নারীর ডাকে মৈত্রী যাত্রা এবং ন্যায়ভিত্তিক বাংলাদেশ গড়ার সংগ্রাম

Published in Prothom Alo 11 May, 2025

‘মানুষ স্বাধীন হয়ে জন্মায়, কিন্তু সর্বত্র সে শৃঙ্খলে আবদ্ধ।’ ফরাসি দার্শনিক জ্যঁ-জ্যাক রুশো তাঁর সোশ্যাল কন্ট্রাক্ট বইটি এই উক্তি দিয়ে শুরু করেন। ‘মানুষের সম্মিলিত ইচ্ছার ভিত্তিতে গড়ে ওঠা কর্তৃত্বই প্রকৃত রাজনৈতিক বৈধতা পায়’—ধারণাটি প্রকাশ করতেই মূলত রুশো বইটি লেখেন। এখানে তিনি দেখিয়েছেন, কীভাবে ব্যক্তিগত স্বাধীনতা সমাজ ও রাষ্ট্রের শৃঙ্খলার সঙ্গে মিলেমিশে টিকে থাকতে পারে।

সিমোন দ্য বোভোয়ারের তাঁর সেকেন্ড সেক্স গ্রন্থে বলেন, ‘নারী জন্মগতভাবে হয় না, বরং সমাজ তাকে নারীতে পরিণত করে।’ এর মানে হলো—জৈবিক লিঙ্গ ও সামাজিক লিঙ্গ এক নয়। অর্থাৎ সমাজ জন্মের পর থেকেই নারীদের ওপর বিভিন্ন ভূমিকা, সীমাবদ্ধতা ও প্রত্যাশা আরোপ করে এবং তাদের একটি বিশেষ ‘নারীত্বের’ ছাঁচে গড়ে তোলে।

উল্লিখিত রুশোর বক্তব্য ও সিমোন দ্য বোভোয়ারের বক্তব্য যোগ করলে ইউনূস সরকারের উদ্যোগে গঠিত নারী সংস্কার কমিটির প্রস্তাবগুলো এবং প্রস্তাবের বিরোধিতাগুলো বুঝতে সুবিধা হবে।

সমাজের ও রাষ্ট্রের শৃঙ্খলে বাঁধা কেবল নারীর স্বাধীনতা নয়, বাঁধা পুরুষের স্বাধীনতাও। পেশিশক্তি ও কৌশল দিয়ে পুরুষ তাঁর স্বাধীনতা কেড়ে নিতে পেরেছিল নারীর চেয়ে অনেক দ্রুত। স্বাধীন পুরুষ রাষ্ট্র, সমাজ ও আইন তৈরি করেছে নারীর মতামত ছাড়া।

স্বাধীন পুরুষ ‘নারীদের ওপর বিভিন্ন ভূমিকা, সীমাবদ্ধতা ও প্রত্যাশা আরোপ করেছে এবং তাদের একটি বিশেষ নারীত্বের ছাঁচে গড়ে তুলেছে।’ যখনই নারী সেই ছাঁচ ভাঙতে চেয়েছেন, তখনই পুরুষ তাঁর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছেন। একবিংশ শতাব্দীতেও পুরুষ নারীর স্বাধীনতা খর্ব করতে চান। একবিংশ শতাব্দীতে এসেও পুরুষের কাছে, সমাজের কাছে, রাষ্ট্রের কাছে নারীকে তাঁর স্বাধীনতার জন্য দেনদরবার করতে হয়। উল্লিখিত নারী সংস্কার কমিশন গঠন এই ‘দেনদরবারের’-ই বহিঃপ্রকাশ।

প্রস্তাবিত বেশ কিছু বিধান নিয়ে কিছু ধর্মীয় গোষ্ঠী ও ব্যক্তি আপত্তি তুলেছেন। ১. ধর্ম, বর্ণ বা সম্প্রদায় এবং নারী-পুরুষনির্বিশেষে সবার সমান অধিকার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে উত্তরাধিকার আইন করা এবং বহুবিবাহের মতো প্রথা নিষিদ্ধ করা। ২. প্রতি নির্বাচনী এলাকায় সরাসরি ভোটে পূরণ করা একটি সাধারণ আসন ও নারীদের জন্য একটি সংরক্ষিত আসন; ৩. যৌনকর্মকে একটি বৈধ পেশা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে যৌনকর্মীদের সর্বোচ্চ সুরক্ষা প্রদান করা।

কাজী জেসিনের সঞ্চালনায় জি-টিভির এক অনুষ্ঠানে নারী নীতি সংস্কার কমিশনের রিপোর্ট নিয়ে একটি আলোচনা হয়েছিল। সেখানে নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশনের অন্যতম সদস্য ব্যারিস্টার সারা হোসেন সহ-আলোচক জনৈক জামায়াত নেতার সামনে দর্শক-শ্রোতাকে সংস্কার প্রস্তাবের পরিষ্কার ব্যাখ্যা দিলেন। তিনি বললেন, ‘আমাদের দেশ ইসলামি আইনে চলে না, আশা করি কখনো চলবেও না। এখানে নানা ধর্মের লোকের বসবাস। অন্য ধর্মের লোক ইসলামি আইনে বাধ্য নন। দেশ চলবে দেশের সংবিধান অনুসারে। বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার শুরু থেকেই প্রতিটি সরকারই নারীর অধিকারকে এগিয়ে নিয়ে গেছে এবং এই সর্বশেষ সংস্কার প্রস্তাব এরই ধারাবাহিকতা।’

তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, যে সরকারে জামায়াতে ইসলামী ছিল, সেই সরকারও নারীর অধিকার এগিয়ে নিয়ে গেছে। যৌনকর্মীর পেশার বৈধতা প্রসঙ্গে ব্যারিস্টার সারা হোসেন জামায়াত নেতাকে কোর্টের রায় এবং বিচারপতিদের মন্তব্যগুলো পড়ে দেখতে পরামর্শ দেন। তিনি যোগ করেন, যৌনকর্মীর পেশার বৈধতার পক্ষে কোর্ট রায় দিয়েছেন।

আমার ধারণা, সামাজিক প্রতিরোধ কমিটিসহ ৬৭টি নারী অধিকার, মানবাধিকার ও উন্নয়ন সংস্থার যে জোট, সেই জোটেরই মতের প্রতিফলন ঘটেছে ব্যারিস্টার সারা হোসেনের সেই বক্তব্যে। তার প্রমাণ পাওয়া গেল গত ১৬ এপ্রিল মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে নারীর ডাকে মৈত্রী-যাত্রার কর্মসূচি আয়োজনের মধ্যে। কমিশনের সংস্কার প্রস্তাবের বিরুদ্ধে চলমান প্রতিক্রিয়াকে নারীবিদ্বেষী ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের পরিপন্থী বলে নিন্দা জানিয়েছেন বক্তারা। তাঁরা সরকারকে কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নের মাধ্যমে লিঙ্গসমতা ও মানবাধিকার সংরক্ষণের আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁরা মনে করেন, নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশনের রিপোর্ট বাংলাদেশের লিঙ্গসমতার পথে একটি বড় পদক্ষেপ হলেও আইনগত বিরোধ ও সামাজিক প্রতিরোধের কারণে এর বাস্তবায়ন চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে।

এর আগে ‘নারীর ডাকে মৈত্রী যাত্রা’ কর্মসূচিতে সংহতি জানিয়ে সংবাদ সম্মেলন করে ৪৯টি প্রগতিশীল নারী-শ্রমিক-সাংস্কৃতিক-শিক্ষার্থী ও পেশাজীবী সংগঠন। সেখানে বক্তারা বলেন, ইতিহাসবিচ্ছিন্ন কূপমণ্ডূকতার মাধ্যমে সহিংসতা ও বৈষম্য চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা প্রতিহত করা হবে।

তাঁদের ঘোষণাপত্রে বলা হয়, ‘আমাদের সংস্কৃতি, ধর্ম ও ইতিহাস দারুণ বৈচিত্র্যময় ও সংবেদনশীল। সেই বিশালতাকে উপেক্ষা করে আমরা গুটিকয় মানুষের সংকীর্ণ ব্যাখ্যাকে সর্বজনীন হতে দেব না। আমরা অধিকার ও ধর্মের মধ্যে দ্বন্দ্ব তৈরি করতে দেব না, মর্যাদা নিয়ে কোনো ধরনের দ্ব্যর্থকতা মেনে নেব না। যে ক্ষমতাকাঠামো এসব জুলুমবাজি জিইয়ে রাখে, আমরা সেই কাঠামোকে ভাঙব।’ ন্যায়ভিত্তিক বাংলাদেশের স্বপ্ন ও তা প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে নারীরা হাল ছাড়বেন না বলে ঘোষণা দিয়েছেন।

বাংলাদেশে নারী আন্দোলন এখন অনেক পরিপক্ব। এর প্রমাণ পাওয়া গেল যখন তাঁরা যখন শ্রমিকের অধিকার প্রতিষ্ঠার কথাও ঘোষণা করেন। বস্তুত, নারীর অধিকার, শ্রমিকের অধিকার, সংখ্যালঘুর অধিকার মানুষের অধিকারেরই ভিন্ন ভিন্ন রূপ এবং একে অপরের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। সমাজে যদি শ্রমের মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হয়, শ্রমিক তাঁর ন্যায্য পাওনা পান, নারীর অধিকার স্বয়ংক্রিয়ভাবে অনেকটাই প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাবে। এই কথা বাংলাদেশের জন্য খুব বেশি প্রযোজ্য। কারণ, পোশাকশিল্পে, গৃহকর্মে, এমনকি কৃষি ও অকৃষি খাতেও সর্বত্র নারীর উপস্থিতি।

অতীতের নারী আন্দোলন থেকে বর্তমান সময়ের নারীদের শিক্ষা নেওয়া দরকার। শিক্ষাটা হলো, হোলস্টিক তথা সর্বাত্মক আন্দোলনের শিক্ষা। জার্মানির ক্লারা জেটকিন, ব্রিটিশ নেত্রী এমেলিন পেট্রিক-লরেন্স, ব্রিটিশ শান্তিবাদী আন্দোলনের নেত্রী হেলেনা সনউইক, কার্ল মার্ক্সের কন্যা ইলিয়নোর মার্ক্স, লেনিনের জীবনসঙ্গিনী নাদেঝদা ক্রুপস্কয়া—সবাই যুক্ত থেকেছেন সমাজের খোলনলচে পাল্টে দেওয়ার, মনোজাগতিক পরিবর্তনের সর্বাত্মক আন্দোলনের, বিপ্লবের। যে আন্দোলনে নারী, পুরুষ কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যুদ্ধ করেছে শুধু নারীর জন্য নয়—সবার জন্য।

আর একটা বিষয় মনে রাখতে হবে যে, পুরুষ নারীর প্রতিপক্ষ নয়। পুরুষের স্বার্থ ও নারীর স্বার্থ—একে অপরের পরিপূরক। পুরুষের নিজের স্বার্থেই নারীর ক্ষমতায়নের পক্ষে আমার দাঁড়ানো দরকার। একটি দেশের মোটামুটি ৫০ শতাংশই নারী থাকেন। ক্ষমতায়নের একটি প্রধান উপাদান হলো, লেবারফোর্স পার্টিসিপেশন তথা কর্মে নিযুক্তি। এই হার যত বেশি হবে, দেশের উৎপাদন তত বেশি হবে। নিজের পরিবারের স্ত্রী, কন্যা বা ভগ্নির কর্মে নিযুক্তি থেকে সরাসরি যে উপকার আসবে, তার বাইরে, রাষ্ট্রের নিট গেইন তথা নিট লাভ থেকেও আমি উপকৃত হব।

নারী-পুরুষের সম্মিলিত আন্দোলন সম্ভব রাজনৈতিক আন্দোলনের মধ্য দিয়ে এবং আন্দোলনটি হতে হবে সাম্যবাদী আন্দোলন, কারণ জীবনের সর্বক্ষেত্রে সাম্য প্রতিষ্ঠা ছাড়া, বিচ্ছিন্নভাবে শুধু নারী অধিকার প্রতিষ্ঠা সম্ভব হবে না।

কবি শঙ্খ ঘোষ সাম্যের চেতনায় যখন বলেন, ‘আয় বেঁধে বেঁধে থাকি’, তখন তিনি আদতে নারী, পুরুষ—উভয়কেই মিনতি জানান এইভাবে:
‘আমাদের ডান পাশে ধস
আমাদের বাঁয়ে গিরিখাদ
আমাদের মাথায় বোমারু
পায়ে-পায়ে হিমানীর বাঁধ
আমাদের পথ নেই কোনো
আমাদের ঘর গেছে উড়ে
আমাদের শিশুদের শব
ছড়ানো রয়েছে কাছে দূরে!
আমরাও তবে এইভাবে
এ-মুহূর্তে মরে যাব নাকি?
আমাদের পথ নেই আর।
আয় আরও হাতে হাত রেখে
আয় আরও বেঁধে বেঁধে থাকি।

এন এন তরুণ অর্থনীতির অধ্যাপক, ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ। সাউথ এশিয়া জার্নালের এডিটর অ্যাট লার্জ। nntarun@gmail.com
*মতামত লেখকের নিজস্ব

শ্রমশোষণই বাংলাদেশের উন্নয়নের ভিত্তি

বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের উন্নয়নের প্রশংসা হয়েছে অনেক। অর্থনীতিবিদ ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদের ‘ডিভেলপমেন্ট সারপ্রাইজ’, বিশ্বব্যাংকের প্রাক্তন প্রধান অর্থনীতিবিদ কৌশিক বসুর ‘হোয়াই বাংলাদেশ ইজ বুমিং’ প্রবন্ধে বাংলাদেশ অর্থনীতিকে ‘টাইগার ইকোনোমি’ আখ্যা দেওয়া অথবা মার্কিন সাংবাদিক নিকোলাস ক্রিস্টোফের নিউইয়র্ক টাইমস-এর বাংলাদেশের উন্নয়ন বিষয়ক কলাম বা দি ইকোনোমিস্টের বাংলাদেশের উন্নয়নকে ধাঁধা হিসেবে অভিহিত করা এর সাক্ষ্য।

যথার্থ এ সব প্রশংসার সাথে আরও যোগ করা যায়। পোশাক শিল্পে নারীরা বিশ্ব বাজারে বাংলাদেশকে করে তুলেছে অপ্রতিদ্বন্দ্বী, স্বদেশে এনেছে বিপ্লব। প্রবাসী শ্রমিকের পাঠানো অর্থ পেণ্ডেমিক অবস্থার মধ্যেও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মজুদ বাড়িয়ে চলছিল। কৃষক রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে ফসলের ফলন বাড়িয়ে চলেছেন। কোভিড-১৯ এর ভয়াবহ মহামারির মধ্যেও কৃষক তাঁর ফলন বাড়িয়েছিলেন। তার মানে হল, বাংলাদেশের উন্নয়নের প্রধান কারিগর এ দেশের শ্রমজীবি মানুষ। অথচ এ দেশের মতো এত নিম্ন মজুরি পৃথিবীর আর কোন দেশে নেই। উল্লেখিত ব্যক্তিবর্গও ওপর থেকে প্রবৃদ্ধি আর উন্নয়নের গল্পে বিমোহিত। তাঁরা ভেতরের গল্প জানেন না। তাঁরা জানেন না যে এই প্রবৃদ্ধি আর উন্নয়নের ভিত্তি হল শ্রম শোষণ। এ দেশে শ্রমিকেরা যে মানবেতর জীবন যাপন করেন, তাঁদের লেখায় তার চিহ্নমাত্র নেই। আজ শ্রমদিবসে সেই গল্প লিখলে কিছুটা ‘পাপমোচন’ হতে পারে।

এটা এখন সর্বজন বিদিত যে, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রধান চালিকা শক্তি তৈরি পোশাক শিল্প। রপ্তানিমুখী এই তৈরি পোশাক শিল্পের যাত্রা শুরু হয়েছিল ১৯৭০-এর দশকের শেষভাগে, একটি ক্ষুদ্র ও অপ্রচলিত রপ্তানি খাত হিসেবে। ১৯৭৮ সালে রিয়াজ গার্মেন্টস যখন যুক্তরাষ্ট্রে প্রথম চালান রপ্তানি করে, তখন বাংলাদেশের মোট রপ্তানি মূল্য ছিল মাত্র ৬৯ হাজার মার্কিন ডলার। এর মাত্র দুই দশকের মধ্যেই, ২০০২ অর্থবছরে পোশাক রপ্তানি বৃদ্ধি পেয়ে ৪.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছে।

গত এক দশকে খাতটি গড়ে প্রতি বছর ১৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে—যা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডেও এক অভূতপূর্ব সাফল্য। বস্তুত, বিশ্বের যে কোনো নবীন শিল্পের জন্য এটি একটি ব্যতিক্রমধর্মী উচ্চ প্রবৃদ্ধির উদাহরণ। এই দ্রুত অগ্রগতির সাথে শিল্পভিত্তিরও শক্তিশালী সম্প্রসারণ ঘটেছে—১৯৮৩ সালে যেখানে কারখানার সংখ্যা ছিল ৫০টিরও কম, ২০০২ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৩,৪০০-এর অধিক, এবং আরএমজি শ্রমিকের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে প্রায় ১৫ লাখে পৌঁছে। আর ২০২৩-এ রপ্তানিকারক কারখানা্র সংখ্যা ৩, ৫৫৫টি, শ্রমিকের সংখ্যা ৪০ লক্ষ এবং এই খাত থেকে রপ্তানি পরিমাণ ৪৭, ৩৮ বিলিয়ন ডলার, যা গত কয়েক দশক ধরেই মোট রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশের বেশি।  

কৃষি ও খাদ্য উৎপাদন বাংলাদেশেকে স্বনির্ভর করতে সাহায্য করেছে। বাংলাদেশ এখন বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম চাল উৎপাদনকারী দেশ। ২০২৩ সালে চাল উৎপাদন ৩৯.১ মিলিয়ন মেট্রিক টনে পৌঁছেছে, যা ১৯৭৩ সালের ৯.৯ মিলিয়ন টন থেকে উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি। বাংলাদেশে প্রায় ৬ কোটি ক্ষুদ্র কৃষক রয়েছেন, যারা ১.২ কোটি খামারে কাজ করেন। অথচ কৃষকের স্বার্থ দেখার কেউ নেই।

শ্রমিক সংগঠনের মতো কৃষকদের তেমন কোন সংগঠন নেই। ফলে তাঁদের দাবি আদায়ের ক্ষমতা নেই বললেই চলে।  ১৯৮৪ সালের কৃষি শ্রমিক (সর্বনিম্ন মজুরি) অধ্যাদেশ কৃষি শ্রমিকদের জন্য দৈনিক সর্বনিম্ন মজুরি ৩.২৭ কেজি চাল অথবা তার আর্থিক সমমূল্য নির্ধারণ করে। তবে, বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে এই অধ্যাদেশটি এখনও হালনাগাদ করা হয়নি। বাংলাদেশের শ্রমশক্তির একটি উল্লেখযোগ্য অংশ কৃষি শ্রমিকদের দ্বারা গঠিত হলেও, তারা প্রায়ই মজুরি বৈষম্যের মুখোমুখি হন। উদাহরণস্বরূপ, তথ্য অনুযায়ী পুরুষ কৃষি শ্রমিকদের গড় দৈনিক মজুরি প্রায় ৩৮৬ টাকা, যেখানে নারী শ্রমিকরা গড়ে প্রায় ২৪৬ টাকা আয় করেন, যা বাংলাদেশের অন্য সব ক্ষেত্রের মতোই লিংগ বৈষম্যকে প্রকাশ করে।

রেমিট্যান্স অর্থনীতির আরেকটি প্রধান চালিকাশক্তি। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বাংলাদেশে রেমিট্যান্স আয় ২৩.৯১ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে, যা আগের বছরের ২১.৬১ বিলিয়ন ডলার থেকে বৃদ্ধি পেয়েছে। অর্থনীতিতে রেমিট্যান্সের অবদান দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। দেশের জিডিপির ৫.২১% এবং মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৫০ শতাংশ। অতীতে বিভিন্ন সরকার ​সঠিক মাধ্যমে (প্রপার চ্যানেলে) অর্থ পাঠানোর জন্য প্রবাসী শ্রমিকদের অনেক প্রনোদনা দিয়েছে, কিন্তু আসল কাজটাই আজ পর্যন্ত কোন সরকার করে নি। বাইরে যাওয়ার আগে শ্রমিকদের বিভিন্ন ধরণের প্রশিক্ষণ দিয়ে দক্ষ শ্রমিকে পরিণত করার কাজটিই কেউ করে নি। এটা করতে পারলে শ্রমিকদের জীবনমানের উন্নয়ন ঘটত। রাষ্ট্রের রপ্তানি আয় বৃদ্ধি পেত। এখানে আমি একটি প্রস্তাব করতে চাই। বিদেশ পাঠানো রেমিট্যান্সের অর্থ থেকে রাষ্ট্রের যে আয় হয়, তা থেকে একটি ফান্ড গঠন ক’রে বিদেশে কর্মরত শ্রমিকদের পরিবারের সন্তানদের জন্য বৃত্তির ব্যবস্থা করা। যাতে তাঁদের সন্তানরা সাচ্ছন্দের পড়াশুনা চালিয়ে যেতে পারে। এতে গরীব সন্তানরা ধনীর সন্তানদের সাথে কিছুটা হলেও টিকে থাকতে পারবে। এতে সমাজে বৈষম্য হ্রাস পাবে।

৮০-এর দশকে যখন পোশাক শিল্পের উত্থান শুরু হয়, তখন আনুষ্ঠানিক ন্যূনতম মজুরির কোনো কাঠামো ছিল না।​ ১৯৯৪ সালে প্রথম আনুষ্ঠানিক ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ করা হয় — মাসে ৯৩০ টাকা। এর পর ১২ বছর পর অর্থাৎ ২০০৬ সালে মজুরি বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়ায় ১,৬৬২.৫০ টাকা। ২০১০ সালে মজুরি বৃদ্ধি পেয়ে হয় মাসে ৩,০০০ টাকা।​ ২০১৩ সালে মজুরি বেড়ে হয় ৫,৩০০ টাকা। ২০১৮ সালে শ্রমিকরা ১৬,০০০ টাকার দাবির পরেও, ন্যূনতম মজুরি নির্ধারিত হয় মাত্র ৮,০০০ টাকা। ২০২৩ সালে বিক্ষোভের পর মজুরি বৃদ্ধি পেয়ে হয় ১২,৫০০ টাকা (প্রায় ১১৩ মার্কিন ডলার), যা এখনও শ্রমিকদের দাবিকৃত ২৩,০০০ টাকা (প্রায় ২০৮ মার্কিন ডলার) থেকে অনেক কম।

পক্ষান্তরে, প্রধান পোশাক রপ্তানিকারক সব দেশেই ন্যূনতম মজুরি ছিল আমাদের তুলনায় অনেক গুণ বেশি। কাম্বোডিয়ায় ২০১০ সালে ন্যূনতম মজুরি ছিল ৬১ ডলার, যা ২০১৮ সালে বেড়ে হয় ১৭০ ডলার, ২০২৫ সালে ২০৮ ডলার। ভিয়েতনামে ২০১৬ সালে ন্যূনতম মজুরি ছিল (অঞ্চল ভেদে) প্রায় ১১০ ডলার থেকে ১৬১ ডলার, যা ২০২৫ সালে হয় ১৭৫ ডলার। ভারতে ২০১৬ সালে (অঞ্চল ভেদে) মজুরি ছিল পোশাক ১০৬ ডলার এবং ২০২৫-এ  ১৭৮ ডলার। চীনে ২০২৪ সালে ন্যূনতম মজুরি অঞ্চলভেদে ভিন্ন ভিন্ন; গড়ে  ৪০০ মার্কিন ডলার। পাকিস্তানেও ন্যূনপ্তম মজুরি আমাদের দেশের বেশি, ২০২৫ সালে প্রায় ১৩২ ডলার।

এই তুলনা স্পষ্ট বলে দেয় যে, বাংলাদেশের পোশাক শ্রমিকরা ঐতিহাসিকভাবে অন্যান্য প্রধান রপ্তানিকারক দেশের শ্রমিকদের তুলনায়  অনেক কম মজুরি পেয়ে আসছেন।

গত তিন দশকে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি ২৪ গুণ বেড়েছে। কিন্তু মজুরি বৃদ্ধির হার সেই তুলনায় নগন্য। সংখ্যাগতভাবে কিছুটা বৃদ্ধি পেলেও প্রকৃতপক্ষে মুদ্রাস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় অনুযায়ী এটি এখনও অপর্যাপ্ত। অর্থাৎ শ্রমিকদের নমিনাল ইনকাম কিছুটা বাড়লেও প্রকৃত আয় মোটেই বাড়ে নি।

তার মানে এটা স্পষ্ট যে, বাংলাদেশের বহুল প্রশংসিত এই অর্থনৈতিক উত্থান মূলত শ্রমিক শোষণের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। ২০২৩ সালে শুধুমাত্র তৈরি পোশাক খাত থেকেই ৪২.৭ বিলিয়ন ডলার আয় হয়েছে—যা দেশের মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮৪.৬ শতাংশের সমান—এবং এই আয়ের পেছনে রয়েছে কোটি কোটি স্বল্প-মজুরির শ্রমিকের কঠোর পরিশ্রম, যাদের অনেকেই নারী। এই পোশাক রপ্তানি বাংলাদেশের জিডিপির প্রায় ১০ শতাংশ এবং প্রতি ব্যক্তির জন্য জাতীয় আয়ে গড়ে প্রায় ১৮৪ ডলার অবদান রেখেছে। ৫.৭৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধিতে যে শ্রমিকের অবদান সিংহভাগ, সেই শ্রমিকই রয়ে গেছে দারিদ্র্যের দুষ্ট চক্র আবদ্ধ । এই ‘অর্থনৈতিক বিস্ময়’ ন্যায্য সমৃদ্ধির অর্থাৎ সবার জন্য সমৃদ্ধির ওপর নয়, বরং কর্মজীবী শ্রেণির পদ্ধতিগত দমন-পীড়নের ওপর দাঁড়িয়ে আছে।

ন্যায্য মজুরির দাবিতে এ দেশে বারবার আন্দোলন হয়েছে। প্রতিবারই সরকার ও মালিক পক্ষ একই সুরে এটাকে চক্রান্ত আখ্যা দিয়ে দমন, পীড়ন ও হত্যার পথ বেছে নিয়েছে। একই সুরে কথা বলবে কারণ সরকারের মন্ত্রী, এম.পিরাই কারখানার মালিক। ব্যবসায়ী শ্রেণির হাতে রাজনীতি থাকলে যে শ্রমজীবী মানুষের ভাগ্য ফিরবে না— এটা এখন প্রতিষ্ঠিত সত্য। বাংলাদেশের অবস্থা অন্যান্য উন্নত পুঁজিবাদী দেশে থেকে আলাদা। কারণ এখানে আজও একটি প্রকৃত পুঁজিপতি শ্রেণী গড়ে ওঠে নি। ফলে পুঁজিবাদের উদারতা থেকে আমরা বঞ্চিত। লুটপাটের সংস্কৃতি কোনক্রমেই পুঁজিবাদের সংস্কৃতি নয়।

জীবনের শেষ দিকে, রবীন্দ্রনাথ এক সময় উপলব্ধি করলেন, যাঁদের শ্রমে এই জগৎ-সংসার চলছে তাঁদের জন্য কিছুই লেখা হয় নি, তাঁর সাহিত্যে সেই শ্রমজীবি মানুষেরই কোন স্থান হয় নি। এজন্য তিনি গভীর বেদনা অনুভব করলেন।  ১৯৪১ সালে ‘জন্মদিনে’ কবিতায় তিনি লিখলেন:

‘চাষি ক্ষেতে চালাইছে হাল,

তাঁতি বসে তাঁত বোনে, জেলে ফেলে জাল’

একই কবিতায় তিনি তাঁর সীমাবদ্ধতার কথাও উল্লেখ করেন এবং এমন একজন কবির আবির্ভাব কামনা করেন যিনি তাঁর কবিতায় শ্রমজীবি মানুষের জীবনগাথা রচনা করবেন। তিনি লিখেছেন: 

‘আমার কবিতা, জানি আমি,

গেলেও বিচিত্র পথে হয় নাই সর্বত্রগামী

যে আছে মাটির কাছাকাছি

সে কবির-বাণী-লাগি কান পেতে আছি’

…………………………………………………………………………………………………..

এন এন তরুণ অর্থনীতির অধ্যাপক, ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ । সাউথ এশিয়া জার্নালের এডিটর অ্যাট লার্জ। nntarun@gmail.com