২০২৫ সালের ৪ মার্চ পর্যন্ত গাজা যুদ্ধে মোট ৫০,০০০-এরও বেশি মানুষের মৃত্যুর ঘটেছে—যার মধ্যে ৪৮,৪০৫ জন ফিলিস্তিনি এবং ১,৭০৬ জন ইসরায়েলি। এছাড়া নিহতদের মধ্যে রয়েছেন ১৬৬ জন সাংবাদিক ও গণমাধ্যমকর্মী, ১২০ জন শিক্ষাবিদ এবং ২২৪ জনেরও বেশি মানবিক সহায়তাকর্মী—যার মধ্যে ১৭৯ জন ছিলেন জাতিসংঘের অন্তর্গত।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে ইসরায়েল অন্তত ১৭, ৪০০ শিশুকে হত্যা করেছে। আরও বহু শিশু ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে আছে—তাদের অধিকাংশই মৃত বলে ধারণা করা হচ্ছে।  ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী এ পর্যন্ত ১৭, ০০০ শিশু বাবা-মা বা পরিবার-পরিজন থেকে আলাদা, নিস্ব, নিঃসঙ্গ, একাকী। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত গড়ে প্রতি ৪৫ মিনিটে একজন আর প্রতিদিন ১০০ শিশুকে হত্যা করা হয়েছে।

গাজা এখন আর কোন জনপদ বা লোকালয় নয়, গাজা এখন একটি ধ্বংসস্তূপ যেন মহাপ্রলয়ের শেষ চিহ্ণ। এটা একদা ২৩ লাখ মানুষের বাসস্থান ছিল, তাঁদের অধিকাংশই আজ বাস্তুচ্যুত। এই প্রলয়ংকর হামলায় গাজায় ৩৯,৩৮৪ শিশু পিতা-মাতাদের একজনকে অথবা উভয়কে হারিয়েছে।  যেসব শিশু বেঁচে আছে, তাদের অনেকেই একাধিক যুদ্ধের মানসিক আঘাত বয়ে বেড়াচ্ছে। এদের প্রত্যেকেই জন্মের পর থেকেই ইসরায়েলি অবরোধের দমবন্ধ পরিবেশে বেড়ে উঠেছে—যেখানে তাদের জীবনের প্রতিটি দিনই নিপীড়নের ছায়ায় আচ্ছন্ন।

এই প্রেক্ষাপটে ৭ অক্টোবর ছাত্রদের নেতৃত্বে সংগঠিত হল বৈশ্বিক উদ্যোগ ‘দ্য ওয়ার্ল্ড স্টপস’, যা গাজার ফিলিস্তিনি জনগণের প্রতি গভীর আন্তর্জাতিক সংহতির প্রতিফলন, বিশেষভাবে শিশুদের ওপর বিপর্যয়কর প্রভাব তুলে ধরেছে। এই আন্দোলন শুধু ক্রমবর্ধমান মানবিক সংকটের দিকে মনোযোগ আকর্ষণই করেনি, বরং বৈশ্বিক হস্তক্ষেপের জরুরি প্রয়োজনের কথাও জোর দিয়ে বলেছে। ‘দ্য ওয়ার্ল্ড স্টপস’-এর মতো আন্দোলনের মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী যে ক্ষোভ ও প্রতিবাদ উঠে এসেছে, তা এই নৃশংসতাকে স্বাভাবিক করার প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে একটি সম্মিলিত নৈতিক অবস্থানকে প্রকাশ করে।

একই দিনে বাংলাদেশেও আমাদের ছাত্ররা পালন করল ‘দ্য ওয়ার্ল্ড স্টপ্‌স’ কর্মসূচী। একটা সময় ছিল যখন শুধু সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররাই জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ আন্দোলন-সংগ্রামে সামিল হত, কিন্তু ২০২৪-এর গণভ্যুত্থানের এই ধারণার অবসান ঘটে। জুলাই অভ্যুত্থানে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররাও সমানভাবে অংশ নেয়। আরেকটা লক্ষ্যণীয় বিষয় হল, আন্দোলনে তুলনামূলকভাবে বেশি সংখ্যায় ছাত্রীদের অংশগ্রহণ। আমাদের মেয়েরা আর শুধু সাজগোজ ব্যস্ত নিয়ে থাকে না। আমাদের মেয়েদের মাথার মধ্যে এখন দেশ-জাতি-পতাকাও থাকে — থাকে আর্তমানবতার প্রতি গভীর ভালোবাসা।

বুয়েটের ছাত্রী হোমায়রা বিনতে নাসির লিখেছে, ‘ফেইসবুক ওয়ালে প্রতিবার ফিড রিফ্রেশ করলেই গাজাবাসীর ভাগ্য নামক নির্মম বাস্তবতার কাছে হেরে যাওয়া দেখে কিছু সময়ের জন্য আমি ক্ষুব্ধ ঠিকই, কিন্তু আমার কথিত এম্প্যাথি একটা ক্রাই রি অ্যাক্ট এর মাঝেই সীমাবদ্ধ । পুরনো ডায়রিতে নিজের কিছু নোট দেখে বর্তমান ‘আমি’ কে খুব নিচ আর হীন মনে হচ্ছে।’

ইনডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশ-এর ছাত্র ইরফান মজুমদার বলছে, ‘মনে রাখতে হবে যে, মুসলমান হওয়ার জন্য ফিলিস্তিনিরা নিপীড়িত হচ্ছে না— তারা নিপীড়িত হচ্ছে কারণ তারা ফিলিস্তিনি। কোনো ধর্ম, মতবাদ, গির্জা, মসজিদ বা মন্দির মানবতার ঊর্ধ্বে নয়। মানবতা সবার উপরে। ফিলিস্তিনের নিরপরাধ মানুষদের জন্য আশীর্বাদ রইল।’

ইনডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশ-এর আরেক ছাত্রী, নোশেন ফাইজা মিছিলের মধ্যে যমুনা টিভির সাথে সাক্ষ্যাৎকারে বলছে, ‘আমরা এখানে এসেছি তীব্র প্রতিবাদ জানাতে। যেটা হচ্ছে, তা অসহনীয় এবং এটা আমরা সহ্য করব না।’ ফেইসবুকে আপলোড করা এই ভিডিওটি অসংখ্য ভিউ হয়েছে। ভিডিওটি নিচে তাঁর সহপাঠী যখন লিখেছে, ‘আই অ্যাম প্রাউড অফ ইউ।’ প্রত্যুত্তরে ফাইজা বলছে, ‘ভাই, প্রাউড হওয়ার কিছু নাই। আমি আনন্দিত যে, আমি আমার ভয়েস রেইজ করতে পেরেছি।’

সত্যিই তো। আজ গাজা যখন মৃত্যুপুরী, শত শত শিশুর কবরের দেশ, অসংখ্য দুধের শিশু পিতামাতাহীন অনাহারে কান্নারত, তখন আমরা কী ক’রে ঘরে থাকি? আশির দশকে কবি হেলাল হাফিজ অশুভ রাষ্ট্রশক্তির বিরুদ্ধে মিছিলে যাওয়ার অপরিহার্যতার কথা বলছিলেন। বলেছিলেন,  

‘এখন যৌবন যার মিছিলে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়,

এখন যৌবন যার যুদ্ধে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়।’

এমন দুঃসময়ে কিছু একটা কিছু না করতে পারলে, সারাটা জীবন অনুশোচনার আগুনে জ্বলতে হবে, তাই কবি আর এক কবিতায় সতর্কবার্তা উচ্চারণ করেছেন এভাবে:

‘মানব জন্মের নামে কলঙ্ক হবে

এরকম দুঃসময়ে আমি যদি মিছিলে না যাই,

উত্তর পুরুষে ভীরু কাপুরুষের উপমা হবো

আমার যৌবন দিয়ে এমন দুর্দিনে আজ

শুধু যদি নারীকে সাজাই।’

ইসরায়েল শিশুদের অনাহারকে যুদ্ধের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে, আর তা সমর্থন করছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। প্রশ্ন হল,  এমন নৃশংস মানুষ কীভাবে হতে পারে, তার কারণটা বোঝা দরকার। দরকার সমাজতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ। সমাজতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ হল, পুঁজির তাড়নাই সীমাহীন নৃশংসতায় রূপ নেয়। মার্কিন পুঁজিপতি অস্ত্রব্যবসায়ীরাই সরকার প্রধানকে বা সরকারকে প্ররোচিত করে যুদ্ধ বাধাতে ও জিয়িয়ে রাখতে, আগ্রাসন চালাতে ও আগ্রাসন চালাতে সহায়তা করতে। কারণ তাঁরাই নিজের ও অন্য দেশের সরকারের কাছে এবং সন্ত্রাসবাদী সংগঠনের কাছে অস্ত্র বিক্রি করে। সেই যুদ্ধ বা আগ্রাসন চালাতে গিয়ে যদি গর্ভবতী নারীকে—এমনকি শিশুকেও হত্যা করতে হয়, তাঁরা পিছ পা হবে না কারণ মুনাফার লোভে তাঁরা উন্মত্ত। গত ৭ই অক্টোবর ইসরায়েলের ওপর হামাসের হামলার প্রতিক্রিয়ার গাজায় ইসরায়েলী সেনাদের নির্বিচার আক্রমণ থেকে রক্ষা পেল না কিছুই— বসত বাটি, হাসপাতাল, নারী—এমনকি দুধের শিশুও। আর বিশ্ববাসী প্রত্যক্ষ করল পুঁজিবাদের নগ্ন চেহারা।

মনে রাখতে হবে, মৌলবাদের গায়ে ভর ক’রে পুঁজিবাদ বেড়ে ওঠে। এই তত্ত্বের উৎকৃষ্ট প্রমাণ ভারতীয় জনতা পার্টি। দলটি মৌলবাদের চূড়ান্ত রূপ উগ্র পুঁজিবাদ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। তারা কৃষকদের জমি কর্পোরেট মালিকদের হাতে তুলে দিতে চায়। সামাণ্য ঋণের টাকা শোধ করতে না পারলে কৃষককে জেলে যেতে হয়, কিন্তু ধনী ব্যবসায়ীদের হাজার কৌটি ঋণ মওকুফ করে দেয় বি.জে.পি সরকার। অতএব, মৌলবাদ দিয়ে বিশ্বের অস্ত্রব্যবসায়ী পুজিবাদী আগ্রাসনকে প্রতিহত করা যাবে না। দেশে দেশে একটি ক’রে সাম্যবাদী দলকে ক্ষমতায় আসতে হবে এবং তাহলেই সমতাভিত্তিক, ন্যায়ভিত্তিক একটি বিশ্বব্যবস্থা গড়ে ওঠবে।

বাংলাদেশে কিছু ধর্মীয় গোষ্ঠী ও কিছু ধর্মবাদী রাজনৈতিক দল গাজার ঘটনাকে মুসলমানদের ওপর নিপীড়ন হিসেবে উপস্থাপন করতে চাইছে, কিন্তু আদতে এটি জাতিগত নিপীড়ন এবং একটি মানবিক সংকট। এর বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার জন্য  মুসলমান হওয়ার দরকার নেই, দরকার একজন মানুষ হওয়ার। জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব মানুষের ব্যাপক প্রতিবাদ ছাড়া এ সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। প্রতিবাদটা হতে হবে পুঁজিবাদী সম্প্রসারণবাদের বিরুদ্ধে।

‘বিস্তির্ণ দুপাড়ে অসংখ্য মানুষের হাহাকার শুনেও নিঃশব্দে নিরবে বয়ে চলেছে’ বলে ভূপেন হাজারিকা গঙ্গাকে দোষারোপ করেছিলেন। ‘নৈতিকতার স্খলন দেখেও, মানবতার পতন দেখেও নির্লজ্জ অলসভাবে গঙ্গা বয়ে চলেছে দেখে গণমানুষের এই শিল্পী বিষ্ময় প্রকাশ করেছেন। তিনি অনুরোধ করছেন ‘সহস্র বরষার উন্মাদনার মন্ত্র দিয়ে লক্ষ জনেরে সবল সংগ্রামী, আর অগ্রগামী ক’রে তুলতে’। শিল্পী যথার্থই ব্যাখ্যা করেন, ‘ব্যক্তিকে ব্যক্তিকেন্দ্রিক হলে হবে না, আবার সমষ্টিকে ব্যক্তিত্বরহিত হলেও চলবে না।’ গাজা ইস্যুতেও আমরা মনে করি, দরকার বিশ্বব্যাপি সমষ্টির জাগরণ। কোন একক ধর্মাবলম্বী মানুষের জাগরণে ফল হবে না।  

গাজার শিশুদের হাহাকার শুনেও কিছু করতে না পারার জন্য কাকে দোষারোপ করব আমরা? কাকে অনুরোধ করব লক্ষ কোটি জনতাকে মানবতার মন্ত্রে উজ্জীবিত করে এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে বিদ্রোহে সামিল হতে? ছাত্রসমাজ পৃথিবীকেই অনুরোধ করছিল ক্ষণিকের জন্য থেমে যেতে, প্রতিবাদী হতে।

হয়তো একদিন স্বাধীন ফিলিস্তিনী ভূখণ্ড হবে, আবার ভোর হবে, নতুন সূর্য উঠবে; কিন্তু দেখতে না দেখতেই পৃথিবীর আলো যাঁদের জন্য দপ ক’রে নিভে গেল— সেই ইয়াজান, হিন্দ রজব, সাবরিন, ওয়েসাম, নাঈম, আলার মতো শিশুরা সেদিন থাকবে না। আর আমরা বেঁচে থাকব অপরাধবোধের তীব্র যন্ত্রণা নিয়ে, এবং অবশেষে একদিন আমাদেরও ‘নদীগুলোকে বুকের রেখেই চলে যেতে হবে’ ঐ শিশুদের পথে অনন্ত যাত্রায়!

————————————————————————————————————————

এন এন তরুণ অর্থনীতির অধ্যাপক, ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ। সাউথ এশিয়া জার্নালের এডিটর অ্যাট লার্জ। nntarun@gmail.com