বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের উন্নয়নের প্রশংসা হয়েছে অনেক। অর্থনীতিবিদ ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদের ‘ডিভেলপমেন্ট সারপ্রাইজ’, বিশ্বব্যাংকের প্রাক্তন প্রধান অর্থনীতিবিদ কৌশিক বসুর ‘হোয়াই বাংলাদেশ ইজ বুমিং’ প্রবন্ধে বাংলাদেশ অর্থনীতিকে ‘টাইগার ইকোনোমি’ আখ্যা দেওয়া অথবা মার্কিন সাংবাদিক নিকোলাস ক্রিস্টোফের নিউইয়র্ক টাইমস-এর বাংলাদেশের উন্নয়ন বিষয়ক কলাম বা দি ইকোনোমিস্টের বাংলাদেশের উন্নয়নকে ধাঁধা হিসেবে অভিহিত করা এর সাক্ষ্য।
যথার্থ এ সব প্রশংসার সাথে আরও যোগ করা যায়। পোশাক শিল্পে নারীরা বিশ্ব বাজারে বাংলাদেশকে করে তুলেছে অপ্রতিদ্বন্দ্বী, স্বদেশে এনেছে বিপ্লব। প্রবাসী শ্রমিকের পাঠানো অর্থ পেণ্ডেমিক অবস্থার মধ্যেও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মজুদ বাড়িয়ে চলছিল। কৃষক রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে ফসলের ফলন বাড়িয়ে চলেছেন। কোভিড-১৯ এর ভয়াবহ মহামারির মধ্যেও কৃষক তাঁর ফলন বাড়িয়েছিলেন। তার মানে হল, বাংলাদেশের উন্নয়নের প্রধান কারিগর এ দেশের শ্রমজীবি মানুষ। অথচ এ দেশের মতো এত নিম্ন মজুরি পৃথিবীর আর কোন দেশে নেই। উল্লেখিত ব্যক্তিবর্গও ওপর থেকে প্রবৃদ্ধি আর উন্নয়নের গল্পে বিমোহিত। তাঁরা ভেতরের গল্প জানেন না। তাঁরা জানেন না যে এই প্রবৃদ্ধি আর উন্নয়নের ভিত্তি হল শ্রম শোষণ। এ দেশে শ্রমিকেরা যে মানবেতর জীবন যাপন করেন, তাঁদের লেখায় তার চিহ্নমাত্র নেই। আজ শ্রমদিবসে সেই গল্প লিখলে কিছুটা ‘পাপমোচন’ হতে পারে।
এটা এখন সর্বজন বিদিত যে, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রধান চালিকা শক্তি তৈরি পোশাক শিল্প। রপ্তানিমুখী এই তৈরি পোশাক শিল্পের যাত্রা শুরু হয়েছিল ১৯৭০-এর দশকের শেষভাগে, একটি ক্ষুদ্র ও অপ্রচলিত রপ্তানি খাত হিসেবে। ১৯৭৮ সালে রিয়াজ গার্মেন্টস যখন যুক্তরাষ্ট্রে প্রথম চালান রপ্তানি করে, তখন বাংলাদেশের মোট রপ্তানি মূল্য ছিল মাত্র ৬৯ হাজার মার্কিন ডলার। এর মাত্র দুই দশকের মধ্যেই, ২০০২ অর্থবছরে পোশাক রপ্তানি বৃদ্ধি পেয়ে ৪.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছে।
গত এক দশকে খাতটি গড়ে প্রতি বছর ১৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে—যা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডেও এক অভূতপূর্ব সাফল্য। বস্তুত, বিশ্বের যে কোনো নবীন শিল্পের জন্য এটি একটি ব্যতিক্রমধর্মী উচ্চ প্রবৃদ্ধির উদাহরণ। এই দ্রুত অগ্রগতির সাথে শিল্পভিত্তিরও শক্তিশালী সম্প্রসারণ ঘটেছে—১৯৮৩ সালে যেখানে কারখানার সংখ্যা ছিল ৫০টিরও কম, ২০০২ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৩,৪০০-এর অধিক, এবং আরএমজি শ্রমিকের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে প্রায় ১৫ লাখে পৌঁছে। আর ২০২৩-এ রপ্তানিকারক কারখানা্র সংখ্যা ৩, ৫৫৫টি, শ্রমিকের সংখ্যা ৪০ লক্ষ এবং এই খাত থেকে রপ্তানি পরিমাণ ৪৭, ৩৮ বিলিয়ন ডলার, যা গত কয়েক দশক ধরেই মোট রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশের বেশি।
কৃষি ও খাদ্য উৎপাদন বাংলাদেশেকে স্বনির্ভর করতে সাহায্য করেছে। বাংলাদেশ এখন বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম চাল উৎপাদনকারী দেশ। ২০২৩ সালে চাল উৎপাদন ৩৯.১ মিলিয়ন মেট্রিক টনে পৌঁছেছে, যা ১৯৭৩ সালের ৯.৯ মিলিয়ন টন থেকে উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি। বাংলাদেশে প্রায় ৬ কোটি ক্ষুদ্র কৃষক রয়েছেন, যারা ১.২ কোটি খামারে কাজ করেন। অথচ কৃষকের স্বার্থ দেখার কেউ নেই।
শ্রমিক সংগঠনের মতো কৃষকদের তেমন কোন সংগঠন নেই। ফলে তাঁদের দাবি আদায়ের ক্ষমতা নেই বললেই চলে। ১৯৮৪ সালের কৃষি শ্রমিক (সর্বনিম্ন মজুরি) অধ্যাদেশ কৃষি শ্রমিকদের জন্য দৈনিক সর্বনিম্ন মজুরি ৩.২৭ কেজি চাল অথবা তার আর্থিক সমমূল্য নির্ধারণ করে। তবে, বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে এই অধ্যাদেশটি এখনও হালনাগাদ করা হয়নি। বাংলাদেশের শ্রমশক্তির একটি উল্লেখযোগ্য অংশ কৃষি শ্রমিকদের দ্বারা গঠিত হলেও, তারা প্রায়ই মজুরি বৈষম্যের মুখোমুখি হন। উদাহরণস্বরূপ, তথ্য অনুযায়ী পুরুষ কৃষি শ্রমিকদের গড় দৈনিক মজুরি প্রায় ৩৮৬ টাকা, যেখানে নারী শ্রমিকরা গড়ে প্রায় ২৪৬ টাকা আয় করেন, যা বাংলাদেশের অন্য সব ক্ষেত্রের মতোই লিংগ বৈষম্যকে প্রকাশ করে।
রেমিট্যান্স অর্থনীতির আরেকটি প্রধান চালিকাশক্তি। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বাংলাদেশে রেমিট্যান্স আয় ২৩.৯১ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে, যা আগের বছরের ২১.৬১ বিলিয়ন ডলার থেকে বৃদ্ধি পেয়েছে। অর্থনীতিতে রেমিট্যান্সের অবদান দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। দেশের জিডিপির ৫.২১% এবং মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৫০ শতাংশ। অতীতে বিভিন্ন সরকার সঠিক মাধ্যমে (প্রপার চ্যানেলে) অর্থ পাঠানোর জন্য প্রবাসী শ্রমিকদের অনেক প্রনোদনা দিয়েছে, কিন্তু আসল কাজটাই আজ পর্যন্ত কোন সরকার করে নি। বাইরে যাওয়ার আগে শ্রমিকদের বিভিন্ন ধরণের প্রশিক্ষণ দিয়ে দক্ষ শ্রমিকে পরিণত করার কাজটিই কেউ করে নি। এটা করতে পারলে শ্রমিকদের জীবনমানের উন্নয়ন ঘটত। রাষ্ট্রের রপ্তানি আয় বৃদ্ধি পেত। এখানে আমি একটি প্রস্তাব করতে চাই। বিদেশ পাঠানো রেমিট্যান্সের অর্থ থেকে রাষ্ট্রের যে আয় হয়, তা থেকে একটি ফান্ড গঠন ক’রে বিদেশে কর্মরত শ্রমিকদের পরিবারের সন্তানদের জন্য বৃত্তির ব্যবস্থা করা। যাতে তাঁদের সন্তানরা সাচ্ছন্দের পড়াশুনা চালিয়ে যেতে পারে। এতে গরীব সন্তানরা ধনীর সন্তানদের সাথে কিছুটা হলেও টিকে থাকতে পারবে। এতে সমাজে বৈষম্য হ্রাস পাবে।
৮০-এর দশকে যখন পোশাক শিল্পের উত্থান শুরু হয়, তখন আনুষ্ঠানিক ন্যূনতম মজুরির কোনো কাঠামো ছিল না। ১৯৯৪ সালে প্রথম আনুষ্ঠানিক ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ করা হয় — মাসে ৯৩০ টাকা। এর পর ১২ বছর পর অর্থাৎ ২০০৬ সালে মজুরি বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়ায় ১,৬৬২.৫০ টাকা। ২০১০ সালে মজুরি বৃদ্ধি পেয়ে হয় মাসে ৩,০০০ টাকা। ২০১৩ সালে মজুরি বেড়ে হয় ৫,৩০০ টাকা। ২০১৮ সালে শ্রমিকরা ১৬,০০০ টাকার দাবির পরেও, ন্যূনতম মজুরি নির্ধারিত হয় মাত্র ৮,০০০ টাকা। ২০২৩ সালে বিক্ষোভের পর মজুরি বৃদ্ধি পেয়ে হয় ১২,৫০০ টাকা (প্রায় ১১৩ মার্কিন ডলার), যা এখনও শ্রমিকদের দাবিকৃত ২৩,০০০ টাকা (প্রায় ২০৮ মার্কিন ডলার) থেকে অনেক কম।
পক্ষান্তরে, প্রধান পোশাক রপ্তানিকারক সব দেশেই ন্যূনতম মজুরি ছিল আমাদের তুলনায় অনেক গুণ বেশি। কাম্বোডিয়ায় ২০১০ সালে ন্যূনতম মজুরি ছিল ৬১ ডলার, যা ২০১৮ সালে বেড়ে হয় ১৭০ ডলার, ২০২৫ সালে ২০৮ ডলার। ভিয়েতনামে ২০১৬ সালে ন্যূনতম মজুরি ছিল (অঞ্চল ভেদে) প্রায় ১১০ ডলার থেকে ১৬১ ডলার, যা ২০২৫ সালে হয় ১৭৫ ডলার। ভারতে ২০১৬ সালে (অঞ্চল ভেদে) মজুরি ছিল পোশাক ১০৬ ডলার এবং ২০২৫-এ ১৭৮ ডলার। চীনে ২০২৪ সালে ন্যূনতম মজুরি অঞ্চলভেদে ভিন্ন ভিন্ন; গড়ে ৪০০ মার্কিন ডলার। পাকিস্তানেও ন্যূনপ্তম মজুরি আমাদের দেশের বেশি, ২০২৫ সালে প্রায় ১৩২ ডলার।
এই তুলনা স্পষ্ট বলে দেয় যে, বাংলাদেশের পোশাক শ্রমিকরা ঐতিহাসিকভাবে অন্যান্য প্রধান রপ্তানিকারক দেশের শ্রমিকদের তুলনায় অনেক কম মজুরি পেয়ে আসছেন।
গত তিন দশকে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি ২৪ গুণ বেড়েছে। কিন্তু মজুরি বৃদ্ধির হার সেই তুলনায় নগন্য। সংখ্যাগতভাবে কিছুটা বৃদ্ধি পেলেও প্রকৃতপক্ষে মুদ্রাস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় অনুযায়ী এটি এখনও অপর্যাপ্ত। অর্থাৎ শ্রমিকদের নমিনাল ইনকাম কিছুটা বাড়লেও প্রকৃত আয় মোটেই বাড়ে নি।
তার মানে এটা স্পষ্ট যে, বাংলাদেশের বহুল প্রশংসিত এই অর্থনৈতিক উত্থান মূলত শ্রমিক শোষণের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। ২০২৩ সালে শুধুমাত্র তৈরি পোশাক খাত থেকেই ৪২.৭ বিলিয়ন ডলার আয় হয়েছে—যা দেশের মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮৪.৬ শতাংশের সমান—এবং এই আয়ের পেছনে রয়েছে কোটি কোটি স্বল্প-মজুরির শ্রমিকের কঠোর পরিশ্রম, যাদের অনেকেই নারী। এই পোশাক রপ্তানি বাংলাদেশের জিডিপির প্রায় ১০ শতাংশ এবং প্রতি ব্যক্তির জন্য জাতীয় আয়ে গড়ে প্রায় ১৮৪ ডলার অবদান রেখেছে। ৫.৭৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধিতে যে শ্রমিকের অবদান সিংহভাগ, সেই শ্রমিকই রয়ে গেছে দারিদ্র্যের দুষ্ট চক্র আবদ্ধ । এই ‘অর্থনৈতিক বিস্ময়’ ন্যায্য সমৃদ্ধির অর্থাৎ সবার জন্য সমৃদ্ধির ওপর নয়, বরং কর্মজীবী শ্রেণির পদ্ধতিগত দমন-পীড়নের ওপর দাঁড়িয়ে আছে।
ন্যায্য মজুরির দাবিতে এ দেশে বারবার আন্দোলন হয়েছে। প্রতিবারই সরকার ও মালিক পক্ষ একই সুরে এটাকে চক্রান্ত আখ্যা দিয়ে দমন, পীড়ন ও হত্যার পথ বেছে নিয়েছে। একই সুরে কথা বলবে কারণ সরকারের মন্ত্রী, এম.পিরাই কারখানার মালিক। ব্যবসায়ী শ্রেণির হাতে রাজনীতি থাকলে যে শ্রমজীবী মানুষের ভাগ্য ফিরবে না— এটা এখন প্রতিষ্ঠিত সত্য। বাংলাদেশের অবস্থা অন্যান্য উন্নত পুঁজিবাদী দেশে থেকে আলাদা। কারণ এখানে আজও একটি প্রকৃত পুঁজিপতি শ্রেণী গড়ে ওঠে নি। ফলে পুঁজিবাদের উদারতা থেকে আমরা বঞ্চিত। লুটপাটের সংস্কৃতি কোনক্রমেই পুঁজিবাদের সংস্কৃতি নয়।
জীবনের শেষ দিকে, রবীন্দ্রনাথ এক সময় উপলব্ধি করলেন, যাঁদের শ্রমে এই জগৎ-সংসার চলছে তাঁদের জন্য কিছুই লেখা হয় নি, তাঁর সাহিত্যে সেই শ্রমজীবি মানুষেরই কোন স্থান হয় নি। এজন্য তিনি গভীর বেদনা অনুভব করলেন। ১৯৪১ সালে ‘জন্মদিনে’ কবিতায় তিনি লিখলেন:
‘চাষি ক্ষেতে চালাইছে হাল,
তাঁতি বসে তাঁত বোনে, জেলে ফেলে জাল’
একই কবিতায় তিনি তাঁর সীমাবদ্ধতার কথাও উল্লেখ করেন এবং এমন একজন কবির আবির্ভাব কামনা করেন যিনি তাঁর কবিতায় শ্রমজীবি মানুষের জীবনগাথা রচনা করবেন। তিনি লিখেছেন:
‘আমার কবিতা, জানি আমি,
গেলেও বিচিত্র পথে হয় নাই সর্বত্রগামী
…
যে আছে মাটির কাছাকাছি
সে কবির-বাণী-লাগি কান পেতে আছি’
…………………………………………………………………………………………………..
এন এন তরুণ অর্থনীতির অধ্যাপক, ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ । সাউথ এশিয়া জার্নালের এডিটর অ্যাট লার্জ। nntarun@gmail.com
