‘যারে তুমি নীচে ফেল সে তোমারে বাঁধিবে যে নীচে’

রবীন্দ্রনাথের গীতাঞ্জলির একটি পঙ্‌ক্তির ঋণ করতে হলো নিবন্ধের শিরোনামে। রবীন্দ্রনাথ নোবেল পুরস্কার পাওয়ার আগপর্যন্ত অনেক অপমানের শিকার হয়েছিলেন তাঁর প্রিয় বাঙালির দ্বারাই। তবে উক্ত পঙ্‌ক্তির উপজীব্য তাঁর নিজের অপমান নয়। হিন্দু সমাজে শতাব্দীর পর শতাব্দী নিম্নবর্ণ উচ্চবর্ণের কাছে কীভাবে নিগৃহীত হয়েছে, তার এক করুণ চিত্র ফুটে উঠেছে মূল কবিতাটিতে। অনেকটা আর্তনাদের মতো। কবি উচ্চবর্ণকে সতর্ক করে দিয়ে বলছেন, এমন নিগ্রহ যদি চলতে থাকে, ভয়াবহ পরিণতি অপেক্ষা করছে তাদের জন্য। শুধু তা–ই নয়, পুরো সমাজই ভেঙে পড়তে পারে একসময়।

নিউটনের (গতির) তৃতীয় সূত্র বলছে: প্রতিটি কাজের (তথা বলপ্রয়োগের) একটি সমমানের ও বিপরীতমুখী প্রতিক্রিয়া হয়, যা জড় জগতের একটি ধ্রুব সত্য। ঠিক একই কথা রবীন্দ্রনাথ বলেছেন কবিতার ভাষায়:

‘যারে তুমি নীচে ফেল সে তোমারে বাঁধিবে যে নীচে

পশ্চাতে রেখেছ যারে সে তোমারে পশ্চাতে টানিছে।’

যা মনুষ্য জগতের এক অমোঘ সত্য। সাহিত্যিক-দার্শনিক মানব মনস্তত্ত্ব ও সমাজ মনস্তত্ত্ব বিষয়ে গভীর অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন মানুষ। ইতিহাসের বিভিন্ন ঘটনার কার্যকারণ সম্পর্ক তাঁরা ভালো বোঝেন এবং সাহিত্যে-দর্শনে তা লিপিবদ্ধ করেন। সে জন্যই, রাজনৈতিক-ঐতিহাসিক ঘটনা বোঝার জন্য সাহিত্য ও দর্শনশাস্ত্র পাঠ করা জরুরি।

রবীন্দ্রনাথ শ্যামলী কাব্যগ্রন্থের ‘হঠাৎ দেখা’ শীর্ষক কবিতায় এমনি এক দার্শনিক তত্ত্ব উপস্থাপন করেন। তিনি বলছেন, ‘রাতের সব তারাই আছে দিনের আলোর গভীরে’। অর্থাৎ যা চলে গেছে তা আদতে পুরোপুরি চলে যায়নি, বরং কালের গভীরে তার রেশটুকু থেকে গেছে। অতীত বর্তমানকে সৃষ্টি করে। তাই তো কবি বলছেন:

‘হে অতীত, তুমি ভুবনে ভুবনে

কাজ করে যাও গোপনে গোপনে।’

বর্তমানকে অতীত ভুলের কুপ্রভাব থেকে মুক্ত করতে হলে দরকার বর্তমান সময়ে বসবাসরত জনগোষ্ঠীর ব্যাপক সংশোধনী কর্মযজ্ঞ। বাংলাদেশে ঘটেছে ঠিক তার উল্টোটি। বাঙালির স্বাধিকার-স্বাধীনতার সংগ্রাম এবং ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিকশিত হওয়ার পরিবর্তে আমরা যেন পশ্চাৎ-যাত্রা শুরু করেছি। এ দেশের একটি বিরাটসংখ্যক মানুষ মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী কর্মকাণ্ডে ভীষণ রকম তৎপর।

বাংলাদেশের প্রথম সংবিধানের চার স্তম্ভ অর্থাৎ গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ ও ধর্মনিরপেক্ষতাই মুক্তিযুদ্ধের চেতনা। এখানে সমাজতন্ত্র যুক্ত হয়েছে সামাজিক ন্যায়বিচার অর্থে, কারণ স্বাধীনতার নেতৃত্ব দেওয়া দল ও প্রথম ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ কখনোই সমাজতন্ত্রে বিশ্বাস করেনি। ফ্রান্সের মতো অথবা ওয়েস্টমিনস্টার স্টাইলের ডেমোক্রেসির মতো একটি আধুনিক রাষ্ট্র গঠন করাই ছিল আদতে বাঙালির সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধের লক্ষ্য। এখন আধুনিক রাষ্ট্র বলতে কী বোঝায়, তা পরিষ্কার হওয়া দরকার।

সপ্তদশ ও অষ্টাদশ শতকে ইউরোপের এনলাইটেনমেন্ট মুভমেন্ট পুরো পশ্চিমা দুনিয়ায় যে বিশ্ববীক্ষা তৈরি করেছিল, তার মূলকথা ছিল বিশ্বাসের পরিবর্তে যুক্তির আশ্রয়, ভাবের বিপরীতে বস্তুর প্রাধান্য, ইহজাগতিকতায় গুরুত্ব আরোপ ইত্যাদি। এনলাইটেনমেন্ট মুভমেন্টই বা আলোকায়নের যুগই ফরাসি বিপ্লবের ভিত্তি। অতএব এনলাইটেনমেন্ট মুভমেন্টের পরিভাষার কয়েকটি শব্দবন্ধ লক্ষ করলে আধুনিক রাষ্ট্র বিষয়ে একটি ধারণা পাওয়া যাবে। যেমন এনলাইটেনমেন্ট মুভমেন্টের মূল বিষয়গুলোর মধ্যে আছে যুক্তির মহিমা উদ্‌যাপন ও যুক্তির প্রয়োগ; বিশ্বাস ও পূর্বধারণা থেকে মুক্তি; যে ধীশক্তি দিয়ে মানুষ এই অনন্ত বিশ্বকে জানতে পারে ও মানবসমাজের অবস্থার উন্নতি ঘটাতে পারে সেই শক্তির উন্মেষ ঘটানো; জ্ঞান, মুক্তি ও সুখ হলো যুক্তিবাদী মানবতার লক্ষ্য ইত্যাদি।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে এখন দুটি ধারার স্পষ্ট বিভাজন। একটি ধারা মানুষের তৈরি আইন দিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনার পক্ষে। আরেকটি ধারা ধর্মীয় আইন দিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনার পক্ষে। প্রথম ধারার পক্ষে সিংহভাগ মানুষ থাকলেও তারা বহুধাবিভক্ত। কার্যক্রম, শক্তিমত্তা, লক্ষ্যস্থিত বিনিয়োগ—সবকিছু সীমিত। দ্বিতীয় ধারার ঐক্য, লক্ষ্যস্থিত বিনিয়োগ, কার্যক্রম এবং শক্তিমত্তার প্রদর্শন ব্যাপক, বহুগুণ। আধুনিক রাষ্ট্রের পক্ষের মানুষের সব মনোযোগ ব্যক্তিগত স্বার্থ উদ্ধারে, দুর্নীতির মাধ্যমে টাকার পাহাড় নির্মাণে। আধুনিক রাষ্ট্র নির্মাণের লক্ষ্যে কোনো যৌথ প্রয়াসে মনোযোগ নেই, বিনিয়োগ নেই। যার ফলে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার উল্টো দিকে আমাদের এই যাত্রা।

প্রতিটি কাজের (তথা বলপ্রয়োগের) একটি সমমানের ও বিপরীতমুখী প্রতিক্রিয়া হয়—বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে কয়েকটি ছোট্ট ঘটনার মধ্যে নিউটনের এই তত্ত্বের বাস্তব প্রতিফলন ঘটেছে। স্বাধীনতার পর আওয়ামী লীগ যদি জাসদকে রাজনীতি করার সুযোগ দিত, বহুদলীয় ব্যবস্থা অব্যাহত থাকত, সংবাদপত্রকে, ব্যক্তির কণ্ঠরোধ না করত, তাহলে হয়তো ’৭৫-এর নির্মম ঘটনা ঘটত না। বাংলাদেশে সামরিক শাসনেরই সূচনা হতো না।

’৯১-এ জাতীয় নির্বাচনের আগে শেখ হাসিনা বাকশাল বাদ দিয়ে আওয়ামী লীগকে একটি গণতান্ত্রিক সংগঠনে রূপান্তরিত করেছিলেন। ’৯৬-এ ক্ষমতায় এসে ডেপুটি স্পিকারের পদ বিরোধী দলকে দিতে চেয়েছিলেন। আওয়ামী লীগের সঙ্গে সম্পর্কবিহীন বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদকে প্রেসিডেন্ট করেছিলেন। অর্থাৎ যিনি (শেখ হাসিনা) একসময় গণতন্ত্রপ্রিয় ছিলেন, তিনি বনে গেলেন স্বৈরশাসক। এখানেও ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া সূত্র বলবৎ।

এরপর শেখ হাসিনা খালেদা জিয়ার বাসভবন গুঁড়িয়ে দিয়েছিলেন। এর প্রায় ২০ বছর পর তাঁর পিতার বাসভবনটিও ধ্বংস হয়ে গেল। প্রতিপক্ষ তারেক রহমানকে ১৭ বছর প্রবাসে থাকতে হয়েছে। আজ শেখ হাসিনাকেও দেশের মাটি থেকে বিদায় নিতে হয়েছে। প্রতিটি বলপ্রয়োগের একটি সমমানের ও বিপরীতমুখী প্রতিক্রিয়া হয়—এ দুটি ঘটনার চেয়ে প্রামাণ্য আর কী ঘটনা থাকতে পারে? প্রতিহিংসা একটি ভয়াবহ রকমের বিষক্রিয়া, যা যুগ থেকে যুগান্তরে সঞ্চারিত হয়। কারণ, প্রতিহিংসা প্রতিহিংসার জন্ম দেয়, যা যুগের পর যুগ চক্রাকারে চলতে থাকে। গান্ধীর অহিংস নীতি এই তত্ত্বের ওপরেই প্রতিষ্ঠিত। রাজনীতিতে এই প্রতিহিংসাপরায়ণতা থেকে আমাদের বেরোতেই হবে। না হলে মুক্তি নেই।

আওয়ামী লীগ মুক্তিযুদ্ধের চেতনা পুঁজি করে মানুষকে ধোঁকা দিয়েছে। কারণ, সংবিধানে সংযুক্ত ওই মূলনীতি ধারণ করেন, এমন কোনো আওয়ামী লীগ নেতার সন্ধান আমার কাছে নেই। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধারণ করলে কেউ এভাবে দুর্নীতিগ্রস্ত হতে পারে না। অর্থাৎ আওয়ামী লীগের কুকীর্তি আমরা জানি, কিন্তু ২০২৪-এর জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের নেতৃত্বের একটি অংশ আওয়ামী লীগের সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধকে মিলিয়ে ফেলেছে। বাঙালির আন্দোলন-সংগ্রামের প্রধান নেতা শেখ মুজিবের অবদানকে খাটো করেছে, ঐতিহাসিক দিবস মুছে ফেলতে চেয়েছে।

সরকার ঐতিহাসিক দিবস মুছে ফেলার প্রয়াসে এবং ঐতিহাসিক স্মৃতিচিহ্ন ধ্বংস করার সুযোগ করে দিয়েছে আর কিছু সংবাদপত্র বা মিডিয়া এ বিষয়ে চুপ থেকেছে। সরকার থেকেও এসব ধ্বংস কার্যক্রম ফ্যাসিবাদের প্রতি ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ বলে ন্যায্যতা দেওয়ার চেষ্টা করেছে। মৌলবাদী, স্বাধীনতাবিরোধী, গণতন্ত্রবিরোধী উন্মত্ত জনগোষ্ঠীকে এভাবে প্রশ্রয় দেওয়া হয়েছে। ন্যায্যতা দেওয়া, সমর্থন করা, নীরব থাকা, প্রতিবাদ না করার প্রতিক্রিয়া হচ্ছে ১৮ ডিসেম্বর প্রথম আলো, ডেইলি স্টার, ছায়ানট ও ঢাকার অন্যান্য স্থানে হামলা, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, লুটতরাজ।

যে সমাজে অন্যায়ের প্রতিবাদ হয় না, সেই সমাজ একসময় বসবাসের অযোগ্য হতে বাধ্য। আর সমাজ বসবাসের অযোগ্য হলে, যত অর্থবিত্তের মালিকই হই না কেন, বেঁচে থাকতে পারলেও, সুখ সর্বাধিক করা যাবে না।

  • এন এন তরুণ অর্থনীতির অধ্যাপক, ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ। সাউথ এশিয়া জার্নালের এডিটর অ্যাট লার্জ। nntarun@gmail.com

বাংলাদেশের বেকারত্ব সংকট মোকাবিলায় এক সাহসী একাডেমিক উদ্যোগ

চীনের দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির একটি প্রধান কারণ হলো শিল্পের চাহিদার সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় উৎপাদিত দক্ষতার সফল সামঞ্জস্য তৈরি করা। চীনের সরকার নিজ উদ্যোগে একাডেমিয়া ও শিল্পের ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা বাড়িয়েছে, এমন ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে, যার মাধ্যমে বৈজ্ঞানিক গবেষণা দ্রুত বাণিজ্যিক ব্যবহারে রূপান্তরিত হতে পারে। এর ফলে মৌলিক গবেষণাকে সহজে পণ্য, প্রযুক্তি ও শিল্প প্রয়োগে রূপ দেওয়া সম্ভব হয়েছে।

বিশ্বব্যাপী বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও বাজার চাহিদার মধ্যে যে ব্যবধানটি থাকে, তা দূর করতে চীন বিজ্ঞান পার্ক, ইনকিউবেটর, গবেষণা অঞ্চল এবং প্রযুক্তি-বিনিময় প্ল্যাটফর্ম প্রতিষ্ঠা করেছে, যা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংযুক্ত করে। এই প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো নিশ্চিত করেছে যে উদ্ভাবনগুলো কেবল একাডেমিক পর্যায়েই সীমাবদ্ধ না থেকে শিল্পে বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার ও গ্রহণযোগ্য হয়েছে।

ফলে একাডেমিয়া-শিল্প সহযোগিতা চীনের কেন্দ্রীয় উন্নয়ন কৌশলে পরিণত হয়েছে। জাতীয় বিজ্ঞান সংস্থাগুলো ও বেসরকারি কোম্পানির যৌথ অর্থায়নে চীন এমন গবেষণাকে উৎসাহিত করেছে, যা সরাসরি শিল্পের চাহিদার সঙ্গে সম্পর্কিত। এতে উদ্ভাবন শক্তিশালী হয়েছে, উৎপাদনশীলতা বেড়েছে ও উচ্চপ্রযুক্তি খাতের বিকাশ ত্বরান্বিত হয়েছে, যার মাধ্যমে চীন নিম্ন-ব্যয়ভিত্তিক উৎপাদন থেকে উদ্ভাবননির্ভর প্রবৃদ্ধির পথে এগিয়ে যেতে পেরেছে।

চীনের উন্নয়ন মডেল থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে ইন্ডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশ (আইইউবি) ১৪-১৫ নভেম্বর ২০২৫ তারিখে ‘সাসটেইনিবিলিটি–ফোকাসড ইন্ডাস্ট্রি ট্রেন্ডস ইন গ্লোবাল রিসার্চ’ থিমকে কেন্দ্র করে আইসিইবিটিএম নামের একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনের আয়োজন করে। সম্মেলনে অর্থনীতি, উদ্যোক্তা সৃষ্টি, সবুজ অর্থনীতি, মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনা এবং প্রযুক্তি ব্যবস্থাপনাসহ বিভিন্ন বিষয়ের ওপর একাধিক সেশন ছিল।

যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, পোল্যান্ড, কানাডাসহ ১২টি দেশের গবেষকেরা তাঁদের গবেষণা উপস্থাপন করেন। কর্মসূচিতে ছিল পাঁচটি কি-নোট স্পিচ, তিনটি আমন্ত্রিত বক্তৃতা ও আটটি শিল্পবিষয়ক আলোচনা সভা, যেখানে অর্থনীতি, টেকসই উন্নয়ন, ব্যবসা, প্রযুক্তি, ব্যবস্থাপনা, সাপ্লাই চেইন, পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক নানা ইস্যু আলোচিত হয়।

বাংলাদেশের পোশাকশিল্প দীর্ঘদিন ধরে এর শিল্পায়নের প্রধান ভিত্তি। তবে টিকে থাকতে হলে এই খাতকে ক্রমবর্ধমানভাবে অটোমেশন, ডিজাইন উদ্ভাবন ও পরিবেশবান্ধব উৎপাদন পদ্ধতি গ্রহণ করতে হবে। পাশাপাশি দেশের ক্রমবর্ধমান ডিজিটাল অর্থনীতি—ই-কমার্স থেকে আইটি সার্ভিস পর্যন্ত—তরুণ উদ্যোক্তাদের এমন দক্ষতা ও মনোভাব অর্জনের দাবি করে, যা উদ্ভাবনকে এগিয়ে নিতে সক্ষম।

বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির মডেল—যা কম মজুরি ও রপ্তানিমুখী উৎপাদনের ওপর নির্ভরশীল—উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি এনে দিলেও তা অনির্দিষ্টকালের জন্য বজায় রাখা সম্ভব নয়। উন্নয়নের পরবর্তী ধাপে প্রয়োজন উদ্ভাবননির্ভর প্রবৃদ্ধির দিকে অগ্রসর হওয়া: এমন একটি প্রবৃদ্ধি যা শুধু অবকাঠামোর ওপর নয়, বরং সৃজনশীলতা, পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও উদ্যোক্তা-পরিবেশ গড়ে তোলার ওপর নির্ভর করবে, যাতে নতুন ধারণা ও প্রযুক্তি উৎপাদন সম্ভব হয়।

কি-নোট স্পিচে ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বাংলাদেশের বর্তমান চ্যালেঞ্জগুলো ও ভবিষ্যতে গ্রহণযোগ্য নীতির দিকনির্দেশনা তুলে ধরেন। তিনি যুক্তি দেন, বাংলাদেশ এখনো একটি ‘স্বল্প-মজুরির অর্থনীতি’-তে আটকে আছে—যে মডেলটি তৈরি পোশাকশিল্পের উত্থান ও মানবসম্পদের রপ্তানিকে ত্বরান্বিত করেছে, কিন্তু যা দীর্ঘমেয়াদি অগ্রগতিকে ধরে রাখতে সক্ষম নয়। তাঁর ভাষায়, ‘গতকালের সাফল্য আগামী দিনের সাফল্যের নিশ্চয়তা নয়।’

বাংলাদেশের অতীত প্রবৃদ্ধির একটি বড় চালিকা শক্তি ছিল ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড, অর্থাৎ জনসংখ্যাগত গতিশীলতায় তৈরি হওয়া সুযোগ। কিন্তু ড. রহমানের মতে, দেশটি এই সুবিধাটিকে পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারেনি। তিনি জোর দিয়ে বলেন, বাংলাদেশ চীন ও ভিয়েতনামের মতো দ্রুততার সঙ্গে পদক্ষেপ নেয়নি, যা ২০১৬ সালের পর থেকে দারিদ্র্য হ্রাসের অগ্রগতি শ্লথ হয়ে যাওয়ার একটি প্রধান কারণ। সময়োপযোগী নীতি গ্রহণ করা গেলে বহু তরুণকে উন্নত কর্মসংস্থানের মাধ্যমে দারিদ্র্য থেকে মুক্ত করা সম্ভব হতো।

তিনি সম্মেলনের প্রধান পৃষ্ঠপোষক ও আইইউবি বোর্ড অব ট্রাস্টির চেয়ারম্যান মি. দিদার এ. হুসেইনের উদাহরণ উদ্ধৃত করেন, যিনি উল্লেখ করেন যে ভিয়েতনাম এখন স্কুলে এআই ব্যবহার করছে, যা দেশটির অর্থনীতিতে আরও গতি অর্জনের অঙ্গীকারকে নির্দেশ করে।

ড. রহমান আরও বলেন, ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের মূল কারণ ছিল তরুণদের হতাশা। এটি মোকাবিলায় তিনি দেশে ‘চাকরির জরুরি অবস্থা’ ঘোষণা করার ও যুব বেকারত্ব দ্রুত হ্রাসে লক্ষ্যনির্ভর নীতি গ্রহণের আহ্বান জানান। তিনি তরুণদের স্থিতিস্থাপকতার প্রশংসা করেন—তাদের ‘হাল না ছাড়া’ মনোভাবকে দেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ হিসেবে চিহ্নিত করেন—যা সঠিকভাবে সহায়তা পেলে বাংলাদেশকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারে। এ লক্ষ্যে তিনি স্পষ্ট দিকনির্দেশনা ও দ্রুত বাস্তবায়নের ওপর জোর দিয়ে একটি জাতীয় কর্মসূচি গ্রহণের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেন। তিনি তাঁর বক্তব্যের উপসংহারে বাংলাদেশের উন্নয়নের পরবর্তী ধাপের জন্য চারটি অপরিহার্য স্তম্ভ তুলে ধরেন:

১. উচ্চমানের শিক্ষা, যা উদ্ভাবনকে উৎসাহিত করে ও শিক্ষার্থীদের আধুনিক দক্ষতায় সজ্জিত করে। ২. প্রবৃদ্ধির নতুন পথের সন্ধান করা। সেটা হতে পারে এআই-নির্ভর কৃষি, আইটি সার্ভিস ও ভূ-প্রযুক্তি। ৩. উন্নত সুশাসন, বিশেষ করে দক্ষতা, স্বচ্ছতা ও সময়োপযোগী বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে। ৪. একাডেমিক, পেশাজীবী ও উদ্যোক্তাদের সমন্বয়ে গঠিত একটি জোট, যা ছিল চীন, দক্ষিণ কোরিয়া ও ভিয়েতনামের সাফল্যের কেন্দ্রে।

শ্রোতাদের পক্ষ থেকে এ লেখার লেখক ড. এন এন তরুণ চক্রবর্তীর প্রস্তাবে ড. রহমান আরও একটি পঞ্চম স্তম্ভ যোগ করেন, যা হলো সংস্কৃতি। তিনি ড. চক্রবর্তীর সঙ্গে একমত হন যে শিক্ষা ও সংস্কৃতি একটি জাতির সুপারস্ট্রাকচার, যা দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের ভিত্তি নির্মাণ করে।

সম্মেলনের একটি বড় আকর্ষণ ছিল একাডেমিয়া-শিল্প সংলাপের ধারাবাহিক সেশন, যেখানে প্রতিটি সেশনে দশজন একাডেমিক ও দশজন করপোরেট নেতাকে একত্র করা হয়। বিশ্বব্যাংকের হিসেবে আগামী দশকে প্রতি সেকেন্ডে চারজন বৈশ্বিক শ্রমবাজারে প্রবেশ করবে, ১ দশমিক ৪২ বিলিয়ন চাকরিপ্রত্যাশী সৃষ্টি হবে, কিন্তু তৈরি হবে মাত্র ৪০০ মিলিয়ন চাকরি। এর মানে হলো, মূল চ্যালেঞ্জ হলো দক্ষতার অমিল কমানো।

এপেক্স গ্রুপের ব্যবসায়ী নেতা সৈয়দ নাসিম মনজুর বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ শুধু প্রজ্ঞা ও বৌদ্ধিক মূলধন তৈরি করা নয়, বরং শিক্ষার্থীদের জীবিকা অর্জনের সক্ষমতাও দেওয়া। তিনি চারটি অগ্রাধিকার প্রস্তাব করেন: ১. পাঠ্যক্রমের নিরবচ্ছিন্ন হালনাগাদ; ২. ক্রিটিক্যাল থিংকিং ও প্রবলেম-সলভিং দক্ষতা; ৩. আজীবন শেখার সংস্কৃতি ও ৪. শক্তিশালী ভাষাগত দক্ষতা। শিল্প-সংশ্লিষ্ট পাঠ্যক্রম নিশ্চিত না হওয়ার জন্য তিনি ইউজিসিকে দায়ী করেন।

রহিমআফরোজের ব্যবসায়ী নেতা নিয়াজ রহিম জানান, কোম্পানির প্রয়োজনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কোর্স ও কোম্পানির নামে একটি চেয়ার স্পনসর করার আগের প্রচেষ্টাগুলো বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সীমিত সহযোগিতার কারণে ব্যর্থ হয়েছিল।

কানাডা থেকে আগত ড. এমেকা হেনরি এগেসন ব্যাখ্যা করেন, কানাডার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সক্রিয় শিল্প-অংশগ্রহণসহ প্রোগ্রাম অ্যাডভাইজরি কমিটি থাকে। ড. ফেরদৌস সালেহীন (ইউএই) উল্লেখ করেন যে শিক্ষার্থীদের স্নাতক হওয়ার আগে ৫০০ ঘণ্টার শিল্প-ওয়ার্কশপ সম্পন্ন করতে হয়, যা প্রোগ্রামগুলোকে চাহিদাভিত্তিক করতে সহায়তা করে। সৈয়দ নাসিম মানজুর আরও প্রস্তাব করেন, তাৎক্ষণিক শিল্প-চাহিদা পূরণের জন্য সংক্ষিপ্ত ও লক্ষ্যভিত্তিক প্রোগ্রাম—যেমন দুই বছরের গুদাম বা সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট ডিপ্লোমা—চালু করা যেতে পারে।

আমার জানা মতে, এমন পরিসরের আন্তর্জাতিক সম্মেলন বাংলাদেশে এর আগে হয়নি। পাঁচ তারকা ভেন্যু দ্য ওয়েস্টিনে দুই দিনের এ আয়োজনে ২০০টি গবেষণা প্রবন্ধ উপস্থাপিত হয়—যার অনেকগুলোই আন্তর্জাতিক গবেষকদের। সম্মেলনের টেকনিক্যাল কমিটিও এর বৈশ্বিক চরিত্রকে প্রতিফলিত করে—যেখানে ছিলেন ৬৫ জন বিদেশি একাডেমিক এবং আইইউবির বাইরের ৫২ জন বাংলাদেশি একাডেমিক, যাঁদের মধ্যে বেশ কয়েকজন উপাচার্য এবং প্রধান একাডেমিক বা গবেষণাপ্রতিষ্ঠানের প্রধান ছিলেন।

ঐতিহাসিক এই সম্মেলনের প্রধান উদ্যোক্তা আইইউবির জেনারেল ম্যানেজমেন্ট বিভাগের প্রধান, অধ্যাপক মো. মামুন হাবিব অসাধারণ নেতৃত্ব প্রদর্শন করেছেন। তবে এমন একটি অনুষ্ঠান সফল করতে বহু মানুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টা ছিল অপরিহার্য। সম্মেলনের প্রধান পৃষ্ঠপোষক ও আইইউবি বোর্ড অব ট্রাস্টির চেয়ারম্যান মি. দিদার হুসেইন; উপাচার্য অধ্যাপক এম তামিম; এবং উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড্যানিয়েল ডব্লিউ লুন্ড-এর নিরবচ্ছিন্ন উৎসাহ পুরো টিমকে প্রেরণা জুগিয়েছে।

যাঁদের অবদান এই আয়োজনকে সম্ভব করেছে, তাঁরা হলেন: সম্মানিত জেনারেল চেয়ার, অধ্যাপক রাইসুল আউয়াল মাহমুদ। জেনারেল চেয়ার, অধ্যাপক মো. মামুন হাবিব। প্রোগ্রাম চেয়ার, অধ্যাপক শাহরিয়ার কবির ও ড. রেজওয়ানুল আলম। কনফারেন্স সেক্রেটারিয়েটের ড. খালেদ সাইফুল্লাহ (চেয়ার), ড. মকবুল কাদের কোরায়েশী, ড. ইমতিয়াজ আহমেদ নেভিন, সীরাতুস সাবাহ, শামিল এম আল-ইসলাম, মো. আমিনুল ইসলাম, নাবিলা মারুফ, শায়লা তাজমিনুর, তারান্নুম আজিম, মো. তানভীর ইসলাম।

নির্বাহী সদস্যদের মধ্যে জান্নাতুল ফেরদৌস ঐশী, তামীম ফরহাদ শুভ, মো. সিরাতুন নবি রাজন, আমিনা বিনতে আউয়াল, নাফিসা ইয়াসমিন, আফরা বেগ, রুজাতিন শাবিলা কোরেশি।

ইন্ডাস্ট্রি আউটরিচ কমিটির চেয়ার ড. ফারজানা চৌধুরীর ও অর্গানাইজিং কমিটির চেয়ার ড. সামিনা কবিরের নেতৃত্বের দল দুটি সম্মেলনের নিখুঁত বাস্তবায়ন নিশ্চিত করেছে।

এ ছাড়া আরও অনেকে আছেন—সংখ্যায় এত বেশি যে তালিকাভুক্ত করা সম্ভব নয়—যাঁদের অবদান এই সম্মেলনের সাফল্যে ছিল সমান গুরুত্বপূর্ণ।

সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল একটি যৌথ স্বপ্ন: একটি উন্নত বাংলাদেশ গড়ার আকাঙ্ক্ষা। এই সম্মিলিত স্বপ্নই সবাইকে—উল্লিখিত ও অনুল্লেখিত—প্রেরণা জুগিয়েছে, যাঁদের অক্লান্ত পরিশ্রম এই ব্যতিক্রমী আয়োজনকে সফল করেছে।

  • এন এন তরুণ অর্থনীতির অধ্যাপক, ইন্ডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ। সাউথ এশিয়া জার্নালের এডিটর অ্যাট লার্জ। nntarun@gmail.com

দক্ষ সামষ্টিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা ছাড়া প্রবৃদ্ধি কেন ক্ষয়িষ্ণু হবে

সামষ্টিক অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনার বিপদটি যথাযথভাবে তুলে ধরেছিলেন পল ক্রুগম্যান (১৯৯৪) ও উইলিয়াম ইস্টারলি (২০০১)। তাঁরা সতর্ক করেছিলেন, সম্পদের অদক্ষ বণ্টন বাজার-উন্মুক্ততা ও বিনিয়োগ থেকে অর্জিত সুফলকে নষ্ট করতে পারে, যার ফলে উচ্চ সরকারি ব্যয়ের মধ্যেও অর্থনীতি স্থবির হয়ে পড়ে।

সুষ্ঠু সামষ্টিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা বলতে বোঝায় বিচক্ষণ রাজস্বনীতি, মুদ্রানীতি ও বিনিময় হারের নীতি। একটি দেশ টেকসই প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে পারবে কি না, তা নির্ভর করে সুষ্ঠু সামষ্টিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার ওপর। এই সুষ্ঠু সামষ্টিক সূচকগুলো তাহলে কী?

স্থিতিশীল মূল্যস্তর, নিয়ন্ত্রিত ঋণ এবং মোটামুটি একটি স্থির মুদ্রা। দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগকারীরা বিনিয়োগের আগে এই স্থিতিশীলতাই খতিয়ে দেখেন। বিপরীতে উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি, রাজস্ব শৃঙ্খলার অভাব বা মুদ্রার অস্থিরতা বিনিয়োগকারীদের দূরে ঠেলে দেয়, সঞ্চয় ক্ষয় করে এবং প্রণোদনা নষ্ট করে।

বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে রাজস্বঘাটতিতে ভুগছে, যা কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে পূরণ করা হচ্ছে—এতে মুদ্রাস্ফীতির চাপ বেড়েছে। ভর্তুকি, করছাড় ও রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোয় অকার্যকর ঋণ টিকে থাকার সরকারি নীতি রাজস্ব শৃঙ্খলা দুর্বল করেছে এবং বেসরকারি বিনিয়োগকে সীমিত করেছে।

সুস্থ সামষ্টিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করে, সম্পদ দুর্নীতিবাজদের কবলে বা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রকল্পে অপচয় না হয়ে উৎপাদনশীল খাতে প্রবাহিত হয়। রাজস্ব নীতির অগ্রাধিকার হওয়া উচিত অবকাঠামো, শিক্ষা ও উদ্ভাবন—জনতুষ্টিবাদী ভর্তুকি বা রাজনৈতিকভাবে প্রণোদিত ব্যয় নয়। মুদ্রানীতি এমন হতে হবে, যা প্রকৃত সুদের হার বজায় রেখে সঞ্চয়কে উৎসাহিত করে এবং ফাটকা কারবারকে নিরুৎসাহিত করে।

সাম্প্রতিক সময়ে শ্রীলঙ্কা সামষ্টিক অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনার এক উজ্জ্বল উদাহরণ হিসেবে দেখা দিয়েছে। কয়েক দশকে দেশটির সরকারি বেতনভুক্ত কর্মচারীর সংখ্যা নাটকীয়ভাবে বেড়েছে। তাঁদের অনেক পদ সৃষ্টি হয়েছিল উৎপাদনশীলতার জন্য নয়, বরং রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা নিশ্চিত করার জন্য। এই অন্যায্য সম্পদ বণ্টনের ফলে সরকারি অর্থ ব্যয় হয়েছে অবকাঠামো, প্রযুক্তি ও শিল্পোন্নয়নের মতো মূলধনি বিনিয়োগের পরিবর্তে বেতন, পেনশন ইত্যাদি খাতে।

রাজাপক্ষে পরিবার পরিচালিত সরকারগুলো ব্যাপকভাবে বড় অবকাঠামোগত প্রকল্প—বন্দর, বিমানবন্দর ও স্টেডিয়াম নির্মাণে মনোযোগ দেয়, যেগুলোর অনেকগুলোই চীনা ঋণে অর্থায়িত ছিল। এসব প্রকল্প ছিল মূলত আড়ম্বরপূর্ণ ও জনতুষ্টিবাদী উদ্যোগ, যা ঋণ বাড়ালেও সমানুপাতিক প্রবৃদ্ধি সৃষ্টি করতে পারেনি। ফলস্বরূপ, রপ্তানি বহুমুখীকরণ এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা সৃষ্টির মতো আরও উৎপাদনশীল বিনিয়োগ ক্ষেত্রগুলো উপেক্ষিত হয়। দীর্ঘস্থায়ী রাজস্বঘাটতি ও অপ্রয়োজনীয় ব্যয়ের ফলে ঋণ পরিষেবার বোঝা বাড়তে বাড়তে ২০২২ সালে শ্রীলঙ্কা ভয়াবহ ঋণসংকটে পড়ে, যা ব্যাপক গণ–অসন্তোষ সৃষ্টি করে এবং শেষ পর্যন্ত সরকারের পতন ডেকে আনে।

বাংলাদেশের বড় প্রকল্পগুলোর ক্ষেত্রে পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন। বাংলাদেশের বড় অবকাঠামো প্রকল্পগুলো সম্পূর্ণ অপ্রয়োজনীয় নয়; বরং এগুলো অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে, যা প্রবৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করেছে। দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশের সরকারি ঋণ তুলনামূলকভাবে মধ্যম স্তরে (জিডিপির প্রায় ৪০ শতাংশ) এবং বহিঃ ঋণ মূলত স্বল্পসুদে বা রেয়াতি শর্তে হওয়ায় ঋণ পরিশোধযোগ্য ছিল। বিপরীতে ২০২২ সালের মধ্যে শ্রীলঙ্কার ঋণ জিডিপির ১২০ শতাংশ ছাড়িয়ে যায় এবং দেশটি সার্বভৌম ঋণখেলাপিতে পড়ে।

গত দুই দশকের অধিকাংশ সময় বাংলাদেশ তুলনামূলকভাবে বিচক্ষণ রাজস্ব নীতি অনুসরণ করেছে। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোয় ভর্তুকি বৃদ্ধি, অদক্ষ রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান এবং রাজস্ব প্রবৃদ্ধির স্থবিরতার কারণে রাজস্ব চাপ ক্রমেই বেড়েছে। কোভিড-১৯-এর অভিঘাতের পর শ্রীলঙ্কা বৈদেশিক মুদ্রার সংকটে পড়ে। কারণ, তার অর্থনীতি অতিরিক্তভাবে পর্যটন ও রেমিট্যান্সের ওপর নির্ভরশীল ছিল। কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে কোভিডের ধাক্কা তুলনামূলকভাবে সীমিত ছিল। কারণ, পোশাক রপ্তানি ও প্রবাসী আয়ে গঠিত শক্তিশালী চলতি হিসাব ভারসাম্য খুব বড় আকারে বিঘ্নিত হয়নি।

গত দুই দশকের অধিকাংশ সময় বাংলাদেশ তুলনামূলকভাবে বিচক্ষণ রাজস্ব নীতি অনুসরণ করেছে। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোয় ভর্তুকি বৃদ্ধি, অদক্ষ রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান এবং রাজস্ব প্রবৃদ্ধির স্থবিরতার কারণে রাজস্ব চাপ ক্রমেই বেড়েছে। কোভিড-১৯-এর অভিঘাতের পর শ্রীলঙ্কা বৈদেশিক মুদ্রার সংকটে পড়ে। কারণ, তার অর্থনীতি অতিরিক্তভাবে পর্যটন ও রেমিট্যান্সের ওপর নির্ভরশীল ছিল। কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে কোভিডের ধাক্কা তুলনামূলকভাবে সীমিত ছিল। কারণ, পোশাক রপ্তানি ও প্রবাসী আয়ে গঠিত শক্তিশালী চলতি হিসাব ভারসাম্য খুব বড় আকারে বিঘ্নিত হয়নি।

শ্রীলঙ্কার রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মুদ্রার অতিমূল্যায়ন বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ নিঃশেষ করেছে এবং রপ্তানি খাতকে বিপর্যস্ত করেছে। অন্যদিকে বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রিত ভাসমান বিনিময়ব্যবস্থা—যা ২০২২ সাল থেকে বিলম্বিত সমন্বয় ও একাধিক বিনিময় হারের দ্বারা চিহ্নিত—একই অব্যবস্থাপনার অপেক্ষাকৃত কম কিন্তু ক্রমবর্ধমান ঝুঁকিপূর্ণ রূপ প্রতিফলিত করে।

দক্ষ সামষ্টিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা বলতে বোঝায় নীতির ধারাবাহিকতা, রাজস্ব স্বচ্ছতা, স্বাধীন কেন্দ্রীয় ব্যাংকিং, নিয়মভিত্তিক শাসন ও প্রাতিষ্ঠানিক শক্তি, যা আস্থা অর্জন, প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ ও আন্তর্জাতিক সহায়তা নিশ্চিত করতে অপরিহার্য। বাংলাদেশে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন হওয়া এবং অতিরিক্ত হস্তক্ষেপ অর্থনৈতিক প্রশাসনে আস্থার ঘাটতি তৈরি করেছে। সাম্প্রতিক আইএমএফ কর্মসূচি নিজেই দেরিতে সমন্বয়ের ও আত্মতুষ্টির নীতির মূল্য কতটা বড় হতে পারে, তার এক প্রকৃষ্ট উদাহরণ।

সামষ্টিক স্থিতিশীলতা কেবল প্রবৃদ্ধির হারসংক্রান্ত বিষয় নয়—এটি নির্ধারণ করে প্রবৃদ্ধি কতটা অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই হবে। বাংলাদেশে উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি ও রাজস্ব অব্যবস্থাপনা দীর্ঘদিন ধরেই বিদ্যমান। উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি, স্বল্প কর-জিডিপি অনুপাত (জিডিপির ৯ শতাংশেরও নিচে), ভর্তুকি ও সামাজিক সুরক্ষা, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও জলবায়ু সহনশীলতায় ব্যয় হ্রাস—এসবই দরিদ্র জনগোষ্ঠীর ওপর অপ্রতিসাম্য প্রভাব ফেলেছে, বাস্তব আয় কমিয়েছে এবং বৈষম্য বাড়িয়েছে। রাজস্ব অব্যবস্থাপনা রাষ্ট্রের সামাজিক সুরক্ষা ও মানবসম্পদ উন্নয়নে বিনিয়োগের সক্ষমতা সীমিত করেছে। এ পরিস্থিতি পুনর্বণ্টন, সরকারি বিনিয়োগ ও সামাজিক নিরাপত্তাকে বাধাগ্রস্ত করেছে, যার ফলে প্রকৃত দারিদ্র্য ও বৈষম্য বেড়েছে।

আমাদের মনে রাখতে হবে, সুশৃঙ্খল সামষ্টিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা কেবল বাজেট ভারসাম্য রক্ষা বা প্রযুক্তিগত কোনো বিষয় নয়; এটি গভীরভাবে রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক। এটি প্রতিফলিত করে সরকার কতটা দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় স্বার্থকে স্বল্পমেয়াদি রাজনৈতিক লাভের ঊর্ধ্বে স্থান দিতে সক্ষম। সুশৃঙ্খল ব্যবস্থাপনা রাজনীতি, প্রতিষ্ঠান ও প্রণোদনার মধ্যে ভারসাম্য সৃষ্টি করে, যা উদ্যোক্তা সৃষ্টি, উদ্ভাবন এবং সামগ্রিক উন্নয়নকে বিকশিত হওয়ার পরিবেশ প্রদান করে।

দক্ষিণ কোরিয়া ও ভিয়েতনামের মতো দেশগুলো টেকসই ও দ্রুত প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে মূলত তাদের রাজস্ব শৃঙ্খলা, রপ্তানি প্রতিযোগিতা ও নীতিগত বিশ্বাসযোগ্যতা বজায় রাখার মাধ্যমে; এমনকি রাজনৈতিক পরিবর্তনের সময়ও তারা এ ধারাবাহিকতা রক্ষা করেছে।

বিশ্বব্যাংক তার ২০২৪ ও ২০২৫ সালের বাংলাদেশ–সংক্রান্ত আপডেটে জরুরি ভিত্তিতে মুদ্রানীতি সংস্কার এবং একক বিনিময় হারের ব্যবস্থা প্রবর্তনের পরামর্শ পুনর্ব্যক্ত করেছে, যাতে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী করা ও মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হয়। তারা রাজস্ব আয় (দেশীয় সম্পদ আহরণ) বৃদ্ধি করার পরামর্শ দিয়েছে, যাতে অবকাঠামো ও মানবসম্পদ উন্নয়নে বিনিয়োগের জন্য অর্থ জোগান সম্ভব হয়। পাশাপাশি তারা বিশেষ করে আর্থিক খাতে সাহসী ও দ্রুত সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার ওপরও গুরুত্ব দিয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশের রাজস্বঘাটতি জিডিপির প্রায় ৪ দশমিক ৫ শতাংশের সমান। বিশ্বব্যাংক সতর্ক করেছে, রাজস্ব বৃদ্ধির দক্ষতা, মুদ্রানীতির শৃঙ্খলা এবং কাঠামোগত সংস্কার না হলে এই চাপ অব্যাহত থাকবে।

নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ রবার্ট সলো (১৯৫৬) তাঁর প্রবৃদ্ধি মডেলে দেখিয়েছিলেন, দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধি শুধু মূলধন ও শ্রমের ওপর নয়, বরং সম্পদ কতটা দক্ষভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে, তার ওপর নির্ভর করে, যা সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করে। কিন্তু বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি আলোচনায় দক্ষতার বিষয়টি খুব কমই গুরুত্ব পায়।

কয়েক দশক ধরে বাংলাদেশের অর্থনীতি তৈরি পোশাক রপ্তানি, প্রবাসী আয় ও জনমিতিক সুবিধার ওপর ভিত্তি করে সমৃদ্ধ হয়েছে। কিন্তু এই কম মূল্যের শ্রমনির্ভর ও রপ্তানিমুখী প্রবৃদ্ধির মডেল অনন্তকাল টিকে থাকবে না। পরবর্তী ধাপে প্রবৃদ্ধিকে টেকসই করতে হবে উদ্ভাবননির্ভর উন্নয়নের মাধ্যমে, যা নির্ভর করবে শৃঙ্খলাপূর্ণ সামষ্টিক ব্যবস্থাপনার ওপর।

দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজন বিশ্বাসযোগ্য প্রতিষ্ঠান, রাজস্ব শৃঙ্খলা এবং এমন প্রণোদনা, যা সম্পদকে উৎপাদনশীল খাতে প্রবাহিত করে—উন্নত সরকারি অর্থব্যবস্থা ও ব্যাংকিং শৃঙ্খলা, দুর্নীতি ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা হ্রাস এবং দক্ষতা ও উদ্ভাবনে অধিক বিনিয়োগের মাধ্যমে।

  • এন এন তরুণ অর্থনীতির অধ্যাপক, ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ। সাউথ এশিয়া জার্নালের এডিটর অ্যাট লার্জ। nntarun@gmail.com

Innovation or Stagnation: The 2025 Economics Nobel and the Future of Bangladesh

Published in South Asia Journal. October 25, 2025

This year’s Nobel laureates in economics — Joel Mokyr, Philippe Aghion, and Peter Howitt — received the prize for their research on, among other things, creative destruction. The idea that “destruction” itself can be creative was first presented as a theory by Harvard professor Joseph Schumpeter, who remains a favorite economist of millions, including myself.

What is this theory that has been discussed by students and teachers for generations?

Its central idea is that economic growth, the evolution of capitalism, and technological progress occur through a continuous cycle in which new technologies, products, institutions, or business models replace the old ones. Schumpeter placed particular emphasis on the role of the entrepreneur. Indeed, the entrepreneur is the driving force of innovation, because, according to Schumpeter, it is the entrepreneur who breaks down existing structures and reorganizes resources in new and more productive ways.

He considered the capitalist economy to be inherently dynamic. According to him, progress depends on continuous change — the decline of old industries, the emergence of new ones, and the replacement of outdated methods. Although this process is creative, it also has destructive aspects. Schumpeter warned of its negative consequences — such as economic instability, worker displacement, and political resistance from entrenched interest groups. Notably, these symptoms are now visible in Bangladesh.

Schumpeter elaborated on these ideas in his famous book Capitalism, Socialism and Democracy. In the same work, he also argued that capitalism would ultimately destroy itself as it evolved. He reasoned that the socio-psychological foundations of capitalism would gradually erode and eventually vanish. In this sense, his words seem to echo those of Karl Marx.

However, the causes he identified were different from Marx’s. Schumpeter argued that capitalist institutions, bureaucracies, and vested interests typically resist change. He further predicted that bureaucracy would eventually dominate industrial enterprises, diminishing the spirit of innovation. Massive inequality, he warned, would emerge — leading to public resistance and, consequently, increased state control and regulation. In other words, capitalism would meet its demise. Thus, Schumpeter suggested that the real challenge lies in sustaining the vitality and dynamism of innovation while skillfully managing its destructive outcomes. The downfall of capitalism, though undesirable, is an inevitable fate.

What did he say about socialism? He did not support Marx’s revolutionary communism, but he believed that through democratic and bureaucratic evolution — and due to the instability created by capitalism’s creative destruction — a form of socialism would gradually replace capitalism. This transformation, he argued, would occur peacefully. However, Schumpeter was skeptical about the efficiency of socialism. In his view, innovation under socialism would not be as dynamic as in capitalism, and the system would lack entrepreneurial energy.

The 2025 Nobel Prize in Economics was awarded “for explaining innovation-driven economic growth.” One part of the prize went to Joel Mokyr, while the other was jointly awarded to Philippe Aghion and Peter Howitt.

Mokyr identified the preconditions for sustained growth through technological progress. His research demonstrated how creative destruction becomes possible — what conditions allow innovations to build upon one another, and which social, cultural, and institutional factors sustain innovation over centuries. In particular, he showed that a knowledge-based culture, institutions that encourage freedom of exchange, and a mindset open to risk-taking are all crucial. Without these, the process of innovation can stagnate.

Philippe Aghion and Peter Howitt, in their model, explained how sustained growth can occur through Schumpeter’s theory of creative destruction. They transformed qualitative insights into a precise and analytically testable framework. These models help us understand how innovation generates growth from within the economy, how old institutions are displaced, how competition stimulates innovation, and how economic policies, institutions, and market structures influence this dynamism. The central premise of their theory is that growth emerges from a continuous cycle of innovation and destruction.

The Royal Swedish Academy awarded the prize to these three economists “for explaining innovation-driven economic growth.” The Academy noted that their work demonstrates that “economic growth cannot be taken for granted; it requires continuous effort,” and that “to avoid stagnation, the processes underpinning creative destruction must be kept alive.” They also explained how new products and discoveries accelerate economic growth.

To grasp the true significance of this Nobel-winning research, we must see how it builds upon Schumpeter’s original theory. Schumpeter’s framework was primarily philosophical and conceptual. Aghion and Howitt placed his ideas within a formal mathematical structure, allowing for quantitative analysis. Mokyr, on the other hand, added historical and institutional depth — exploring the long-term social, cultural, and scientific factors that make creative destruction possible. He identified the essential preconditions for sustaining innovation, encompassing cultural, institutional, and scientific dimensions.

The new research helps us understand which policies stimulate innovation and what their potential drawbacks are — for instance, how to preserve competition, how to design patent systems, how to address resistance from incumbents, and how institutions can remain open to new ideas. In this sense, their work represents a major advancement beyond Schumpeter’s original theory.

They also integrated Schumpeter’s ideas with more contemporary issues such as globalization, trade, openness, and the challenges of stagnation. The 2025 Nobel laureates’ research offers deep insights into why some economies, despite having access to technology, become stagnant or fail to innovate.

The celebrated 1992 article by economists Philippe Aghion and Peter Howitt, “A Model of Growth through Creative Destruction,” marked the birth of modern Schumpeterian growth theory. Through it, they transformed Schumpeter’s qualitative insights into a formal theoretical model. According to their framework, growth arises from a continuous process of innovation, in which new products and processes replace old and inefficient ones.

In earlier exogenous growth models, technological progress was treated as an external factor. Aghion and Howitt, however, made it endogenous — that is, driven by deliberate efforts and incentives. Firms invest in research and development to gain temporary monopoly power, but once superior technologies emerge, the old ones are replaced. Progress thus occurs through competition among innovators — a perpetual race in which success may be short-lived, yet society as a whole benefits from it.

While Aghion and Howitt presented the mechanics of innovation through formal models, economic historian Joel Mokyr explored its spirit. In his books The Lever of Riches and A Culture of Growth, Mokyr asked two profound questions: Why did the Industrial Revolution occur in Europe — and why did it endure? After years of research, he found his answer. He discovered that the Industrial Revolution was not merely a revolution in markets or machinery, but a revolution in thought, mindset, and culture.

According to Mokyr, Europe’s economic transformation emerged from a unique cultural and intellectual environment — one that valued curiosity, experimentation, and rational inquiry. The so-called “Republic of Letters” — a transnational network of scholars, scientists, and inventors across Europe — allowed knowledge to flow freely across borders. This openness gave rise to what Mokyr calls “the Industrial Enlightenment,” a period when scientific discovery and technological innovation began to reinforce one another.

For Mokyr, innovation is not merely an economic activity; it is a cultural institution. Progress occurs when a society rewards new ideas and tolerates the uncertainty that accompanies them. But where imitation, censorship, or fear of failure prevail, the light of creativity fades. His research offers a profound historical lesson: for sustainable growth, capital and labor alone are not enough — a thriving ecosystem of freedom, trust, and intellectual openness is equally essential.

What can Bangladesh learn from this research? The country’s garments industry has been the cornerstone of its industrialization. However, to remain competitive, it must increasingly rely on automation, design innovation, and environmentally sustainable production methods. Similarly, the rise of Bangladesh’s digital economy — from e-commerce to IT services — requires preparing young entrepreneurs to innovate.

Bangladesh’s growth model, driven by cheap labor and export-oriented production, though impressive, cannot be sustained indefinitely. The challenge now is to foster innovation-driven growth — one that depends not merely on physical infrastructure, but on creating an environment where creativity, experimentation, and entrepreneurial spirit can flourish.

Innovation or stagnation: The 2025 Economics Nobel & future of developing economies

Published on The finacial Express 25 October, 2025

This year’s Nobel Prize in Economics awarded to Joel Mokyr, Philippe Aghion, and Peter Howitt signifies recognition of substantial advancements in the field of innovation-driven economic growth. Their research is anchored in the concept of creative destruction, a theoretical framework first articulated by Joseph Schumpeter, a Harvard professor whose influence persists across generations of economists and scholars.

Schumpeter’s theory of creative destruction says that economic development, capitalist evolution, and technological progress materialise through a perpetual cycle of replacement, whereby emergent technologies, products, institutions, and business models supersede those that are obsolete. Central to this theoretical construct is the entrepreneur, whom Schumpeter identifies as the principal agent of innovation. Entrepreneurs disrupt entrenched structures and reallocate resources toward more productive uses, thereby catalysing economic transformation.

Schumpeter described capitalism as a system driven by constant change, where old industries fade, new ones emerge, and economic methods keep evolving. This process fuels innovation but also brings disruption—causing instability, job losses, and resistance from those who benefit from the old order. Similar patterns can be seen in today’s Bangladeshi economy.

In his seminal work, Capitalism, Socialism and Democracy, Schumpeter elaborated upon the mechanisms through which capitalism may ultimately undermine itself. He theorised that the socio-psychological underpinnings of capitalism would gradually erode, culminating in the system’s eventual dissolution—a perspective that exhibits conceptual resonance with Karl Marx,. Specifically, Schumpeter contended that institutional inertia, bureaucratic expansion, and entrenched interests hinder adaptive change, and predicted that bureaucratisation would supplant entrepreneurial vigour, thereby diminishing innovation. He further anticipated that pronounced inequality would incite public resistance, engendering expanded state intervention and regulatory frameworks, and thus precipitating the demise of capitalism.

For Schumpeter, the principal challenge lies in sustaining the dynamism of innovation while judiciously managing its destructive externalities. He regarded the eventual decline of capitalism as an inevitable, though undesirable, outcome.

Regarding socialism, Schumpeter did not support Marxian revolutionary communism; instead, he predicted that the instability generated by creative destruction, coupled with democratic and bureaucratic evolution, would facilitate a gradual and peaceful transition to a form of socialism. Nevertheless, he was sceptical about socialism’s capacity for innovation, arguing that the absence of entrepreneurial incentives would impede the system’s creative potential.

The 2025 Nobel Prize in Economics was conferred in recognition of research elucidating the mechanisms underpinning innovation-driven economic growth. Joel Mokyr identified the prerequisites for sustained technological advancement, demonstrating how creative destruction is contingent upon specific cultural, social, and institutional conditions. Mokyr emphasised the necessity of a knowledge-oriented culture, institutions that promote the free exchange of ideas, and a societal disposition conducive to risk-taking. Absent these factors, innovation is liable to stagnate.

Aghion and Howitt advanced Schumpeterian theory by constructing formal, analytically robust models that explicate how endogenous innovation engenders sustained economic growth. Their framework delineates the displacement of established institutions, the role of competition in stimulating innovation, and the influence of policy, institutional architecture, and market structure on economic dynamism. The central thesis posits that growth is the product of a continuous, self-renewing cycle of innovation and obsolescence.

The Royal Swedish Academy honoured the three economists “for explaining innovation-driven economic growth.” In its statement, the Academy stressed that economic growth is never automatic — it demands constant effort — and warned that “to prevent stagnation, the forces behind creative destruction must be kept alive.” Their collective research shows how new ideas, products, and discoveries can accelerate growth.

To appreciate the full importance of this Nobel-winning work, it must be viewed in relation to Schumpeter’s original theory. Schumpeter’s ideas were largely philosophical and conceptual. Aghion and Howitt transformed them into a formal mathematical model, enabling empirical and quantitative analysis. Mokyr complemented this by providing historical and institutional context, examining the long-term cultural, social, and scientific foundations that sustain innovation and make creative destruction possible.

The recent research deepens our understanding of which policies effectively promote innovation and what trade-offs they entail — such as how to maintain competition, design patent systems, overcome resistance from established firms, and ensure that institutions stay receptive to new ideas. In this respect, their work significantly extends Schumpeter’s original theory.

They also connected Schumpeter’s concepts to modern issues like globalisation, trade, openness, and the risk of economic stagnation. The 2025 Nobel laureates’ contributions shed light on why some economies, even with access to advanced technology, struggle to innovate or experience prolonged stagnation.

The landmark 1992 paper by Philippe Aghion and Peter Howitt, “A Model of Growth through Creative Destruction,” marked the foundation of modern Schumpeterian growth theory. It translated Schumpeter’s qualitative insights into a formal theoretical framework, showing that economic growth emerges from a continuous cycle of innovation in which new products and processes replace out dated and inefficient ones.

Earlier exogenous growth models treated technological progress as something that occurred outside the economic system. Aghion and Howitt, however, made it an internal—or endogenous—process, driven by purposeful actions and incentives. Firms invest in research and development to gain temporary monopoly advantages, but as better technologies emerge, older ones are displaced. Growth, therefore, results from on-going competition among innovators — a relentless race in which individual success is fleeting, yet society as a whole advances.

While Aghion and Howitt explained the mechanics of innovation through formal modeling, economic historian Joel Mokyr examined its underlying spirit. In his influential works The Lever of Riches and A Culture of Growth, Mokyr posed two fundamental questions: Why did the Industrial Revolution begin in Europe, and why did it persist? After extensive research, he concluded that the revolution was not merely economic or technological—it was intellectual and cultural.

Mokyr argued that Europe’s transformation was born from a distinct cultural and intellectual climate that celebrated curiosity, experimentation, and rational inquiry. The “Republic of Letters”—a transnational community of scholars, scientists, and inventors—enabled knowledge to circulate freely across borders. This openness fostered what Mokyr terms the “Industrial Enlightenment,” an era in which scientific progress and technological innovation became mutually reinforcing.

For Mokyr, innovation is more than an economic process — it is a cultural institution. Progress thrives when societies value fresh ideas and accept the risks that come with them. But when imitation, censorship, or fear of failure dominate, creativity withers. His work offers a timeless lesson: sustainable growth requires more than capital and labour — it also depends on a vibrant culture of freedom, trust, and intellectual openness.

What lessons should the developing countries like Bangladesh extract from the theories of this year’s Nobel Laureates? Bangladesh’s garment industry has long been the foundation of its industrial success. Yet, to stay competitive, it must increasingly embrace automation, design innovation, and environmentally responsible production. Likewise, the expansion of Bangladesh’s digital economy — from e-commerce to IT services — hinges on empowering young entrepreneurs to think creatively and innovate.

Bangladesh’s growth model, built on low-cost labour and export-led production, has achieved remarkable progress but cannot endure forever. The next phase of development must focus on innovation-driven growth — one that rests not only on physical infrastructure, but also on cultivating an environment where creativity, experimentation, and entrepreneurship can truly thrive.
Dr N N Tarun Chakravorty is a Professor of Economics at Independent University, Bangladesh. Editor-At-Large, South Asia Journal. nntarun@gmail.com

When Destruction Becomes Creative: The Big Ideas Behind The 2025 Nobel In Economics – OpEd

Published in EURASIA REVIEW 22 October, 2025

This year’s Nobel laureates in economics — Joel Mokyr, Philippe Aghion, and Peter Howitt — received the prize for their research on, among other things, creative destruction. The idea that “destruction” itself can be creative was first presented as a theory by Harvard professor Joseph Schumpeter, who remains a favorite economist of millions, including myself.

What is this theory that has been discussed by students and teachers for generations?

Its central idea is that economic growth, the evolution of capitalism, and technological progress occur through a continuous cycle in which new technologies, products, institutions, or business models replace the old ones. Schumpeter placed particular emphasis on the role of the entrepreneur. Indeed, the entrepreneur is the driving force of innovation, because, according to Schumpeter, it is the entrepreneur who breaks down existing structures and reorganizes resources in new and more productive ways.

He considered the capitalist economy to be inherently dynamic. According to him, progress depends on continuous change — the decline of old industries, the emergence of new ones, and the replacement of outdated methods. Although this process is creative, it also has destructive aspects. Schumpeter warned of its negative consequences — such as economic instability, worker displacement, and political resistance from entrenched interest groups. Notably, these symptoms are now visible in Bangladesh.

Schumpeter elaborated on these ideas in his famous book Capitalism, Socialism and Democracy. In the same work, he also argued that capitalism would ultimately destroy itself as it evolved. He reasoned that the socio-psychological foundations of capitalism would gradually erode and eventually vanish. In this sense, his words seem to echo those of Karl Marx.

However, the causes he identified were different from Marx’s. Schumpeter argued that capitalist institutions, bureaucracies, and vested interests typically resist change. He further predicted that bureaucracy would eventually dominate industrial enterprises, diminishing the spirit of innovation. Massive inequality, he warned, would emerge — leading to public resistance and, consequently, increased state control and regulation. In other words, capitalism would meet its demise. Thus, Schumpeter suggested that the real challenge lies in sustaining the vitality and dynamism of innovation while skillfully managing its destructive outcomes. The downfall of capitalism, though undesirable, is an inevitable fate.

What did he say about socialism? He did not support Marx’s revolutionary communism, but he believed that through democratic and bureaucratic evolution — and due to the instability created by capitalism’s creative destruction — a form of socialism would gradually replace capitalism. This transformation, he argued, would occur peacefully. However, Schumpeter was skeptical about the efficiency of socialism. In his view, innovation under socialism would not be as dynamic as in capitalism, and the system would lack entrepreneurial energy.

The 2025 Nobel Prize in Economics was awarded “for explaining innovation-driven economic growth.” One part of the prize went to Joel Mokyr, while the other was jointly awarded to Philippe Aghion and Peter Howitt.

Mokyr identified the preconditions for sustained growth through technological progress. His research demonstrated how creative destruction becomes possible — what conditions allow innovations to build upon one another, and which social, cultural, and institutional factors sustain innovation over centuries. In particular, he showed that a knowledge-based culture, institutions that encourage freedom of exchange, and a mindset open to risk-taking are all crucial. Without these, the process of innovation can stagnate.

Philippe Aghion and Peter Howitt, in their model, explained how sustained growth can occur through Schumpeter’s theory of creative destruction. They transformed qualitative insights into a precise and analytically testable framework. These models help us understand how innovation generates growth from within the economy, how old institutions are displaced, how competition stimulates innovation, and how economic policies, institutions, and market structures influence this dynamism. The central premise of their theory is that growth emerges from a continuous cycle of innovation and destruction.

The Royal Swedish Academy awarded the prize to these three economists “for explaining innovation-driven economic growth.” The Academy noted that their work demonstrates that “economic growth cannot be taken for granted; it requires continuous effort,” and that “to avoid stagnation, the processes underpinning creative destruction must be kept alive.” They also explained how new products and discoveries accelerate economic growth.

To grasp the true significance of this Nobel-winning research, we must see how it builds upon Schumpeter’s original theory. Schumpeter’s framework was primarily philosophical and conceptual. Aghion and Howitt placed his ideas within a formal mathematical structure, allowing for quantitative analysis. Mokyr, on the other hand, added historical and institutional depth — exploring the long-term social, cultural, and scientific factors that make creative destruction possible. He identified the essential preconditions for sustaining innovation, encompassing cultural, institutional, and scientific dimensions.

The new research helps us understand which policies stimulate innovation and what their potential drawbacks are — for instance, how to preserve competition, how to design patent systems, how to address resistance from incumbents, and how institutions can remain open to new ideas. In this sense, their work represents a major advancement beyond Schumpeter’s original theory.

They also integrated Schumpeter’s ideas with more contemporary issues such as globalization, trade, openness, and the challenges of stagnation. The 2025 Nobel laureates’ research offers deep insights into why some economies, despite having access to technology, become stagnant or fail to innovate.

The celebrated 1992 article by economists Philippe Aghion and Peter Howitt, “A Model of Growth through Creative Destruction,” marked the birth of modern Schumpeterian growth theory. Through it, they transformed Schumpeter’s qualitative insights into a formal theoretical model. According to their framework, growth arises from a continuous process of innovation, in which new products and processes replace old and inefficient ones.

In earlier exogenous growth models, technological progress was treated as an external factor. Aghion and Howitt, however, made it endogenous — that is, driven by deliberate efforts and incentives. Firms invest in research and development to gain temporary monopoly power, but once superior technologies emerge, the old ones are replaced. Progress thus occurs through competition among innovators — a perpetual race in which success may be short-lived, yet society as a whole benefits from it.

While Aghion and Howitt presented the mechanics of innovation through formal models, economic historian Joel Mokyr explored its spirit. In his books The Lever of Riches and A Culture of Growth, Mokyr asked two profound questions: Why did the Industrial Revolution occur in Europe — and why did it endure? After years of research, he found his answer. He discovered that the Industrial Revolution was not merely a revolution in markets or machinery, but a revolution in thought, mindset, and culture.

According to Mokyr, Europe’s economic transformation emerged from a unique cultural and intellectual environment — one that valued curiosity, experimentation, and rational inquiry. The so-called “Republic of Letters” — a transnational network of scholars, scientists, and inventors across Europe — allowed knowledge to flow freely across borders. This openness gave rise to what Mokyr calls “the Industrial Enlightenment,” a period when scientific discovery and technological innovation began to reinforce one another.

For Mokyr, innovation is not merely an economic activity; it is a cultural institution. Progress occurs when a society rewards new ideas and tolerates the uncertainty that accompanies them. But where imitation, censorship, or fear of failure prevail, the light of creativity fades. His research offers a profound historical lesson: for sustainable growth, capital and labor alone are not enough — a thriving ecosystem of freedom, trust, and intellectual openness is equally essential.

What can Bangladesh learn from this research? The country’s garments industry has been the cornerstone of its industrialization. However, to remain competitive, it must increasingly rely on automation, design innovation, and environmentally sustainable production methods. Similarly, the rise of Bangladesh’s digital economy — from e-commerce to IT services — requires preparing young entrepreneurs to innovate.

Bangladesh’s growth model, driven by cheap labor and export-oriented production, though impressive, cannot be sustained indefinitely. The challenge now is to foster innovation-driven growth — one that depends not merely on physical infrastructure, but on creating an environment where creativity, experimentation, and entrepreneurial spirit can flourish.

Dr. N N Tarun Chakravorty

Dr. N N Tarun Chakravorty is a Visiting Professor of Economics at Siberian Federal University, Russia. Editor-At-Large, South Asia Journal. He has studied Economics at The University of Leeds, London School of Economics and The University of Bath. As an economist has presented papers in several conferences arranged by Royal Economic Society, American Economic Association, UK-based Development Studies Association, Canadian Economics Association, Asia Pacific Region, Economic Congress of Russia etc.

এ বছরের অর্থনীতির নোবেল পুরস্কার এত গুরুত্বপূর্ণ কেন

Published in Prothom Alo 20 October, 2025

এ বছর নোবেল বিজয়ী জোয়েল মোকির, ফিলিপ আগিয়োঁ ও পিটার হাউইট যে গবেষণার জন্য পুরস্কারটা পেলেন, এর একটা অংশ হলো ক্রিয়েটিভ ডেস্ট্রাকশন, তথা সৃজনশীল ধ্বংস। ‘ধ্বংস’ও যে সৃজনশীল হতে পারে, তা একটা তত্ত্বের মাধ্যমে প্রথম দেখান হার্ভার্ড অধ্যাপক যোসেফ শমপিটার, যিনি আমার মতো কোটি কোটি মানুষের প্রিয় অর্থনীতিবিদ। কী সেই তত্ত্ব, যা যুগ যুগ ধরে ছাত্র-শিক্ষকের মুখে মুখে আলোচিত হয়ে আসছে?

এর মূল ধারণা হলো অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, পুঁজিবাদের বিকাশ ও প্রযুক্তিগত অগ্রগতি ঘটে এমন এক চক্রের মাধ্যমে, যেখানে নতুন প্রযুক্তি, পণ্য, প্রতিষ্ঠান বা ব্যবসায়িক মডেল পুরোনোদের প্রতিস্থাপন করে। শমপিটার উদ্যোক্তার ভূমিকাকে বিশেষভাবে গুরুত্ব দিয়েছিলেন। বস্তুত উদ্যোক্তাই উদ্ভাবনের মূল চালিকা শক্তি। কারণ, তাঁর মতে, উদ্যোক্তাই বিদ্যমান কাঠামোকে ভেঙে নতুন উপায়ে সম্পদের সমন্বয় ঘটান।

পুঁজিবাদী অর্থনীতিকে শমপিটার অন্তর্নিহিতভাবেই গতিশীল বিবেচনা করতেন। তাঁর মতে, অগ্রগতি নির্ভর করে ধারাবাহিক পরিবর্তনের ওপর—পুরোনো শিল্পের অবসান, নতুনের উদ্ভব এবং সেকেলে পদ্ধতির প্রতিস্থাপন। প্রক্রিয়াটি সৃজনশীল হলেও এর ধ্বংসাত্মক দিকও রয়েছেন। শমপিটার এর নেতিবাচক দিকগুলোর প্রতিও সতর্ক করেছিলেন, যেমন অর্থনৈতিক অস্থিরতা, শ্রমিকদের স্থানচ্যুতি ও প্রতিষ্ঠিত স্বার্থগোষ্ঠীর রাজনৈতিক প্রতিরোধ। প্রসঙ্গত বাংলাদেশে এই লক্ষণগুলো এখন দৃশ্যমান।

উপরিউক্ত ধারণা ও আলোচনা শমপিটার তাঁর বিখ্যাত ‘ক্যাপিটালিজম, সোশ্যালিজম অ্যান্ড ডেমোক্রেসি’ গ্রন্থে লিপিবদ্ধ করেন। একই বইয়ে তিনি এ-ও বলেন, ক্যাপিটালিজম বিকশিত হতে হতে একসময় নিজেকে নিজে ধ্বংস করে ফেলবে। তিনি যুক্তি দেখান, ধনতন্ত্রের সামাজিক-মনস্তাত্ত্বিক ভিতগুলো ক্ষয় হতে হতে নিঃশেষ হয়ে যাবে। এখানে তিনি যেন কার্ল মার্ক্সের কথার প্রতিধ্বনি করছেন।

যদিও কারণ হিসেবে শমপিটার যা বলেন, তা মার্ক্স থেকে ভিন্ন। শমপিটার বলেন, পুঁজিবাদী প্রতিষ্ঠান, আমলাতন্ত্র ও স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীগুলো সাধারণত পরিবর্তনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। তিনি আরও ভবিষ্যদ্বাণী করেন, শিল্পপ্রতিষ্ঠানে আমলাতন্ত্র দেখা দেবে, ফলে উদ্ভাবনের স্পৃহা কমে যাবে। সমাজে ব্যাপক ধনবৈষম্য দেখা দেবে। ফলে এর বিরুদ্ধে জনগণের আন্দোলনের মুখে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ ও কড়াকড়ি বেড়ে যাবে। অর্থাৎ ধনতন্ত্রের মৃত্যু ঘটবে। সে জন্যই শমপিটার ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, প্রকৃত চ্যালেঞ্জ হলো উদ্ভাবনের প্রাণশক্তি ও গতিশীলতা ধরে রাখা, একই সঙ্গে তার ধ্বংসাত্মক পরিণতিগুলোকে দক্ষভাবে নিয়ন্ত্রণ করা। কাঙ্ক্ষিত না হলেও পুঁজিবাদের ধ্বংস এক অমোঘ নিয়তি।

জোয়েল মোকির, ফিলিপ অ্যাগিয়ন ও পিটার হাউইট

জোয়েল মোকির, ফিলিপ অ্যাগিয়ন ও পিটার হাউইটনোবেল প্রাইজ ডট অর্গ

সমাজতন্ত্র সম্পর্কে শমপিটার কী বললেন? তিনি মার্ক্সের বিপ্লবাত্মক সাম্যবাদকে সমর্থন করেননি। তবে বিশ্বাস করতেন, গণতান্ত্রিক ও আমলাতান্ত্রিক বিকাশের ধারায়, পুঁজিবাদের সৃজনশীল ধ্বংস থেকে সৃষ্ট অস্থিরতার কারণে একধরনের সমাজতন্ত্র ধীরে ধীরে পুঁজিবাদকে প্রতিস্থাপন করবে। পরিবর্তনটি ঘটবে শান্তিপূর্ণ উপায়ে। শমপিটার সমাজতন্ত্রের দক্ষতা সম্পর্কে সন্দিহান ছিলেন। তাঁর মতে, সমাজতন্ত্রে উদ্ভাবন পুঁজিবাদের মতো গতিশীল হবে না, উদ্যোক্তা শক্তিরও ঘাটতি থাকবে।

২০২৫ সালের নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়েছে ‘উদ্ভাবননির্ভর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ব্যাখ্যা দেওয়ার জন্য’। পুরস্কারের এক অংশ পেয়েছেন জোয়েল মোকির, আর অপর অংশটি যৌথভাবে পেয়েছেন ফিলিপ আগিয়োঁ ও পিটার হাউইট।

মোকির প্রযুক্তিগত অগ্রগতির মাধ্যমে দীর্ঘস্থায়ী প্রবৃদ্ধির পূর্বশর্তগুলো শনাক্ত করেছেন। গবেষণায় তিনি দেখিয়েছেন, কীভাবে সৃজনশীল ধ্বংস সম্ভব হয়, কোন শর্ত উদ্ভাবনকে একটির ওপর আরেকটি নির্মাণের সুযোগ দেয় এবং কোন সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক উপাদান শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে উদ্ভাবনকে টিকিয়ে রাখে। বিশেষভাবে তিনি দেখিয়েছেন, জ্ঞানভিত্তিক সংস্কৃতি, মতবিনিময়ের স্বাধীনতা উৎসাহিত করা প্রতিষ্ঠান, ঝুঁকি নেওয়ার মানসিকতা ইত্যাদি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এসব না থাকলে উদ্ভাবনের প্রক্রিয়া স্থবির হয়ে যেতে পারে।

ফিলিপ আগিয়োঁ ও পিটার হাউইট তাঁদের মডেলে শমপিটারের ‘সৃজনশীল ধ্বংস’ তত্ত্বের মাধ্যমে স্থায়ী প্রবৃদ্ধি কীভাবে হতে পারে, তা ব্যাখ্যা করেছেন।গুণগত অন্তর্দৃষ্টিকে নির্দিষ্ট ও বিশ্লেষণযোগ্য কাঠামোর মধ্যে রূপ দিয়েছেন। এসব মডেল আমাদের বোঝাতে সাহায্য করে যে কীভাবে উদ্ভাবন অর্থনীতির ভেতর থেকেই প্রবৃদ্ধি সৃষ্টি করে, কীভাবে পুরোনো প্রতিষ্ঠানগুলো স্থানচ্যুত হয়, প্রতিযোগিতা কীভাবে উদ্ভাবনকে উৎসাহিত করে এবং অর্থনৈতিক নীতি, প্রতিষ্ঠান ও বাজারকাঠামো এই গতিশীলতাকে কীভাবে প্রভাবিত করে। প্রবৃদ্ধি যে অবিরাম উদ্ভাবন ও ধ্বংসের চক্র থেকে আসে—এ ধারণাই তত্ত্বটির মূল ভিত্তি।

রয়্যাল সুইডিশ একাডেমি ‘উদ্ভাবননির্ভর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ব্যাখ্যা’ দেওয়ার জন্য তিন অর্থনীতিবিদকে এই পুরস্কার প্রদান করেছে। বলেছে, বিজয়ীদের উদ্ভাবননির্ভর প্রবৃদ্ধিসংক্রান্ত কাজটি প্রমাণ করে, ‘অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ধরে নেওয়া যায় না, বরং প্রবৃদ্ধি অর্জনে নিরন্তর প্রচেষ্টা প্রয়োজন’, ‘অচলাবস্থা এড়াতে সৃজনশীল ধ্বংসের ভিত্তি গঠনকারী প্রক্রিয়াগুলো চালু রাখতে হবে’। ‘নতুন পণ্য ও আবিষ্কার কীভাবে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করে’, তাঁরা তা ব্যাখ্যা করেছেন।

শমপিটারের তত্ত্বের সঙ্গে এই নোবেল বিজয়ীদের গবেষণা কতটা নতুন সংযোজন, তা বোঝা দরকার। শমপিটারের তত্ত্ব ছিল মূলত দার্শনিক বা ধারণাগত। আগিয়োঁ ও হাউইট তাঁর ধারণাকে গাণিতিক কাঠামোর মধ্যে স্থাপন করেছেন, যার ফলে পরিমাণগত অধ্যয়ন সম্ভব হয়েছে। মোকির যোগ করেছেন ঐতিহাসিক ও প্রাতিষ্ঠানিক গভীরতা, যা দীর্ঘ সময় ধরে সমাজজুড়ে দৃশ্যমান থাকে, যা সৃজনশীল ধ্বংসকে সম্ভব করে তোলে। তিনি উদ্ভাবনকে টিকিয়ে রাখার জন্য পূর্বশর্তগুলো আবিষ্কার করেছেন, যার মধ্যে আছে সাংস্কৃতিক, প্রাতিষ্ঠানিক ও বৈজ্ঞানিক সব উপাদান।

নতুন কাজটি আমাদের বুঝতে সাহায্য করে, কোন নীতি উদ্ভাবনকে উসকে দেয় এবং এর সুবিধাগুলো কী, যেমন প্রতিযোগিতা কীভাবে সংরক্ষণ করা যায়, পেটেন্ট কীভাবে ডিজাইন করা উচিত, পদস্থদের প্রতিরোধ কীভাবে মোকাবিলা করা উচিত, প্রতিষ্ঠানগুলো কীভাবে নতুন ধারণার জন্য উন্মুক্ত হওয়া উচিত। এভাবে শমপিটারের তত্ত্বের চেয়ে তাঁদের কাজ একটি বিরাট অগ্রগতি।

তাঁরা শমপিটারের ধারণার সঙ্গে আরও আধুনিক বিষয় যুক্ত করেছেন, যেমন বিশ্বায়ন, বাণিজ্য, উন্মুক্ততা, স্থবিরতার চ্যালেঞ্জ ইত্যাদি প্রযুক্তি থাকা সত্ত্বেও কেন কিছু অর্থনীতি স্থবির হয়ে পড়ে বা উদ্ভাবনে ব্যর্থ হয়, ২০২৫ সালের নোবেল বিজয়ীদের গবেষণা এসব বিষয়ে গভীর অন্তর্দৃষ্টি প্রদান করে।

১৯৯২ সালে প্রকাশিত অর্থনীতিবিদ ফিলিপ আগিয়োঁ ও পিটার হাউইটের বিখ্যাত আর্টিকেল ‘আ মডেল অব গ্রোথ থ্রু ক্রিয়েটিভ ডেস্ট্রাকশন’ বর্তমানের শমপিটারিয়ান গ্রোথ থিওরির জন্মের সূচনা করে। এর মাধ্যমে তাঁরা শমপিটারের গুণগত অন্তর্দৃষ্টিকে একটি আনুষ্ঠানিক তত্ত্বে রূপান্তর করেন। তাঁদের মডেল অনুসারে, প্রবৃদ্ধি আসে একটি ধারাবাহিক উদ্ভাবনপ্রক্রিয়ার মাধ্যমে, যেখানে নতুন পণ্য ও প্রক্রিয়া পুরোনো ও অকার্যকরগুলোর স্থান নেয়।

আগের ‘এক্সোজেনাস গ্রোথ মডেলে’ প্রযুক্তিগত অগ্রগতিকে বহিস্থ উপাদান হিসেবে দেখা হতো—আগিয়োঁ ও হাউইটের সেটিকে ধরেছেন অন্তর্গত অর্থাৎ নির্দিষ্ট লক্ষ্যে পরিচালিত প্রচেষ্টা ও প্রণোদনা থেকে উদ্ভূত। প্রতিষ্ঠানগুলো গবেষণা ও উন্নয়নে বিনিয়োগ করে অস্থায়ী একচেটিয়া ক্ষমতা অর্জন করে বটে, কিন্তু যখনই আরও উন্নত প্রযুক্তি-উদ্ভাবন আসে, পুরোনোগুলো প্রতিস্থাপিত হয়ে যায়। এভাবে অগ্রগতি ঘটে উদ্ভাবকদের মধ্যে প্রতিযোগিতার মাধ্যমে এবং এটি একটি চিরস্থায়ী দৌড়, যেখানে সাফল্য ক্ষণস্থায়ী হলেও সমাজের জন্য তা উপকারী।

আগিয়োঁ ও হাউইট যখন উদ্ভাবনের যান্ত্রিক দিকটি মডেল আকারে উপস্থাপন করেছিলেন, অর্থনৈতিক ইতিহাসবিদ জোয়েল মোকির তখন অনুসন্ধান করেছেন এর ‘আত্মা’। তাঁর বই ‘দ্য লিভার অব রিচেজ’ ও ‘আ কালচার অব গ্রোথ’-এ মোকির প্রশ্ন তুলেছেন, ইউরোপে কেন শিল্পবিপ্লব ঘটেছিল এবং কেন তা টিকে ছিল? দীর্ঘ গবেষণা শেষে এর উত্তর মিলেছে। তিনি দেখেছেন, শুধু বাজারে বা যন্ত্রে নয়, বরং ‘শিল্পবিপ্লব’ মানে বিপ্লব ঘটেছিল ভাবনায়, মননে, সংস্কৃতিতে।

মোকিরের মতে, ইউরোপের অর্থনৈতিক রূপান্তর এসেছিল একটি অনন্য সাংস্কৃতিক ও বৌদ্ধিক পরিবেশ থেকে, যেখানে কৌতূহল, পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও যুক্তিনিষ্ঠ অনুসন্ধানকে মূল্য দেওয়া হতো। তথাকথিত ‘রিপাবলিক অব লেটারজ’ ইউরোপজুড়ে পণ্ডিত, বিজ্ঞানী ও উদ্ভাবকদের এক আন্তদেশীয় নেটওয়ার্ক-জ্ঞানকে সীমান্ত পেরিয়ে অবাধে প্রবাহিত হতে সাহায্য করেছিল। এই উন্মুক্ততাই জন্ম দিয়েছিল মোকিরের ভাষায় ‘ইন্ডাস্ট্রিয়াল এনলাইটেনমেন্ট’, যেখানে বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার ও প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন একে অপরকে শক্তিশালী করতে শুরু করে।

মোকিরের জন্য উদ্ভাবন শুধু একটি অর্থনৈতিক কার্যকলাপ নয়; এটি একটি সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান। অগ্রগতি ঘটে তখনই, যখন সমাজ নতুন ধারণাকে পুরস্কৃত করে এবং তার সঙ্গে আসা অনিশ্চয়তাকে সহ্য করে। কিন্তু যেখানে অনুকরণ, সেন্সরশিপ বা ব্যর্থতার ভয় প্রাধান্য পায়, সেখানেই সৃজনশীলতার আলো ম্লান হয়ে যায়। তাঁর গবেষণা একটি গভীর ঐতিহাসিক শিক্ষা দেয়—টেকসই প্রবৃদ্ধির জন্য শুধু পুঁজি ও শ্রমই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন স্বাধীনতা, বিশ্বাস ও বৌদ্ধিক উন্মুক্ততার একটি বাস্তুতন্ত্র।

বাংলাদেশ কী শিখবে এ গবেষণা থেকে? বাংলাদেশের পোশাকশিল্প তার শিল্পায়নের মূল ভিত্তি। কিন্তু প্রতিযোগিতা ধরে রাখতে হলে এখন ক্রমবর্ধমানভাবে নির্ভর করতে হবে স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি, নকশাগত উদ্ভাবন ও পরিবেশবান্ধব উৎপাদন–প্রণালির ওপর। একইভাবে দেশের ডিজিটাল অর্থনীতির উত্থান ও ই-কমার্স থেকে শুরু করে আইটি সেবা খাত পর্যন্ত তরুণ উদ্যোক্তাদের উদ্ভাবনে প্রস্তুত করতে হবে। বাংলাদেশের সস্তা শ্রম ও রপ্তানিনির্ভর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, যতই প্রশংসনীয় হোক না কেন, তা অনন্তকাল ধরে টিকবে না। এখন চ্যালেঞ্জ হলো উদ্ভাবননির্ভর প্রবৃদ্ধি গড়ে তোলা, যা কেবল অবকাঠামোগত উন্নয়নের ওপর নির্ভর করে না; বরং এমন একটি পরিবেশের প্রয়োজন, যেখানে সৃজনশীলতা, পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও উদ্যোক্তা মনোভাব বিকশিত হতে পারে।

  • এন এন তরুণ অর্থনীতির অধ্যাপক, ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ। সাউথ এশিয়া জার্নালের এডিটর অ্যাট লার্জ। nntarun@gmail.com

কানাডা-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্যযুদ্ধে প্রবাসী বাংলাদেশিদের উদ্বেগ কেন

Published in Prothom Alo 13 October, 2025

কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিপক্ষীয় অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিশ্বের অন্যতম ঘনিষ্ঠ ও গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক অংশীদারত্ব, যেখানে ২০২৩ সালে প্রতিদিনের পণ্য ও সেবার লেনদেন দুই বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি। মোট বাণিজ্যের পরিমাণ ৯০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার (ঐতিহাসিক সর্বোচ্চ)। যুক্তরাষ্ট্রের মোট পণ্য বাণিজ্যের ১৫ শতাংশ আসে কানাডা থেকে। কানাডার ৭৫ শতাংশ রপ্তানি পণ্য যায় যুক্তরাষ্ট্রে। দ্বিপক্ষীয় এ বাণিজ্যের মূল খাত অটোমোটিভ, জ্বালানি, কৃষি। যুক্তরাষ্ট্রের অপরিশোধিত তেল আমদানির ৬০ শতাংশের বেশি সরবরাহ করে কানাডা। দুই দেশের মধ্যে গাড়ির যন্ত্রাংশ সীমান্ত অতিক্রম করে একাধিকবার।

কিন্তু এ পারস্পরিক নির্ভরশীলতার সম্পর্কটি বাণিজ্যিক টানাপোড়েন থেকে মুক্ত থাকতে পারেনি। ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক জাতীয়তাবাদ, শিল্প পুনর্গঠন এবং বৈশ্বিক নীতির নতুন পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে এ ধরনের টানাপোড়েন আরও ঘন ঘন দেখা দিচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে আলোচিত ‘বাণিজ্যযুদ্ধ’ আমাদের চোখে আনে উদার আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ভঙ্গুরতা। আবার একই সঙ্গে দীর্ঘদিনের মিত্রদেশগুলোর মধ্যকার প্রাতিষ্ঠানিক স্থিতিস্থাপকতার দিকটিও স্পষ্ট করে। কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য–বিরোধ ইস্যুটি প্রথম প্রকাশ্যে আসে ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর।

যদিও জনসমক্ষে আলোচনায় প্রায়ই যুক্তরাষ্ট্র-চীন বাণিজ্য উত্তেজনা প্রাধান্য পায়। তবু কানাডা-যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক সম্পর্ক দীর্ঘ ইতিহাসে নানা বিরোধ দ্বারা চিহ্নিত হয়ে আছে, যা ট্রাম্পের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার আগে সামনে আসেনি। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হলো ১৯৬০-এর দশকের তথাকথিত ‘চিকেন ওয়ার’ এবং দীর্ঘস্থায়ী সফটউড লাম্বার নিয়ে বিরোধ। ২০১৭ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত সময়কাল, অর্থাৎ ট্রাম্প প্রশাসনের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ অর্থনৈতিক নীতির যুগ একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় তৈরি করে। যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেড এক্সপানশন অ্যাক্টের সেকশন ২৩২–এর আওতায় জাতীয় নিরাপত্তার অজুহাতে কানাডিয়ান ইস্পাত ও অ্যালুমিনিয়ামের ওপর শুল্ক আরোপ করা হয়। এর প্রতিক্রিয়ায় কানাডা পাল্টা ব্যবস্থা নেয় এবং দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের গতিশীলতায় পরিবর্তন আসে।

২০১৮ সালের মার্চ মাসে যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসন সেকশন ২৩২-এর আওতায় কানাডিয়ান ইস্পাতের ওপর ২৫ শতাংশ ও অ্যালুমিনিয়ামের ওপর ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করে। এর জবাবে কানাডা যুক্তরাষ্ট্রের কিছু নির্বাচিত পণ্যের ওপর পাল্টা শুল্ক আরোপ করে। এ পদক্ষেপগুলো বিদ্যমান সাপ্লাই চেইনকে ব্যাহত করে এবং দুই দেশের অর্থনীতি ও রাজনীতিতে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলে। ফলে উভয় দেশ সক্রিয়ভাবে প্রতিক্রিয়া জানায়।

চার দশকের বেশি সময় ধরে চলমান এ বিরোধের কেন্দ্রে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ—কানাডা তার সফটউড লাম্বার খাতকে ভর্তুকি দিচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র বারবার কানাডার ডেইরি, ডিম ও মুরগির জন্য চালু করা সরবরাহ ব্যবস্থাপনা নীতিকে সমালোচনা করেছে এবং একে বাজারে প্রবেশাধিকারের প্রতিবন্ধকতা হিসেবে দেখিয়েছে। দুই দেশের এ টানাপোড়েনে দেখা দিয়েছে ইস্পাত ও অ্যালুমিনিয়ামে দামের অস্থিতিশীলতা। সফটউড লাম্বারে শুল্ক আরোপের ফলে যুক্তরাষ্ট্রে আবাসন ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে শুধু ২০১৮ সালেই কানাডায় প্রায় ২৩ হাজার চাকরি ঝুঁকির মুখে পড়ে।

একই প্রভাব যুক্তরাষ্ট্রেও, বিশেষত কানাডিয়ান মধ্যবর্তী পণ্যের ওপর নির্ভরশীল শিল্পে। কাঠামোগত কারণ ও কৌশলগত স্বার্থ কানাডা-যুক্তরাষ্ট্র দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য–বিরোধের স্থায়িত্ব ও বিবর্তনকে কয়েকটি দীর্ঘমেয়াদি ও উদীয়মান কারণে আকার দিচ্ছে।

যেমন অর্থনৈতিক জাতীয়তাবাদের উত্থান। ২০১৬ সালের পর যুক্তরাষ্ট্রে সুরক্ষাবাদী অর্থনৈতিক নীতি ও শিল্প বিচ্ছিন্নকরণের (ইন্ডাস্ট্রি ডিকাপ্লিং) প্রবণতা জোরদার হয়েছে। ‘বাই আমেরিকান’ তথা ‘আমেরিকান পণ্য কেনো’ ধরনের নীতি উত্তর আমেরিকার সাপ্লাই চেইন সংহতকরণের মডেলের জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।

এসব ঘটনার পরও বিরোধ নিষ্পত্তির প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো—যেমন জেনারেল অ্যাগ্রিমেন্ট অন ট্যারিফস অ্যান্ড ট্রেড (গ্যাট), ওয়ার্ল্ড ট্রেড অর্গানাইজেশন (ডব্লিউটিও) এবং নর্থ আমেরিকান ফ্রি ট্রেড অ্যাগ্রিমেন্ট (নাফটা), পরে যার পরিবর্তে আসে ইউনাইটেড স্টেটস-মেক্সিকো-কানাডা অ্যাগ্রিমেন্ট (ইউএসএমসিএ)—দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যিক সংঘাত নিয়ন্ত্রণ ও প্রশমনে কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করে আসছে, যা কানাডার কোটার বণ্টন পদ্ধতির কিছু দিককে চুক্তির শর্তাবলির সঙ্গে অসংগত ঘোষণা করে এবং নীতি সংশোধনের নির্দেশ দেয়। এতে কঠোরতর উৎস নিয়ম, একটি ‘সানসেট ক্লজ’ ও পুনর্গঠিত বিরোধ নিষ্পত্তিপ্রক্রিয়া অন্তর্ভুক্ত হয়। এসব পরিবর্তন নতুন ধরনের নিয়ন্ত্রক অনিশ্চয়তা তৈরি করে এবং দুই দেশের অর্থনৈতিক অংশীদারদের জন্য কৌশলগত পুনর্গঠন অপরিহার্য করে তোলে।

কিন্তু একাধিক বিরোধ নিষ্পত্তিপ্রক্রিয়ায় আশাপ্রদ ফল পাওয়া যায়নি; বরং জুলাই ২০২৩ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র কানাডিয়ান সফটউড লাম্বারের ওপর অ্যান্টিডাম্পিং ও কাউন্টারভেইলিং শুল্ক বজায় রাখে, যার গড় ৮ দশমিক ৫৯ শতাংশ।

যুক্তরাষ্ট্রের নীতিগত অস্থিরতার ঝুঁকির কারণে কানাডা রপ্তানি বাজারকে বৈচিত্র্যময় করার প্রচেষ্টা বাড়িয়েছে এবং পদ্ধতিগত ঝুঁকি হ্রাস করা ও যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতা কমানোর চেষ্টা করছে। এ লক্ষ্যে সিপিটিপিপি এবং সিইটিএ প্রোগ্রামের মাধ্যমে এশিয়া-প্যাসিফিক ও ইউরোপীয় অঞ্চলে বহুপক্ষীয়, বহুমুখী ও বহুখাতীয় চুক্তির আওতায় রপ্তানি বৃদ্ধি করার চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে।

কানাডার জন্য অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব জোরদার করা মানে হলো উদ্ভাবনকে অগ্রাধিকার দেওয়া, কৌশলগত খাতে বিনিয়োগ করা এবং বৈচিত্র্যময় বাণিজ্য সম্পর্ক গড়ে তোলা। যুক্তরাষ্ট্রের জন্য চ্যালেঞ্জ হলো অভ্যন্তরীণ শিল্পনীতির প্রয়োজনীয়তা ও সমন্বিত মহাদেশীয় সাপ্লাই চেইন থেকে প্রাপ্ত দক্ষতার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা।

কানাডা-যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক বাণিজ্য–বিরোধের বিশ্লেষণ থেকে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত শিক্ষা পাওয়া যায়, যা অন্যান্য দেশের জন্যও প্রযোজ্য।

দ্বিপক্ষীয় অর্থনৈতিক সম্পর্কের স্থিতিশীলতা মূলত প্রাতিষ্ঠানিক ও নিয়মভিত্তিক ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল। একতরফা শুল্ক আরোপ ও বিরোধ নিষ্পত্তিপ্রক্রিয়া এড়িয়ে চলা বাজার আস্থাকে ক্ষুণ্ন করে এবং দীর্ঘমেয়াদি সমৃদ্ধিকে হুমকির মুখে ফেলে।

কানাডার জন্য অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব জোরদার করা মানে হলো উদ্ভাবনকে অগ্রাধিকার দেওয়া, কৌশলগত খাতে বিনিয়োগ করা এবং বৈচিত্র্যময় বাণিজ্য সম্পর্ক গড়ে তোলা। যুক্তরাষ্ট্রের জন্য চ্যালেঞ্জ হলো অভ্যন্তরীণ শিল্পনীতির প্রয়োজনীয়তা ও সমন্বিত মহাদেশীয় সাপ্লাই চেইন থেকে প্রাপ্ত দক্ষতার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা।

অর্থনৈতিকভাবে পারস্পরিক নির্ভরশীল মিত্রদেশগুলোর মধ্যেও বাণিজ্যিক উত্তেজনা উদার আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক কাঠামোর ভঙ্গুরতা প্রকাশ করে। অভিযোজন, বিচক্ষণ নীতি ও ধারাবাহিক কূটনৈতিক সম্পৃক্ততা এ সম্পর্কের স্থায়িত্বের জন্য অপরিহার্য।

আগামী দিনে জলবায়ু-সম্পর্কিত বাণিজ্যনীতি, ডিজিটাল বাণিজ্য ও গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদের ভূরাজনীতি বিদ্যমান প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর অভিযোজন ক্ষমতাকে পরীক্ষা করবে।

২০২৪ সাল পর্যন্ত কানাডার প্রধানমন্ত্রী ট্রুডো ও মার্কিন প্রেসিডেন্ট বাইডেন উভয়ের সরকারি বক্তব্যে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সহযোগিতার প্রতি অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে। যদিও দেশীয় ও বৈশ্বিক চাপ অব্যাহত রয়েছে। কানাডা-যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য সম্পর্ক প্রায়ই অর্থনৈতিক সংহতির মডেল হিসেবে বিবেচিত হলেও এটি নিয়মিত বিরোধ ও অভিযোজনের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠে। সাম্প্রতিক বিরোধ উত্তর আমেরিকার বাণিজ্যকাঠামোর শক্তি ও দুর্বলতা উভয়কেই স্পষ্ট করেছে। নীতিনির্ধারক ও গবেষকদের জন্য এ অভিজ্ঞতা শিক্ষা দেয় যে এক অনিশ্চয়তার যুগে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, প্রমাণভিত্তিক নীতি এবং দূরদর্শী অর্থনৈতিক কূটনীতি অপরিহার্য।

উত্তর আমেরিকায় বাংলাদেশিদের সংগঠন ফোবানা তার ২০২৫-এর সম্মেলনের আয়োজন করে মন্ট্রিয়ল শহরে। তিন দিনব্যাপী এ সম্মেলন শুরু হয় গত ২৯ আগস্ট। ৩০ আগস্ট নির্ধারিত ছিল সেমিনার সিরিজ।

রঙ্গরসপ্রিয় বাঙালি গানবাজনা-নৃত্যের বিনোদন বাদ দিয়ে সম্মেলনের একটি অংশ রেখেছে সেমিনারের জন্য এবং উত্তর আমেরিকার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকদের বা সরকারের নীতিনির্ধারক পর্যায়ের বিশেষজ্ঞদের আমন্ত্রণ জানিয়েছে। এর মানে হলো আয়োজকেরা একটি জ্ঞানভিত্তিক সমাজ নির্মাণের আকাঙ্ক্ষা পোষণ করেন।

এর প্রধান কৃতিত্ব সেমিনার সিরিজের সমন্বয়ক অণুজীব বিজ্ঞানী ড. শোয়েব সাঈদের, যিনি অনেক দিন ধরে এ কঠিন কাজটি করে আসছেন। কিন্তু সেমিনারের কার্যকরী পর্ষদের সদিচ্ছা-সহযোগিতা ছাড়া এটা সম্ভব হতো না। পর্ষদের সভাপতি জিয়াউল হক জিয়া, মেম্বার সেক্রেটারি ইকবাল কবীর, কালচারাল ডিরেক্টর শামসাদ রানা, ফোবানার কেন্দ্রীয় সভাপতি আতিকুর রহমান, নির্বাহী সচিব নেহাল রহিম, কেন্দ্রীয় কর্মকর্তা বেদারুল ইসলাম বাবলাসহ অসংখ্য মানুষের অক্লান্ত পরিশ্রমে অনুষ্ঠানটি সফল হতে পেরেছে।

চারটি সেশনের একটির আলোচ্য বিষয় ছিল ‘অর্থনৈতিক জাতীয়তাবাদের যুগে যুক্তরাষ্ট্র-কানাডা বাণিজ্যযুদ্ধ’। এই সেশনে আমাকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল কি-নোট স্পিচ দেওয়ার জন্য। সেশন চেয়ার ছিলেন ম্যাকগিল ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ও কানাডিয়ান ইকোনমিকস অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক প্রেসিডেন্ট জন গ্যালব্রেইথ। বিষয় নির্ধারণ থেকেই বোঝা যায়, কানাডায় বসবাসরত বাংলাদেশি নাগরিকেরা যুক্তরাষ্ট্র-কানাডা বাণিজ্যযুদ্ধে উদ্বিগ্ন।

এ নিবন্ধ আমার বক্তৃতার অংশ। বক্তৃতায় আমি বলেছি, এ উদ্বিগ্ন হওয়াটা ভালো লক্ষ্মণ। তাঁদের পরামর্শ দিয়েছি, কানাডার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ডিগ্রি বা প্রশিক্ষণ নিয়ে কানাডার চাকরির বাজারে ঢুকে যেতে এবং রাষ্ট্রের আদর্শ, সমাজের মূল্যবোধ ধারণ করে মনেপ্রাণে কানাডার নাগরিক হয়ে গিয়ে অবদান রাখতে। বাংলাদেশে বৈধ পন্থায় অর্থ পাঠানো বা বিনিয়োগ করার পরামর্শও দিয়েছি।

কানাডা সরকার জানে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যযুদ্ধে কী করতে হবে। তারপরও আমি কয়েকটি পরামর্শ দিয়েছি, যা নীতিনির্ধারকের আলোচনার বা কর্মপরিকল্পনায় চোখে পড়ে না। সব খাতে নিজস্ব শিল্প গড়ে তুলতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তেল শোধনে বা গাড়ির যন্ত্রাংশ ভাগাভাগির নীতি বাদ দিতে হবে। প্রতিটি খাতে ৫০ বছরের পুরোনো নীতি অনুসরণ করা হচ্ছে। এই নীতি বর্তমান সময়ের সঙ্গে হালনাগাদ করতে হবে। প্রাইভেট-পাবলিক পার্টনারশিপ ও সরকারি তত্ত্বাবধানে ব্যক্তি খাতের উদ্যোগ নীতি গ্রহণ করতে হবে।

  • এন এন তরুণ অর্থনীতির অধ্যাপক, ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ। সাউথ এশিয়া জার্নালের এডিটর অ্যাট লার্জ
    nntarun@gmail.com

সংস্কারের বছরের বাজেটেও কোনো সংস্কারের ইঙ্গিত নেই

অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট উপস্থাপন করেন এমন এক সময়ে, যখন শেখ হাসিনার স্বৈরাচারী শাসনের পতনের পর দেশ এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ অতিক্রম করছে। এ অবস্থায় যখন বহু প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার প্রক্রিয়াধীন এবং সালেহউদ্দিন আহমেদ একজন অর্থনীতিবিদ, সাবেক আমলা ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর, তখন তাঁর উপস্থাপিত বাজেটে কোনো দূরদর্শী সংস্কারের ইঙ্গিত না থাকা অত্যন্ত বিস্ময়কর বটে। এই বাজেট বরং অতীতের ধারাবাহিকতা ধরে রাখা এক হতাশাজনক দলিল। অর্থাৎ যথা পূর্বং তথা পরং।

এতে নেই ভবিষ্যতের দিকনির্দেশনা, নেই কোনো সংস্কার পরিকল্পনার প্রতিফলন। উন্নত দেশের অর্থমন্ত্রীরা সবাই পেশায় অর্থনীতিবিদ না হলেও তাঁরা অর্থনীতিতে গভীর জ্ঞানের অধিকারী। তাঁরা কোনো অর্থনৈতিক তত্ত্বের আলোকে বাজেট প্রণয়ন করেন এবং নতুন কোনো উন্নয়ন কৌশলের প্রস্তাব করেন।

উদাহরণস্বরূপ, হার্ভার্ডের অধ্যাপক, জোসেফ শমপিটার তাঁর কর্মজীবনের প্রথম দিকে ১৯১৯ সালে অস্ট্রিয়ান সরকারের অর্থমন্ত্রী হন। তখন তিনি আরেক অস্ট্রিয়ান সমাজবিজ্ঞানী রুডলফ গোল্ডশাইডের একটি বিখ্যাত তত্ত্ব, রাজস্ব সমাজবিজ্ঞানের ধারণাটি প্রয়োগ করে বাজেট প্রণয়ন করেন। ২০২৫-২৬ বাজেটে এসবের অস্তিত্ব নেই। এটি একটি নিছক রক্ষণশীল রাজস্ব ব্যবস্থাপনা, যেখানে প্রকৃত আর্থসামাজিক পরিবর্তনের কোনো ধারণারও স্থান নেই।

আমরা আশা করেছিলাম, এই বছরের বাজেট একটি স্পষ্ট ও সুসমন্বিত অর্থনৈতিক তত্ত্বের ভিত্তিতে প্রণীত হবে। কিন্তু এটি না কেইনসীয় দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন, না কাঠামোগত রূপান্তরের প্রতি কোনো ডেভেলপমেন্টালিস্ট অঙ্গীকার। আবার এটি নিওক্ল্যাসিক্যাল সাপ্লাই-সাইড নীতির পথও অনুসরণ করেনি, যা বেসরকারি খাতকে উদ্দীপিত করতে পারত। বরং বাজেটটি একটি সংখ্যাগত হিসাব–নিকাশ ছাড়া আর কিছু নয়—এর মধ্যে ভবিষ্যতের কোনো দিশাও নেই।

সাবেক অর্থমন্ত্রী এ এস এম কিবরিয়া একবার জাতীয় সংসদে মন্তব্য করেছিলেন, ‘মাননীয় স্পিকার, বিরোধী দলের অর্থমন্ত্রী বাজেটকে হিসাবরক্ষকের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখেন, আর আমি দেখি একজন অর্থনীতিবিদের দৃষ্টিকোণ থেকে।’ দুঃখজনকভাবে এবারের বাজেটও প্রস্তুত হয়েছে একজন হিসাবরক্ষকের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে—কোনোক্রমেই একজন অর্থনীতিবিদের নয়।

বাংলাদেশের জন্য একটি দূরদর্শিতাসম্পন্ন বাজেটের ভীষণ প্রয়োজন। কিন্তু উপস্থাপিত বাজেট একটি গতানুগতিক আমলাতান্ত্রিক অনুশীলন, যা হয়তো জাতীয় হিসাব-নিকাশের ভারসাম্য বজায় রাখতে পারবে, কিন্তু সামাজিক অবিচার ও বৈষম্য দূর করতে পারবে না।

৫ দশমিক ৬৪ ট্রিলিয়ন টাকার রাজস্বের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনযোগ্য বলে মনে হতে পারে, কিন্তু দুর্বল কর আদায়ের ব্যবস্থা, কর প্রশাসনে দীর্ঘস্থায়ী অদক্ষতা, পরোক্ষ করের ওপর অব্যাহত নির্ভরতা, ভ্যাট অব্যাহতি সংস্কারে রাজনৈতিক অনীহা এবং উচ্চপর্যায়ের দুর্নীতির কারণে এই বাজেটকে অত্যন্ত উচ্চাভিলাষীই বলতে হবে। কাঠামোগত কর সংস্কার ছাড়া বাস্তবে এ সংখ্যা অর্জন করা অসম্ভব। এটি বাস্তবায়ন করতে হলে কর আদায়ের প্রক্রিয়ায় গভীর ও পদ্ধতিগত সংস্কার করতে হবে। জরুরি আরও কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে, যেমন করভিত্তি সম্প্রসারণ করা, অর্থাৎ আরও বেশি মানুষ এবং ব্যবসাকে করের জালে আনা, কর ফাঁকি রোধ এবং দুর্নীতি হ্রাস করা।

ডিজিটাইজেশন শক্তিশালী করা। পরোক্ষ করের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা ছেড়ে আয় এবং করপোরেট করের মতো আরও ন্যায়সংগত প্রত্যক্ষ করের দিকে স্থানান্তর করা। এ ধরনের পদক্ষেপ ছাড়া, উচ্চাভিলাষী রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা কেবল কাগজে–কলমে একটি সংখ্যা হয়েই থাকবে।

দ্বিতীয়ত, বর্তমান বাজেটে প্রস্তাবিত ঋণের পরিমাণ অনেক সফল অর্থনীতির ঋণের মাত্রা বিবেচনায় নিলে যথেষ্ট যুক্তিসংগত বটে। যেসব দেশে সরকারের ঋণ-জিডিপি অনুপাত অনেক বেশি, এমন কিছু উদাহরণ দিই। জাপানের মোট সরকারি ঋণ তার জিডিপির ২৬০ শতাংশের বেশি, যা উন্নত দেশগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ। এটি উদ্বেগজনক মনে হতে পারে, কিন্তু বাংলাদেশের বা পাকিস্তানের মতো দেশের বিপরীতে জাপানের বেশির ভাগ ঋণই দেশীয় উৎস থেকে নেওয়া। তাদের সরকারি বন্ডগুলো মূলত তাদের নিজস্ব নাগরিকের ও প্রতিষ্ঠানের হাতে। ফলে জাপানের ঋণের সুদের হার তুলনামূলকভাবে কম।

যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি, যুক্তরাজ্য ও কানাডার ঋণ-জিডিপি অনুপাত যথাক্রমে ১২৩-১২৪ শতাংশ, ১১০ শতাংশ, ৬৩ শতাংশ, ১৩৫ শতাংশ, ১০১ শতাংশ ও ১০৭ শতাংশ। এসব দেশে ঋণ-জিডিপি অনুপাত তুলনামূলকভাবে বেশি হলেও তাদের অর্থনীতি ভালো করছে—সম্ভবত এ জন্য যে তাদের বড় দেশীয় বাজার থাকায় তারা তাদের ঋণের জোগান ও সুদ স্থিতিশীল রাখতে পারে।

বাংলাদেশের বাজেটে প্রস্তাবিত ঋণের মাত্রা যুক্তিসংগত বলে উল্লেখ করার পর একটি সতর্কবার্তাও জারি করা দরকার। চলতি ব্যয়ের পরিবর্তে উৎপাদনশীল বিনিয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। উচ্চ প্রবৃদ্ধি বজায় রাখা, রাজস্ব সংগ্রহ জোরদার করা (একটি বিস্তৃত করভিত্তিসহ কার্যকর রাজস্ব সংগ্রহের ব্যবস্থা, কর্মকর্তাদের দুর্নীতি ও কর ফাঁকি রোধ ইত্যাদি) এবং প্রাতিষ্ঠানিক স্থিতিশীলতা (রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, আইনের শাসন, দক্ষ আমলা এবং একটি বিশ্বাসযোগ্য, স্বাধীন কেন্দ্রীয় ব্যাংক ইত্যাদি) —দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক স্বাস্থ্যের জন্যও অপরিহার্য। যদি অভ্যন্তরীণ সুদের হার বৃদ্ধি পায় বা কোনো আন্তর্জাতিক ধাক্কা (এক্সটারনাল শক) লাগে, তাহলে ঋণ অতিরিক্ত চাপ তৈরি করবে। অতএব এ ক্ষেত্রে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতেই হবে।

বিশেষজ্ঞ ও উন্নয়ন সংস্থাগুলোর বারবার সতর্কীকরণ সত্ত্বেও শিক্ষা ব্যয় জিডিপির মাত্র ২ দশমিক ১ শতাংশ, যেখানে স্বাস্থ্য খাতে ১ শতাংশের কম। এই সংখ্যাগুলো সব আন্তর্জাতিক মানের চেয়ে কম—ইউনেসকোর সুপারিশকৃত ৪ থেকে ৬ শতাংশ, নিম্ন আয়ের দেশগুলোর গড় এবং দক্ষিণ এশিয়ার গড়ের চেয়ে অনেক কম। বাংলাদেশের ২ দশমিক ১ শতাংশের বিপরীতে নেপাল, ভুটান ও মালদ্বীপে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ যথাক্রমে ৪ দশমিক ৩ শতাংশ, ৮ শতাংশ ও ৪ দশমিক ৭ শতাংশ। অথচ নেপালের মাথাপিছু আয় বাংলাদেশের তুলনায় অর্ধেক।

২০১৮ সালে জিডিপির অংশ হিসেবে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ব্যয় দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সর্বনিম্ন ছিল এবং ২০১১ সালে শিক্ষা ব্যয় ছিল সর্বনিম্নের চেয়ে সামান্য বেশি। ২০১২ সাল থেকে, বাংলাদেশ ধীরে ধীরে শিক্ষা বাজেট কমিয়ে আনছে অথচ স্বাস্থ্য ও শিক্ষাই হিউম্যান ক্যাপিটালের তথা মানবপুঁজির ভিত্তি।

এ ধরনের মনোভাব নীতিনির্ধারকদের নৈতিক দেউলিয়াত্বকে প্রতিফলিত করে, যেখানে লাখ লাখ মানুষ শিক্ষাগত বৈষম্য এবং স্বাস্থ্যসেবার অপর্যাপ্ত সুযোগের মুখোমুখি হয় প্রতিদিন। আর একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বাংলাদেশে স্বাধীনতার পর থেকেই দেখা যাচ্ছে, এই সীমিত বরাদ্দের একটি উল্লেখযোগ্য অংশও অব্যবহৃত থেকে যায়। এটি আমলাতান্ত্রিক অদক্ষতা এবং দুর্বল প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতাকে নির্দেশ করে।

বাজেটে বেসরকারি খাতের প্রবৃদ্ধিকে সমর্থন করার দাবি করা হয়েছে, কিন্তু বাগাড়ম্বরের পেছনে বাস্তব প্রচেষ্টা খুব কম। এফবিসিসিআই, বিজিএমইএর মতো ব্যবসায়িক গোষ্ঠীগুলো ইতিমধ্যেই উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। উদাহরণস্বরূপ, টার্নওভার এবং ডিজিটাল পেমেন্টের ওপর নতুন কর ছোট ব্যবসা ও স্টার্টআপগুলোকে ক্ষতি করতে পারে বলে তারা জানিয়েছে। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দূর করার, রপ্তানি বৃদ্ধি করার বা বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করার জন্য কোনো রোডম্যাপ নেই এই বাজেটে। সংক্ষেপে সরকার বেসরকারি খাতের কথা উল্লেখ করে, কিন্তু বাস্তব কর্মকৌশল প্রয়োগ করার নাম নেই।

শিক্ষিত যুব বেকারত্ব মোকাবিলায় বাংলাদেশকে তার পদ্ধতি পুনর্বিবেচনা করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাকে বাজারের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে হবে; প্রযুক্তি, স্বাস্থ্যসেবা ও পরিবেশবান্ধব শিল্পে দক্ষতার ওপর জোর দিতে হবে। তরুণদের ব্যবহারিক দক্ষতায় সজ্জিত করার জন্য বৃত্তিমূলক ও প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণ সম্প্রসারণ করতে হবে। সরকারের উচিত তহবিল ও পরামর্শদানের মাধ্যমে উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করা এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নের মাধ্যমে ডিজিটাল চাকরি ও ফ্রিল্যান্সিংকে সমর্থন করা।

সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব ইন্টার্নশিপ ও শিক্ষানবিশ তৈরি করতে পারে, অন্যদিকে বড় শহরগুলোর বাইরে সুযোগ বিকেন্দ্রীকরণ তরুণদের পূর্ণ সম্ভাবনা কাজে লাগাতে সাহায্য করবে। সঠিক নীতিমালার মাধ্যমে এই বিশাল যুব জনগোষ্ঠী উদ্ভাবন ও প্রবৃদ্ধির একটি শক্তিশালী ইঞ্জিন হয়ে উঠতে পারে।

২০২৫-২৬ সালের বাজেট সাহসী সংস্কার নয়, বরং আর্থিক ব্যয় সংকোচনের মানসিকতার ধারাবাহিকতার প্রতিফলন। এটি একটি সুসংগত অর্থনৈতিক কর্মকৌশল গ্রহণ করতে বা দেশের পরিবর্তিত উন্নয়ন চাহিদা পূরণে সাড়া দিতে ব্যর্থ হয়েছে।

বাংলাদেশের জন্য একটি দূরদর্শিতাসম্পন্ন বাজেটের ভীষণ প্রয়োজন। কিন্তু উপস্থাপিত বাজেট একটি গতানুগতিক আমলাতান্ত্রিক অনুশীলন, যা হয়তো জাতীয় হিসাব-নিকাশের ভারসাম্য বজায় রাখতে পারবে, কিন্তু সামাজিক অবিচার ও বৈষম্য দূর করতে পারবে না।

গতানুগতিক এই ধারা থেকে বেরিয়ে আসার জন্য সরকারকে কেইনসীয় ও কাঠামোগত নীতির ওপর ভিত্তি করে একটি উন্নয়ন কৌশল গ্রহণ করতে হবে; প্রত্যক্ষ কর আদায় বৃদ্ধির জন্য কর প্রশাসন সংস্কার করতে হবে; শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও ডিজিটাল অবকাঠামোয় বিনিয়োগ করতে হবে; প্রতিযোগিতা ও কর্মসংস্থান উন্নত করার জন্য একটি শিল্পনীতি তৈরি করতে হবে এবং বাজেট বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। না হলে একটি উন্নত দেশে উন্নীত হওয়ার স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে যাবে।

  • এন এন তরুণ অর্থনীতির অধ্যাপক, ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ। সাউথ এশিয়া জার্নালের এডিটর অ্যাট লার্জ। nntarun@gmail.com

সংস্কারের বছরের বাজেটেও কোনো সংস্কারের ইঙ্গিত নেই

Published in Prothom Alo 06 July, 2025

অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট উপস্থাপন করেন এমন এক সময়ে, যখন শেখ হাসিনার স্বৈরাচারী শাসনের পতনের পর দেশ এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ অতিক্রম করছে। এ অবস্থায় যখন বহু প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার প্রক্রিয়াধীন এবং সালেহউদ্দিন আহমেদ একজন অর্থনীতিবিদ, সাবেক আমলা ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর, তখন তাঁর উপস্থাপিত বাজেটে কোনো দূরদর্শী সংস্কারের ইঙ্গিত না থাকা অত্যন্ত বিস্ময়কর বটে। এই বাজেট বরং অতীতের ধারাবাহিকতা ধরে রাখা এক হতাশাজনক দলিল। অর্থাৎ যথা পূর্বং তথা পরং।

এতে নেই ভবিষ্যতের দিকনির্দেশনা, নেই কোনো সংস্কার পরিকল্পনার প্রতিফলন। উন্নত দেশের অর্থমন্ত্রীরা সবাই পেশায় অর্থনীতিবিদ না হলেও তাঁরা অর্থনীতিতে গভীর জ্ঞানের অধিকারী। তাঁরা কোনো অর্থনৈতিক তত্ত্বের আলোকে বাজেট প্রণয়ন করেন এবং নতুন কোনো উন্নয়ন কৌশলের প্রস্তাব করেন।

উদাহরণস্বরূপ, হার্ভার্ডের অধ্যাপক, জোসেফ শমপিটার তাঁর কর্মজীবনের প্রথম দিকে ১৯১৯ সালে অস্ট্রিয়ান সরকারের অর্থমন্ত্রী হন। তখন তিনি আরেক অস্ট্রিয়ান সমাজবিজ্ঞানী রুডলফ গোল্ডশাইডের একটি বিখ্যাত তত্ত্ব, রাজস্ব সমাজবিজ্ঞানের ধারণাটি প্রয়োগ করে বাজেট প্রণয়ন করেন। ২০২৫-২৬ বাজেটে এসবের অস্তিত্ব নেই। এটি একটি নিছক রক্ষণশীল রাজস্ব ব্যবস্থাপনা, যেখানে প্রকৃত আর্থসামাজিক পরিবর্তনের কোনো ধারণারও স্থান নেই।

আমরা আশা করেছিলাম, এই বছরের বাজেট একটি স্পষ্ট ও সুসমন্বিত অর্থনৈতিক তত্ত্বের ভিত্তিতে প্রণীত হবে। কিন্তু এটি না কেইনসীয় দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন, না কাঠামোগত রূপান্তরের প্রতি কোনো ডেভেলপমেন্টালিস্ট অঙ্গীকার। আবার এটি নিওক্ল্যাসিক্যাল সাপ্লাই-সাইড নীতির পথও অনুসরণ করেনি, যা বেসরকারি খাতকে উদ্দীপিত করতে পারত। বরং বাজেটটি একটি সংখ্যাগত হিসাব–নিকাশ ছাড়া আর কিছু নয়—এর মধ্যে ভবিষ্যতের কোনো দিশাও নেই।

সাবেক অর্থমন্ত্রী এ এস এম কিবরিয়া একবার জাতীয় সংসদে মন্তব্য করেছিলেন, ‘মাননীয় স্পিকার, বিরোধী দলের অর্থমন্ত্রী বাজেটকে হিসাবরক্ষকের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখেন, আর আমি দেখি একজন অর্থনীতিবিদের দৃষ্টিকোণ থেকে।’ দুঃখজনকভাবে এবারের বাজেটও প্রস্তুত হয়েছে একজন হিসাবরক্ষকের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে—কোনোক্রমেই একজন অর্থনীতিবিদের নয়।

বাংলাদেশের জন্য একটি দূরদর্শিতাসম্পন্ন বাজেটের ভীষণ প্রয়োজন। কিন্তু উপস্থাপিত বাজেট একটি গতানুগতিক আমলাতান্ত্রিক অনুশীলন, যা হয়তো জাতীয় হিসাব-নিকাশের ভারসাম্য বজায় রাখতে পারবে, কিন্তু সামাজিক অবিচার ও বৈষম্য দূর করতে পারবে না।

৫ দশমিক ৬৪ ট্রিলিয়ন টাকার রাজস্বের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনযোগ্য বলে মনে হতে পারে, কিন্তু দুর্বল কর আদায়ের ব্যবস্থা, কর প্রশাসনে দীর্ঘস্থায়ী অদক্ষতা, পরোক্ষ করের ওপর অব্যাহত নির্ভরতা, ভ্যাট অব্যাহতি সংস্কারে রাজনৈতিক অনীহা এবং উচ্চপর্যায়ের দুর্নীতির কারণে এই বাজেটকে অত্যন্ত উচ্চাভিলাষীই বলতে হবে। কাঠামোগত কর সংস্কার ছাড়া বাস্তবে এ সংখ্যা অর্জন করা অসম্ভব। এটি বাস্তবায়ন করতে হলে কর আদায়ের প্রক্রিয়ায় গভীর ও পদ্ধতিগত সংস্কার করতে হবে। জরুরি আরও কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে, যেমন করভিত্তি সম্প্রসারণ করা, অর্থাৎ আরও বেশি মানুষ এবং ব্যবসাকে করের জালে আনা, কর ফাঁকি রোধ এবং দুর্নীতি হ্রাস করা।

ডিজিটাইজেশন শক্তিশালী করা। পরোক্ষ করের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা ছেড়ে আয় এবং করপোরেট করের মতো আরও ন্যায়সংগত প্রত্যক্ষ করের দিকে স্থানান্তর করা। এ ধরনের পদক্ষেপ ছাড়া, উচ্চাভিলাষী রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা কেবল কাগজে–কলমে একটি সংখ্যা হয়েই থাকবে।

দ্বিতীয়ত, বর্তমান বাজেটে প্রস্তাবিত ঋণের পরিমাণ অনেক সফল অর্থনীতির ঋণের মাত্রা বিবেচনায় নিলে যথেষ্ট যুক্তিসংগত বটে। যেসব দেশে সরকারের ঋণ-জিডিপি অনুপাত অনেক বেশি, এমন কিছু উদাহরণ দিই। জাপানের মোট সরকারি ঋণ তার জিডিপির ২৬০ শতাংশের বেশি, যা উন্নত দেশগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ। এটি উদ্বেগজনক মনে হতে পারে, কিন্তু বাংলাদেশের বা পাকিস্তানের মতো দেশের বিপরীতে জাপানের বেশির ভাগ ঋণই দেশীয় উৎস থেকে নেওয়া। তাদের সরকারি বন্ডগুলো মূলত তাদের নিজস্ব নাগরিকের ও প্রতিষ্ঠানের হাতে। ফলে জাপানের ঋণের সুদের হার তুলনামূলকভাবে কম।

যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি, যুক্তরাজ্য ও কানাডার ঋণ-জিডিপি অনুপাত যথাক্রমে ১২৩-১২৪ শতাংশ, ১১০ শতাংশ, ৬৩ শতাংশ, ১৩৫ শতাংশ, ১০১ শতাংশ ও ১০৭ শতাংশ। এসব দেশে ঋণ-জিডিপি অনুপাত তুলনামূলকভাবে বেশি হলেও তাদের অর্থনীতি ভালো করছে—সম্ভবত এ জন্য যে তাদের বড় দেশীয় বাজার থাকায় তারা তাদের ঋণের জোগান ও সুদ স্থিতিশীল রাখতে পারে।

বাংলাদেশের বাজেটে প্রস্তাবিত ঋণের মাত্রা যুক্তিসংগত বলে উল্লেখ করার পর একটি সতর্কবার্তাও জারি করা দরকার। চলতি ব্যয়ের পরিবর্তে উৎপাদনশীল বিনিয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। উচ্চ প্রবৃদ্ধি বজায় রাখা, রাজস্ব সংগ্রহ জোরদার করা (একটি বিস্তৃত করভিত্তিসহ কার্যকর রাজস্ব সংগ্রহের ব্যবস্থা, কর্মকর্তাদের দুর্নীতি ও কর ফাঁকি রোধ ইত্যাদি) এবং প্রাতিষ্ঠানিক স্থিতিশীলতা (রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, আইনের শাসন, দক্ষ আমলা এবং একটি বিশ্বাসযোগ্য, স্বাধীন কেন্দ্রীয় ব্যাংক ইত্যাদি) —দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক স্বাস্থ্যের জন্যও অপরিহার্য। যদি অভ্যন্তরীণ সুদের হার বৃদ্ধি পায় বা কোনো আন্তর্জাতিক ধাক্কা (এক্সটারনাল শক) লাগে, তাহলে ঋণ অতিরিক্ত চাপ তৈরি করবে। অতএব এ ক্ষেত্রে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতেই হবে।

বিশেষজ্ঞ ও উন্নয়ন সংস্থাগুলোর বারবার সতর্কীকরণ সত্ত্বেও শিক্ষা ব্যয় জিডিপির মাত্র ২ দশমিক ১ শতাংশ, যেখানে স্বাস্থ্য খাতে ১ শতাংশের কম। এই সংখ্যাগুলো সব আন্তর্জাতিক মানের চেয়ে কম—ইউনেসকোর সুপারিশকৃত ৪ থেকে ৬ শতাংশ, নিম্ন আয়ের দেশগুলোর গড় এবং দক্ষিণ এশিয়ার গড়ের চেয়ে অনেক কম। বাংলাদেশের ২ দশমিক ১ শতাংশের বিপরীতে নেপাল, ভুটান ও মালদ্বীপে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ যথাক্রমে ৪ দশমিক ৩ শতাংশ, ৮ শতাংশ ও ৪ দশমিক ৭ শতাংশ। অথচ নেপালের মাথাপিছু আয় বাংলাদেশের তুলনায় অর্ধেক।

২০১৮ সালে জিডিপির অংশ হিসেবে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ব্যয় দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সর্বনিম্ন ছিল এবং ২০১১ সালে শিক্ষা ব্যয় ছিল সর্বনিম্নের চেয়ে সামান্য বেশি। ২০১২ সাল থেকে, বাংলাদেশ ধীরে ধীরে শিক্ষা বাজেট কমিয়ে আনছে অথচ স্বাস্থ্য ও শিক্ষাই হিউম্যান ক্যাপিটালের তথা মানবপুঁজির ভিত্তি।

এ ধরনের মনোভাব নীতিনির্ধারকদের নৈতিক দেউলিয়াত্বকে প্রতিফলিত করে, যেখানে লাখ লাখ মানুষ শিক্ষাগত বৈষম্য এবং স্বাস্থ্যসেবার অপর্যাপ্ত সুযোগের মুখোমুখি হয় প্রতিদিন। আর একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বাংলাদেশে স্বাধীনতার পর থেকেই দেখা যাচ্ছে, এই সীমিত বরাদ্দের একটি উল্লেখযোগ্য অংশও অব্যবহৃত থেকে যায়। এটি আমলাতান্ত্রিক অদক্ষতা এবং দুর্বল প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতাকে নির্দেশ করে।

বাজেটে বেসরকারি খাতের প্রবৃদ্ধিকে সমর্থন করার দাবি করা হয়েছে, কিন্তু বাগাড়ম্বরের পেছনে বাস্তব প্রচেষ্টা খুব কম। এফবিসিসিআই, বিজিএমইএর মতো ব্যবসায়িক গোষ্ঠীগুলো ইতিমধ্যেই উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। উদাহরণস্বরূপ, টার্নওভার এবং ডিজিটাল পেমেন্টের ওপর নতুন কর ছোট ব্যবসা ও স্টার্টআপগুলোকে ক্ষতি করতে পারে বলে তারা জানিয়েছে। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দূর করার, রপ্তানি বৃদ্ধি করার বা বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করার জন্য কোনো রোডম্যাপ নেই এই বাজেটে। সংক্ষেপে সরকার বেসরকারি খাতের কথা উল্লেখ করে, কিন্তু বাস্তব কর্মকৌশল প্রয়োগ করার নাম নেই।

শিক্ষিত যুব বেকারত্ব মোকাবিলায় বাংলাদেশকে তার পদ্ধতি পুনর্বিবেচনা করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাকে বাজারের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে হবে; প্রযুক্তি, স্বাস্থ্যসেবা ও পরিবেশবান্ধব শিল্পে দক্ষতার ওপর জোর দিতে হবে। তরুণদের ব্যবহারিক দক্ষতায় সজ্জিত করার জন্য বৃত্তিমূলক ও প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণ সম্প্রসারণ করতে হবে। সরকারের উচিত তহবিল ও পরামর্শদানের মাধ্যমে উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করা এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নের মাধ্যমে ডিজিটাল চাকরি ও ফ্রিল্যান্সিংকে সমর্থন করা।

সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব ইন্টার্নশিপ ও শিক্ষানবিশ তৈরি করতে পারে, অন্যদিকে বড় শহরগুলোর বাইরে সুযোগ বিকেন্দ্রীকরণ তরুণদের পূর্ণ সম্ভাবনা কাজে লাগাতে সাহায্য করবে। সঠিক নীতিমালার মাধ্যমে এই বিশাল যুব জনগোষ্ঠী উদ্ভাবন ও প্রবৃদ্ধির একটি শক্তিশালী ইঞ্জিন হয়ে উঠতে পারে।

২০২৫-২৬ সালের বাজেট সাহসী সংস্কার নয়, বরং আর্থিক ব্যয় সংকোচনের মানসিকতার ধারাবাহিকতার প্রতিফলন। এটি একটি সুসংগত অর্থনৈতিক কর্মকৌশল গ্রহণ করতে বা দেশের পরিবর্তিত উন্নয়ন চাহিদা পূরণে সাড়া দিতে ব্যর্থ হয়েছে।

বাংলাদেশের জন্য একটি দূরদর্শিতাসম্পন্ন বাজেটের ভীষণ প্রয়োজন। কিন্তু উপস্থাপিত বাজেট একটি গতানুগতিক আমলাতান্ত্রিক অনুশীলন, যা হয়তো জাতীয় হিসাব-নিকাশের ভারসাম্য বজায় রাখতে পারবে, কিন্তু সামাজিক অবিচার ও বৈষম্য দূর করতে পারবে না।

গতানুগতিক এই ধারা থেকে বেরিয়ে আসার জন্য সরকারকে কেইনসীয় ও কাঠামোগত নীতির ওপর ভিত্তি করে একটি উন্নয়ন কৌশল গ্রহণ করতে হবে; প্রত্যক্ষ কর আদায় বৃদ্ধির জন্য কর প্রশাসন সংস্কার করতে হবে; শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও ডিজিটাল অবকাঠামোয় বিনিয়োগ করতে হবে; প্রতিযোগিতা ও কর্মসংস্থান উন্নত করার জন্য একটি শিল্পনীতি তৈরি করতে হবে এবং বাজেট বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। না হলে একটি উন্নত দেশে উন্নীত হওয়ার স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে যাবে।

  • এন এন তরুণ অর্থনীতির অধ্যাপক, ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ। সাউথ এশিয়া জার্নালের এডিটর অ্যাট লার্জ। nntarun@gmail.com