‘যারে তুমি নীচে ফেল সে তোমারে বাঁধিবে যে নীচে’

রবীন্দ্রনাথের গীতাঞ্জলির একটি পঙ্‌ক্তির ঋণ করতে হলো নিবন্ধের শিরোনামে। রবীন্দ্রনাথ নোবেল পুরস্কার পাওয়ার আগপর্যন্ত অনেক অপমানের শিকার হয়েছিলেন তাঁর প্রিয় বাঙালির দ্বারাই। তবে উক্ত পঙ্‌ক্তির উপজীব্য তাঁর নিজের অপমান নয়। হিন্দু সমাজে শতাব্দীর পর শতাব্দী নিম্নবর্ণ উচ্চবর্ণের কাছে কীভাবে নিগৃহীত হয়েছে, তার এক করুণ চিত্র ফুটে উঠেছে মূল কবিতাটিতে। অনেকটা আর্তনাদের মতো। কবি উচ্চবর্ণকে সতর্ক করে দিয়ে বলছেন, এমন নিগ্রহ যদি চলতে থাকে, ভয়াবহ পরিণতি অপেক্ষা করছে তাদের জন্য। শুধু তা–ই নয়, পুরো সমাজই ভেঙে পড়তে পারে একসময়।

নিউটনের (গতির) তৃতীয় সূত্র বলছে: প্রতিটি কাজের (তথা বলপ্রয়োগের) একটি সমমানের ও বিপরীতমুখী প্রতিক্রিয়া হয়, যা জড় জগতের একটি ধ্রুব সত্য। ঠিক একই কথা রবীন্দ্রনাথ বলেছেন কবিতার ভাষায়:

‘যারে তুমি নীচে ফেল সে তোমারে বাঁধিবে যে নীচে

পশ্চাতে রেখেছ যারে সে তোমারে পশ্চাতে টানিছে।’

যা মনুষ্য জগতের এক অমোঘ সত্য। সাহিত্যিক-দার্শনিক মানব মনস্তত্ত্ব ও সমাজ মনস্তত্ত্ব বিষয়ে গভীর অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন মানুষ। ইতিহাসের বিভিন্ন ঘটনার কার্যকারণ সম্পর্ক তাঁরা ভালো বোঝেন এবং সাহিত্যে-দর্শনে তা লিপিবদ্ধ করেন। সে জন্যই, রাজনৈতিক-ঐতিহাসিক ঘটনা বোঝার জন্য সাহিত্য ও দর্শনশাস্ত্র পাঠ করা জরুরি।

রবীন্দ্রনাথ শ্যামলী কাব্যগ্রন্থের ‘হঠাৎ দেখা’ শীর্ষক কবিতায় এমনি এক দার্শনিক তত্ত্ব উপস্থাপন করেন। তিনি বলছেন, ‘রাতের সব তারাই আছে দিনের আলোর গভীরে’। অর্থাৎ যা চলে গেছে তা আদতে পুরোপুরি চলে যায়নি, বরং কালের গভীরে তার রেশটুকু থেকে গেছে। অতীত বর্তমানকে সৃষ্টি করে। তাই তো কবি বলছেন:

‘হে অতীত, তুমি ভুবনে ভুবনে

কাজ করে যাও গোপনে গোপনে।’

বর্তমানকে অতীত ভুলের কুপ্রভাব থেকে মুক্ত করতে হলে দরকার বর্তমান সময়ে বসবাসরত জনগোষ্ঠীর ব্যাপক সংশোধনী কর্মযজ্ঞ। বাংলাদেশে ঘটেছে ঠিক তার উল্টোটি। বাঙালির স্বাধিকার-স্বাধীনতার সংগ্রাম এবং ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিকশিত হওয়ার পরিবর্তে আমরা যেন পশ্চাৎ-যাত্রা শুরু করেছি। এ দেশের একটি বিরাটসংখ্যক মানুষ মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী কর্মকাণ্ডে ভীষণ রকম তৎপর।

বাংলাদেশের প্রথম সংবিধানের চার স্তম্ভ অর্থাৎ গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ ও ধর্মনিরপেক্ষতাই মুক্তিযুদ্ধের চেতনা। এখানে সমাজতন্ত্র যুক্ত হয়েছে সামাজিক ন্যায়বিচার অর্থে, কারণ স্বাধীনতার নেতৃত্ব দেওয়া দল ও প্রথম ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ কখনোই সমাজতন্ত্রে বিশ্বাস করেনি। ফ্রান্সের মতো অথবা ওয়েস্টমিনস্টার স্টাইলের ডেমোক্রেসির মতো একটি আধুনিক রাষ্ট্র গঠন করাই ছিল আদতে বাঙালির সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধের লক্ষ্য। এখন আধুনিক রাষ্ট্র বলতে কী বোঝায়, তা পরিষ্কার হওয়া দরকার।

সপ্তদশ ও অষ্টাদশ শতকে ইউরোপের এনলাইটেনমেন্ট মুভমেন্ট পুরো পশ্চিমা দুনিয়ায় যে বিশ্ববীক্ষা তৈরি করেছিল, তার মূলকথা ছিল বিশ্বাসের পরিবর্তে যুক্তির আশ্রয়, ভাবের বিপরীতে বস্তুর প্রাধান্য, ইহজাগতিকতায় গুরুত্ব আরোপ ইত্যাদি। এনলাইটেনমেন্ট মুভমেন্টই বা আলোকায়নের যুগই ফরাসি বিপ্লবের ভিত্তি। অতএব এনলাইটেনমেন্ট মুভমেন্টের পরিভাষার কয়েকটি শব্দবন্ধ লক্ষ করলে আধুনিক রাষ্ট্র বিষয়ে একটি ধারণা পাওয়া যাবে। যেমন এনলাইটেনমেন্ট মুভমেন্টের মূল বিষয়গুলোর মধ্যে আছে যুক্তির মহিমা উদ্‌যাপন ও যুক্তির প্রয়োগ; বিশ্বাস ও পূর্বধারণা থেকে মুক্তি; যে ধীশক্তি দিয়ে মানুষ এই অনন্ত বিশ্বকে জানতে পারে ও মানবসমাজের অবস্থার উন্নতি ঘটাতে পারে সেই শক্তির উন্মেষ ঘটানো; জ্ঞান, মুক্তি ও সুখ হলো যুক্তিবাদী মানবতার লক্ষ্য ইত্যাদি।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে এখন দুটি ধারার স্পষ্ট বিভাজন। একটি ধারা মানুষের তৈরি আইন দিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনার পক্ষে। আরেকটি ধারা ধর্মীয় আইন দিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনার পক্ষে। প্রথম ধারার পক্ষে সিংহভাগ মানুষ থাকলেও তারা বহুধাবিভক্ত। কার্যক্রম, শক্তিমত্তা, লক্ষ্যস্থিত বিনিয়োগ—সবকিছু সীমিত। দ্বিতীয় ধারার ঐক্য, লক্ষ্যস্থিত বিনিয়োগ, কার্যক্রম এবং শক্তিমত্তার প্রদর্শন ব্যাপক, বহুগুণ। আধুনিক রাষ্ট্রের পক্ষের মানুষের সব মনোযোগ ব্যক্তিগত স্বার্থ উদ্ধারে, দুর্নীতির মাধ্যমে টাকার পাহাড় নির্মাণে। আধুনিক রাষ্ট্র নির্মাণের লক্ষ্যে কোনো যৌথ প্রয়াসে মনোযোগ নেই, বিনিয়োগ নেই। যার ফলে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার উল্টো দিকে আমাদের এই যাত্রা।

প্রতিটি কাজের (তথা বলপ্রয়োগের) একটি সমমানের ও বিপরীতমুখী প্রতিক্রিয়া হয়—বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে কয়েকটি ছোট্ট ঘটনার মধ্যে নিউটনের এই তত্ত্বের বাস্তব প্রতিফলন ঘটেছে। স্বাধীনতার পর আওয়ামী লীগ যদি জাসদকে রাজনীতি করার সুযোগ দিত, বহুদলীয় ব্যবস্থা অব্যাহত থাকত, সংবাদপত্রকে, ব্যক্তির কণ্ঠরোধ না করত, তাহলে হয়তো ’৭৫-এর নির্মম ঘটনা ঘটত না। বাংলাদেশে সামরিক শাসনেরই সূচনা হতো না।

’৯১-এ জাতীয় নির্বাচনের আগে শেখ হাসিনা বাকশাল বাদ দিয়ে আওয়ামী লীগকে একটি গণতান্ত্রিক সংগঠনে রূপান্তরিত করেছিলেন। ’৯৬-এ ক্ষমতায় এসে ডেপুটি স্পিকারের পদ বিরোধী দলকে দিতে চেয়েছিলেন। আওয়ামী লীগের সঙ্গে সম্পর্কবিহীন বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদকে প্রেসিডেন্ট করেছিলেন। অর্থাৎ যিনি (শেখ হাসিনা) একসময় গণতন্ত্রপ্রিয় ছিলেন, তিনি বনে গেলেন স্বৈরশাসক। এখানেও ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া সূত্র বলবৎ।

এরপর শেখ হাসিনা খালেদা জিয়ার বাসভবন গুঁড়িয়ে দিয়েছিলেন। এর প্রায় ২০ বছর পর তাঁর পিতার বাসভবনটিও ধ্বংস হয়ে গেল। প্রতিপক্ষ তারেক রহমানকে ১৭ বছর প্রবাসে থাকতে হয়েছে। আজ শেখ হাসিনাকেও দেশের মাটি থেকে বিদায় নিতে হয়েছে। প্রতিটি বলপ্রয়োগের একটি সমমানের ও বিপরীতমুখী প্রতিক্রিয়া হয়—এ দুটি ঘটনার চেয়ে প্রামাণ্য আর কী ঘটনা থাকতে পারে? প্রতিহিংসা একটি ভয়াবহ রকমের বিষক্রিয়া, যা যুগ থেকে যুগান্তরে সঞ্চারিত হয়। কারণ, প্রতিহিংসা প্রতিহিংসার জন্ম দেয়, যা যুগের পর যুগ চক্রাকারে চলতে থাকে। গান্ধীর অহিংস নীতি এই তত্ত্বের ওপরেই প্রতিষ্ঠিত। রাজনীতিতে এই প্রতিহিংসাপরায়ণতা থেকে আমাদের বেরোতেই হবে। না হলে মুক্তি নেই।

আওয়ামী লীগ মুক্তিযুদ্ধের চেতনা পুঁজি করে মানুষকে ধোঁকা দিয়েছে। কারণ, সংবিধানে সংযুক্ত ওই মূলনীতি ধারণ করেন, এমন কোনো আওয়ামী লীগ নেতার সন্ধান আমার কাছে নেই। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধারণ করলে কেউ এভাবে দুর্নীতিগ্রস্ত হতে পারে না। অর্থাৎ আওয়ামী লীগের কুকীর্তি আমরা জানি, কিন্তু ২০২৪-এর জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের নেতৃত্বের একটি অংশ আওয়ামী লীগের সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধকে মিলিয়ে ফেলেছে। বাঙালির আন্দোলন-সংগ্রামের প্রধান নেতা শেখ মুজিবের অবদানকে খাটো করেছে, ঐতিহাসিক দিবস মুছে ফেলতে চেয়েছে।

সরকার ঐতিহাসিক দিবস মুছে ফেলার প্রয়াসে এবং ঐতিহাসিক স্মৃতিচিহ্ন ধ্বংস করার সুযোগ করে দিয়েছে আর কিছু সংবাদপত্র বা মিডিয়া এ বিষয়ে চুপ থেকেছে। সরকার থেকেও এসব ধ্বংস কার্যক্রম ফ্যাসিবাদের প্রতি ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ বলে ন্যায্যতা দেওয়ার চেষ্টা করেছে। মৌলবাদী, স্বাধীনতাবিরোধী, গণতন্ত্রবিরোধী উন্মত্ত জনগোষ্ঠীকে এভাবে প্রশ্রয় দেওয়া হয়েছে। ন্যায্যতা দেওয়া, সমর্থন করা, নীরব থাকা, প্রতিবাদ না করার প্রতিক্রিয়া হচ্ছে ১৮ ডিসেম্বর প্রথম আলো, ডেইলি স্টার, ছায়ানট ও ঢাকার অন্যান্য স্থানে হামলা, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, লুটতরাজ।

যে সমাজে অন্যায়ের প্রতিবাদ হয় না, সেই সমাজ একসময় বসবাসের অযোগ্য হতে বাধ্য। আর সমাজ বসবাসের অযোগ্য হলে, যত অর্থবিত্তের মালিকই হই না কেন, বেঁচে থাকতে পারলেও, সুখ সর্বাধিক করা যাবে না।

  • এন এন তরুণ অর্থনীতির অধ্যাপক, ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ। সাউথ এশিয়া জার্নালের এডিটর অ্যাট লার্জ। nntarun@gmail.com

বাংলাদেশের বেকারত্ব সংকট মোকাবিলায় এক সাহসী একাডেমিক উদ্যোগ

চীনের দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির একটি প্রধান কারণ হলো শিল্পের চাহিদার সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় উৎপাদিত দক্ষতার সফল সামঞ্জস্য তৈরি করা। চীনের সরকার নিজ উদ্যোগে একাডেমিয়া ও শিল্পের ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা বাড়িয়েছে, এমন ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে, যার মাধ্যমে বৈজ্ঞানিক গবেষণা দ্রুত বাণিজ্যিক ব্যবহারে রূপান্তরিত হতে পারে। এর ফলে মৌলিক গবেষণাকে সহজে পণ্য, প্রযুক্তি ও শিল্প প্রয়োগে রূপ দেওয়া সম্ভব হয়েছে।

বিশ্বব্যাপী বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও বাজার চাহিদার মধ্যে যে ব্যবধানটি থাকে, তা দূর করতে চীন বিজ্ঞান পার্ক, ইনকিউবেটর, গবেষণা অঞ্চল এবং প্রযুক্তি-বিনিময় প্ল্যাটফর্ম প্রতিষ্ঠা করেছে, যা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংযুক্ত করে। এই প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো নিশ্চিত করেছে যে উদ্ভাবনগুলো কেবল একাডেমিক পর্যায়েই সীমাবদ্ধ না থেকে শিল্পে বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার ও গ্রহণযোগ্য হয়েছে।

ফলে একাডেমিয়া-শিল্প সহযোগিতা চীনের কেন্দ্রীয় উন্নয়ন কৌশলে পরিণত হয়েছে। জাতীয় বিজ্ঞান সংস্থাগুলো ও বেসরকারি কোম্পানির যৌথ অর্থায়নে চীন এমন গবেষণাকে উৎসাহিত করেছে, যা সরাসরি শিল্পের চাহিদার সঙ্গে সম্পর্কিত। এতে উদ্ভাবন শক্তিশালী হয়েছে, উৎপাদনশীলতা বেড়েছে ও উচ্চপ্রযুক্তি খাতের বিকাশ ত্বরান্বিত হয়েছে, যার মাধ্যমে চীন নিম্ন-ব্যয়ভিত্তিক উৎপাদন থেকে উদ্ভাবননির্ভর প্রবৃদ্ধির পথে এগিয়ে যেতে পেরেছে।

চীনের উন্নয়ন মডেল থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে ইন্ডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশ (আইইউবি) ১৪-১৫ নভেম্বর ২০২৫ তারিখে ‘সাসটেইনিবিলিটি–ফোকাসড ইন্ডাস্ট্রি ট্রেন্ডস ইন গ্লোবাল রিসার্চ’ থিমকে কেন্দ্র করে আইসিইবিটিএম নামের একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনের আয়োজন করে। সম্মেলনে অর্থনীতি, উদ্যোক্তা সৃষ্টি, সবুজ অর্থনীতি, মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনা এবং প্রযুক্তি ব্যবস্থাপনাসহ বিভিন্ন বিষয়ের ওপর একাধিক সেশন ছিল।

যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, পোল্যান্ড, কানাডাসহ ১২টি দেশের গবেষকেরা তাঁদের গবেষণা উপস্থাপন করেন। কর্মসূচিতে ছিল পাঁচটি কি-নোট স্পিচ, তিনটি আমন্ত্রিত বক্তৃতা ও আটটি শিল্পবিষয়ক আলোচনা সভা, যেখানে অর্থনীতি, টেকসই উন্নয়ন, ব্যবসা, প্রযুক্তি, ব্যবস্থাপনা, সাপ্লাই চেইন, পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক নানা ইস্যু আলোচিত হয়।

বাংলাদেশের পোশাকশিল্প দীর্ঘদিন ধরে এর শিল্পায়নের প্রধান ভিত্তি। তবে টিকে থাকতে হলে এই খাতকে ক্রমবর্ধমানভাবে অটোমেশন, ডিজাইন উদ্ভাবন ও পরিবেশবান্ধব উৎপাদন পদ্ধতি গ্রহণ করতে হবে। পাশাপাশি দেশের ক্রমবর্ধমান ডিজিটাল অর্থনীতি—ই-কমার্স থেকে আইটি সার্ভিস পর্যন্ত—তরুণ উদ্যোক্তাদের এমন দক্ষতা ও মনোভাব অর্জনের দাবি করে, যা উদ্ভাবনকে এগিয়ে নিতে সক্ষম।

বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির মডেল—যা কম মজুরি ও রপ্তানিমুখী উৎপাদনের ওপর নির্ভরশীল—উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি এনে দিলেও তা অনির্দিষ্টকালের জন্য বজায় রাখা সম্ভব নয়। উন্নয়নের পরবর্তী ধাপে প্রয়োজন উদ্ভাবননির্ভর প্রবৃদ্ধির দিকে অগ্রসর হওয়া: এমন একটি প্রবৃদ্ধি যা শুধু অবকাঠামোর ওপর নয়, বরং সৃজনশীলতা, পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও উদ্যোক্তা-পরিবেশ গড়ে তোলার ওপর নির্ভর করবে, যাতে নতুন ধারণা ও প্রযুক্তি উৎপাদন সম্ভব হয়।

কি-নোট স্পিচে ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বাংলাদেশের বর্তমান চ্যালেঞ্জগুলো ও ভবিষ্যতে গ্রহণযোগ্য নীতির দিকনির্দেশনা তুলে ধরেন। তিনি যুক্তি দেন, বাংলাদেশ এখনো একটি ‘স্বল্প-মজুরির অর্থনীতি’-তে আটকে আছে—যে মডেলটি তৈরি পোশাকশিল্পের উত্থান ও মানবসম্পদের রপ্তানিকে ত্বরান্বিত করেছে, কিন্তু যা দীর্ঘমেয়াদি অগ্রগতিকে ধরে রাখতে সক্ষম নয়। তাঁর ভাষায়, ‘গতকালের সাফল্য আগামী দিনের সাফল্যের নিশ্চয়তা নয়।’

বাংলাদেশের অতীত প্রবৃদ্ধির একটি বড় চালিকা শক্তি ছিল ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড, অর্থাৎ জনসংখ্যাগত গতিশীলতায় তৈরি হওয়া সুযোগ। কিন্তু ড. রহমানের মতে, দেশটি এই সুবিধাটিকে পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারেনি। তিনি জোর দিয়ে বলেন, বাংলাদেশ চীন ও ভিয়েতনামের মতো দ্রুততার সঙ্গে পদক্ষেপ নেয়নি, যা ২০১৬ সালের পর থেকে দারিদ্র্য হ্রাসের অগ্রগতি শ্লথ হয়ে যাওয়ার একটি প্রধান কারণ। সময়োপযোগী নীতি গ্রহণ করা গেলে বহু তরুণকে উন্নত কর্মসংস্থানের মাধ্যমে দারিদ্র্য থেকে মুক্ত করা সম্ভব হতো।

তিনি সম্মেলনের প্রধান পৃষ্ঠপোষক ও আইইউবি বোর্ড অব ট্রাস্টির চেয়ারম্যান মি. দিদার এ. হুসেইনের উদাহরণ উদ্ধৃত করেন, যিনি উল্লেখ করেন যে ভিয়েতনাম এখন স্কুলে এআই ব্যবহার করছে, যা দেশটির অর্থনীতিতে আরও গতি অর্জনের অঙ্গীকারকে নির্দেশ করে।

ড. রহমান আরও বলেন, ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের মূল কারণ ছিল তরুণদের হতাশা। এটি মোকাবিলায় তিনি দেশে ‘চাকরির জরুরি অবস্থা’ ঘোষণা করার ও যুব বেকারত্ব দ্রুত হ্রাসে লক্ষ্যনির্ভর নীতি গ্রহণের আহ্বান জানান। তিনি তরুণদের স্থিতিস্থাপকতার প্রশংসা করেন—তাদের ‘হাল না ছাড়া’ মনোভাবকে দেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ হিসেবে চিহ্নিত করেন—যা সঠিকভাবে সহায়তা পেলে বাংলাদেশকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারে। এ লক্ষ্যে তিনি স্পষ্ট দিকনির্দেশনা ও দ্রুত বাস্তবায়নের ওপর জোর দিয়ে একটি জাতীয় কর্মসূচি গ্রহণের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেন। তিনি তাঁর বক্তব্যের উপসংহারে বাংলাদেশের উন্নয়নের পরবর্তী ধাপের জন্য চারটি অপরিহার্য স্তম্ভ তুলে ধরেন:

১. উচ্চমানের শিক্ষা, যা উদ্ভাবনকে উৎসাহিত করে ও শিক্ষার্থীদের আধুনিক দক্ষতায় সজ্জিত করে। ২. প্রবৃদ্ধির নতুন পথের সন্ধান করা। সেটা হতে পারে এআই-নির্ভর কৃষি, আইটি সার্ভিস ও ভূ-প্রযুক্তি। ৩. উন্নত সুশাসন, বিশেষ করে দক্ষতা, স্বচ্ছতা ও সময়োপযোগী বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে। ৪. একাডেমিক, পেশাজীবী ও উদ্যোক্তাদের সমন্বয়ে গঠিত একটি জোট, যা ছিল চীন, দক্ষিণ কোরিয়া ও ভিয়েতনামের সাফল্যের কেন্দ্রে।

শ্রোতাদের পক্ষ থেকে এ লেখার লেখক ড. এন এন তরুণ চক্রবর্তীর প্রস্তাবে ড. রহমান আরও একটি পঞ্চম স্তম্ভ যোগ করেন, যা হলো সংস্কৃতি। তিনি ড. চক্রবর্তীর সঙ্গে একমত হন যে শিক্ষা ও সংস্কৃতি একটি জাতির সুপারস্ট্রাকচার, যা দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের ভিত্তি নির্মাণ করে।

সম্মেলনের একটি বড় আকর্ষণ ছিল একাডেমিয়া-শিল্প সংলাপের ধারাবাহিক সেশন, যেখানে প্রতিটি সেশনে দশজন একাডেমিক ও দশজন করপোরেট নেতাকে একত্র করা হয়। বিশ্বব্যাংকের হিসেবে আগামী দশকে প্রতি সেকেন্ডে চারজন বৈশ্বিক শ্রমবাজারে প্রবেশ করবে, ১ দশমিক ৪২ বিলিয়ন চাকরিপ্রত্যাশী সৃষ্টি হবে, কিন্তু তৈরি হবে মাত্র ৪০০ মিলিয়ন চাকরি। এর মানে হলো, মূল চ্যালেঞ্জ হলো দক্ষতার অমিল কমানো।

এপেক্স গ্রুপের ব্যবসায়ী নেতা সৈয়দ নাসিম মনজুর বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ শুধু প্রজ্ঞা ও বৌদ্ধিক মূলধন তৈরি করা নয়, বরং শিক্ষার্থীদের জীবিকা অর্জনের সক্ষমতাও দেওয়া। তিনি চারটি অগ্রাধিকার প্রস্তাব করেন: ১. পাঠ্যক্রমের নিরবচ্ছিন্ন হালনাগাদ; ২. ক্রিটিক্যাল থিংকিং ও প্রবলেম-সলভিং দক্ষতা; ৩. আজীবন শেখার সংস্কৃতি ও ৪. শক্তিশালী ভাষাগত দক্ষতা। শিল্প-সংশ্লিষ্ট পাঠ্যক্রম নিশ্চিত না হওয়ার জন্য তিনি ইউজিসিকে দায়ী করেন।

রহিমআফরোজের ব্যবসায়ী নেতা নিয়াজ রহিম জানান, কোম্পানির প্রয়োজনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কোর্স ও কোম্পানির নামে একটি চেয়ার স্পনসর করার আগের প্রচেষ্টাগুলো বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সীমিত সহযোগিতার কারণে ব্যর্থ হয়েছিল।

কানাডা থেকে আগত ড. এমেকা হেনরি এগেসন ব্যাখ্যা করেন, কানাডার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সক্রিয় শিল্প-অংশগ্রহণসহ প্রোগ্রাম অ্যাডভাইজরি কমিটি থাকে। ড. ফেরদৌস সালেহীন (ইউএই) উল্লেখ করেন যে শিক্ষার্থীদের স্নাতক হওয়ার আগে ৫০০ ঘণ্টার শিল্প-ওয়ার্কশপ সম্পন্ন করতে হয়, যা প্রোগ্রামগুলোকে চাহিদাভিত্তিক করতে সহায়তা করে। সৈয়দ নাসিম মানজুর আরও প্রস্তাব করেন, তাৎক্ষণিক শিল্প-চাহিদা পূরণের জন্য সংক্ষিপ্ত ও লক্ষ্যভিত্তিক প্রোগ্রাম—যেমন দুই বছরের গুদাম বা সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট ডিপ্লোমা—চালু করা যেতে পারে।

আমার জানা মতে, এমন পরিসরের আন্তর্জাতিক সম্মেলন বাংলাদেশে এর আগে হয়নি। পাঁচ তারকা ভেন্যু দ্য ওয়েস্টিনে দুই দিনের এ আয়োজনে ২০০টি গবেষণা প্রবন্ধ উপস্থাপিত হয়—যার অনেকগুলোই আন্তর্জাতিক গবেষকদের। সম্মেলনের টেকনিক্যাল কমিটিও এর বৈশ্বিক চরিত্রকে প্রতিফলিত করে—যেখানে ছিলেন ৬৫ জন বিদেশি একাডেমিক এবং আইইউবির বাইরের ৫২ জন বাংলাদেশি একাডেমিক, যাঁদের মধ্যে বেশ কয়েকজন উপাচার্য এবং প্রধান একাডেমিক বা গবেষণাপ্রতিষ্ঠানের প্রধান ছিলেন।

ঐতিহাসিক এই সম্মেলনের প্রধান উদ্যোক্তা আইইউবির জেনারেল ম্যানেজমেন্ট বিভাগের প্রধান, অধ্যাপক মো. মামুন হাবিব অসাধারণ নেতৃত্ব প্রদর্শন করেছেন। তবে এমন একটি অনুষ্ঠান সফল করতে বহু মানুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টা ছিল অপরিহার্য। সম্মেলনের প্রধান পৃষ্ঠপোষক ও আইইউবি বোর্ড অব ট্রাস্টির চেয়ারম্যান মি. দিদার হুসেইন; উপাচার্য অধ্যাপক এম তামিম; এবং উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড্যানিয়েল ডব্লিউ লুন্ড-এর নিরবচ্ছিন্ন উৎসাহ পুরো টিমকে প্রেরণা জুগিয়েছে।

যাঁদের অবদান এই আয়োজনকে সম্ভব করেছে, তাঁরা হলেন: সম্মানিত জেনারেল চেয়ার, অধ্যাপক রাইসুল আউয়াল মাহমুদ। জেনারেল চেয়ার, অধ্যাপক মো. মামুন হাবিব। প্রোগ্রাম চেয়ার, অধ্যাপক শাহরিয়ার কবির ও ড. রেজওয়ানুল আলম। কনফারেন্স সেক্রেটারিয়েটের ড. খালেদ সাইফুল্লাহ (চেয়ার), ড. মকবুল কাদের কোরায়েশী, ড. ইমতিয়াজ আহমেদ নেভিন, সীরাতুস সাবাহ, শামিল এম আল-ইসলাম, মো. আমিনুল ইসলাম, নাবিলা মারুফ, শায়লা তাজমিনুর, তারান্নুম আজিম, মো. তানভীর ইসলাম।

নির্বাহী সদস্যদের মধ্যে জান্নাতুল ফেরদৌস ঐশী, তামীম ফরহাদ শুভ, মো. সিরাতুন নবি রাজন, আমিনা বিনতে আউয়াল, নাফিসা ইয়াসমিন, আফরা বেগ, রুজাতিন শাবিলা কোরেশি।

ইন্ডাস্ট্রি আউটরিচ কমিটির চেয়ার ড. ফারজানা চৌধুরীর ও অর্গানাইজিং কমিটির চেয়ার ড. সামিনা কবিরের নেতৃত্বের দল দুটি সম্মেলনের নিখুঁত বাস্তবায়ন নিশ্চিত করেছে।

এ ছাড়া আরও অনেকে আছেন—সংখ্যায় এত বেশি যে তালিকাভুক্ত করা সম্ভব নয়—যাঁদের অবদান এই সম্মেলনের সাফল্যে ছিল সমান গুরুত্বপূর্ণ।

সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল একটি যৌথ স্বপ্ন: একটি উন্নত বাংলাদেশ গড়ার আকাঙ্ক্ষা। এই সম্মিলিত স্বপ্নই সবাইকে—উল্লিখিত ও অনুল্লেখিত—প্রেরণা জুগিয়েছে, যাঁদের অক্লান্ত পরিশ্রম এই ব্যতিক্রমী আয়োজনকে সফল করেছে।

  • এন এন তরুণ অর্থনীতির অধ্যাপক, ইন্ডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ। সাউথ এশিয়া জার্নালের এডিটর অ্যাট লার্জ। nntarun@gmail.com

দক্ষ সামষ্টিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা ছাড়া প্রবৃদ্ধি কেন ক্ষয়িষ্ণু হবে

সামষ্টিক অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনার বিপদটি যথাযথভাবে তুলে ধরেছিলেন পল ক্রুগম্যান (১৯৯৪) ও উইলিয়াম ইস্টারলি (২০০১)। তাঁরা সতর্ক করেছিলেন, সম্পদের অদক্ষ বণ্টন বাজার-উন্মুক্ততা ও বিনিয়োগ থেকে অর্জিত সুফলকে নষ্ট করতে পারে, যার ফলে উচ্চ সরকারি ব্যয়ের মধ্যেও অর্থনীতি স্থবির হয়ে পড়ে।

সুষ্ঠু সামষ্টিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা বলতে বোঝায় বিচক্ষণ রাজস্বনীতি, মুদ্রানীতি ও বিনিময় হারের নীতি। একটি দেশ টেকসই প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে পারবে কি না, তা নির্ভর করে সুষ্ঠু সামষ্টিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার ওপর। এই সুষ্ঠু সামষ্টিক সূচকগুলো তাহলে কী?

স্থিতিশীল মূল্যস্তর, নিয়ন্ত্রিত ঋণ এবং মোটামুটি একটি স্থির মুদ্রা। দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগকারীরা বিনিয়োগের আগে এই স্থিতিশীলতাই খতিয়ে দেখেন। বিপরীতে উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি, রাজস্ব শৃঙ্খলার অভাব বা মুদ্রার অস্থিরতা বিনিয়োগকারীদের দূরে ঠেলে দেয়, সঞ্চয় ক্ষয় করে এবং প্রণোদনা নষ্ট করে।

বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে রাজস্বঘাটতিতে ভুগছে, যা কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে পূরণ করা হচ্ছে—এতে মুদ্রাস্ফীতির চাপ বেড়েছে। ভর্তুকি, করছাড় ও রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোয় অকার্যকর ঋণ টিকে থাকার সরকারি নীতি রাজস্ব শৃঙ্খলা দুর্বল করেছে এবং বেসরকারি বিনিয়োগকে সীমিত করেছে।

সুস্থ সামষ্টিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করে, সম্পদ দুর্নীতিবাজদের কবলে বা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রকল্পে অপচয় না হয়ে উৎপাদনশীল খাতে প্রবাহিত হয়। রাজস্ব নীতির অগ্রাধিকার হওয়া উচিত অবকাঠামো, শিক্ষা ও উদ্ভাবন—জনতুষ্টিবাদী ভর্তুকি বা রাজনৈতিকভাবে প্রণোদিত ব্যয় নয়। মুদ্রানীতি এমন হতে হবে, যা প্রকৃত সুদের হার বজায় রেখে সঞ্চয়কে উৎসাহিত করে এবং ফাটকা কারবারকে নিরুৎসাহিত করে।

সাম্প্রতিক সময়ে শ্রীলঙ্কা সামষ্টিক অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনার এক উজ্জ্বল উদাহরণ হিসেবে দেখা দিয়েছে। কয়েক দশকে দেশটির সরকারি বেতনভুক্ত কর্মচারীর সংখ্যা নাটকীয়ভাবে বেড়েছে। তাঁদের অনেক পদ সৃষ্টি হয়েছিল উৎপাদনশীলতার জন্য নয়, বরং রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা নিশ্চিত করার জন্য। এই অন্যায্য সম্পদ বণ্টনের ফলে সরকারি অর্থ ব্যয় হয়েছে অবকাঠামো, প্রযুক্তি ও শিল্পোন্নয়নের মতো মূলধনি বিনিয়োগের পরিবর্তে বেতন, পেনশন ইত্যাদি খাতে।

রাজাপক্ষে পরিবার পরিচালিত সরকারগুলো ব্যাপকভাবে বড় অবকাঠামোগত প্রকল্প—বন্দর, বিমানবন্দর ও স্টেডিয়াম নির্মাণে মনোযোগ দেয়, যেগুলোর অনেকগুলোই চীনা ঋণে অর্থায়িত ছিল। এসব প্রকল্প ছিল মূলত আড়ম্বরপূর্ণ ও জনতুষ্টিবাদী উদ্যোগ, যা ঋণ বাড়ালেও সমানুপাতিক প্রবৃদ্ধি সৃষ্টি করতে পারেনি। ফলস্বরূপ, রপ্তানি বহুমুখীকরণ এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা সৃষ্টির মতো আরও উৎপাদনশীল বিনিয়োগ ক্ষেত্রগুলো উপেক্ষিত হয়। দীর্ঘস্থায়ী রাজস্বঘাটতি ও অপ্রয়োজনীয় ব্যয়ের ফলে ঋণ পরিষেবার বোঝা বাড়তে বাড়তে ২০২২ সালে শ্রীলঙ্কা ভয়াবহ ঋণসংকটে পড়ে, যা ব্যাপক গণ–অসন্তোষ সৃষ্টি করে এবং শেষ পর্যন্ত সরকারের পতন ডেকে আনে।

বাংলাদেশের বড় প্রকল্পগুলোর ক্ষেত্রে পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন। বাংলাদেশের বড় অবকাঠামো প্রকল্পগুলো সম্পূর্ণ অপ্রয়োজনীয় নয়; বরং এগুলো অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে, যা প্রবৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করেছে। দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশের সরকারি ঋণ তুলনামূলকভাবে মধ্যম স্তরে (জিডিপির প্রায় ৪০ শতাংশ) এবং বহিঃ ঋণ মূলত স্বল্পসুদে বা রেয়াতি শর্তে হওয়ায় ঋণ পরিশোধযোগ্য ছিল। বিপরীতে ২০২২ সালের মধ্যে শ্রীলঙ্কার ঋণ জিডিপির ১২০ শতাংশ ছাড়িয়ে যায় এবং দেশটি সার্বভৌম ঋণখেলাপিতে পড়ে।

গত দুই দশকের অধিকাংশ সময় বাংলাদেশ তুলনামূলকভাবে বিচক্ষণ রাজস্ব নীতি অনুসরণ করেছে। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোয় ভর্তুকি বৃদ্ধি, অদক্ষ রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান এবং রাজস্ব প্রবৃদ্ধির স্থবিরতার কারণে রাজস্ব চাপ ক্রমেই বেড়েছে। কোভিড-১৯-এর অভিঘাতের পর শ্রীলঙ্কা বৈদেশিক মুদ্রার সংকটে পড়ে। কারণ, তার অর্থনীতি অতিরিক্তভাবে পর্যটন ও রেমিট্যান্সের ওপর নির্ভরশীল ছিল। কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে কোভিডের ধাক্কা তুলনামূলকভাবে সীমিত ছিল। কারণ, পোশাক রপ্তানি ও প্রবাসী আয়ে গঠিত শক্তিশালী চলতি হিসাব ভারসাম্য খুব বড় আকারে বিঘ্নিত হয়নি।

গত দুই দশকের অধিকাংশ সময় বাংলাদেশ তুলনামূলকভাবে বিচক্ষণ রাজস্ব নীতি অনুসরণ করেছে। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোয় ভর্তুকি বৃদ্ধি, অদক্ষ রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান এবং রাজস্ব প্রবৃদ্ধির স্থবিরতার কারণে রাজস্ব চাপ ক্রমেই বেড়েছে। কোভিড-১৯-এর অভিঘাতের পর শ্রীলঙ্কা বৈদেশিক মুদ্রার সংকটে পড়ে। কারণ, তার অর্থনীতি অতিরিক্তভাবে পর্যটন ও রেমিট্যান্সের ওপর নির্ভরশীল ছিল। কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে কোভিডের ধাক্কা তুলনামূলকভাবে সীমিত ছিল। কারণ, পোশাক রপ্তানি ও প্রবাসী আয়ে গঠিত শক্তিশালী চলতি হিসাব ভারসাম্য খুব বড় আকারে বিঘ্নিত হয়নি।

শ্রীলঙ্কার রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মুদ্রার অতিমূল্যায়ন বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ নিঃশেষ করেছে এবং রপ্তানি খাতকে বিপর্যস্ত করেছে। অন্যদিকে বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রিত ভাসমান বিনিময়ব্যবস্থা—যা ২০২২ সাল থেকে বিলম্বিত সমন্বয় ও একাধিক বিনিময় হারের দ্বারা চিহ্নিত—একই অব্যবস্থাপনার অপেক্ষাকৃত কম কিন্তু ক্রমবর্ধমান ঝুঁকিপূর্ণ রূপ প্রতিফলিত করে।

দক্ষ সামষ্টিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা বলতে বোঝায় নীতির ধারাবাহিকতা, রাজস্ব স্বচ্ছতা, স্বাধীন কেন্দ্রীয় ব্যাংকিং, নিয়মভিত্তিক শাসন ও প্রাতিষ্ঠানিক শক্তি, যা আস্থা অর্জন, প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ ও আন্তর্জাতিক সহায়তা নিশ্চিত করতে অপরিহার্য। বাংলাদেশে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন হওয়া এবং অতিরিক্ত হস্তক্ষেপ অর্থনৈতিক প্রশাসনে আস্থার ঘাটতি তৈরি করেছে। সাম্প্রতিক আইএমএফ কর্মসূচি নিজেই দেরিতে সমন্বয়ের ও আত্মতুষ্টির নীতির মূল্য কতটা বড় হতে পারে, তার এক প্রকৃষ্ট উদাহরণ।

সামষ্টিক স্থিতিশীলতা কেবল প্রবৃদ্ধির হারসংক্রান্ত বিষয় নয়—এটি নির্ধারণ করে প্রবৃদ্ধি কতটা অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই হবে। বাংলাদেশে উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি ও রাজস্ব অব্যবস্থাপনা দীর্ঘদিন ধরেই বিদ্যমান। উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি, স্বল্প কর-জিডিপি অনুপাত (জিডিপির ৯ শতাংশেরও নিচে), ভর্তুকি ও সামাজিক সুরক্ষা, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও জলবায়ু সহনশীলতায় ব্যয় হ্রাস—এসবই দরিদ্র জনগোষ্ঠীর ওপর অপ্রতিসাম্য প্রভাব ফেলেছে, বাস্তব আয় কমিয়েছে এবং বৈষম্য বাড়িয়েছে। রাজস্ব অব্যবস্থাপনা রাষ্ট্রের সামাজিক সুরক্ষা ও মানবসম্পদ উন্নয়নে বিনিয়োগের সক্ষমতা সীমিত করেছে। এ পরিস্থিতি পুনর্বণ্টন, সরকারি বিনিয়োগ ও সামাজিক নিরাপত্তাকে বাধাগ্রস্ত করেছে, যার ফলে প্রকৃত দারিদ্র্য ও বৈষম্য বেড়েছে।

আমাদের মনে রাখতে হবে, সুশৃঙ্খল সামষ্টিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা কেবল বাজেট ভারসাম্য রক্ষা বা প্রযুক্তিগত কোনো বিষয় নয়; এটি গভীরভাবে রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক। এটি প্রতিফলিত করে সরকার কতটা দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় স্বার্থকে স্বল্পমেয়াদি রাজনৈতিক লাভের ঊর্ধ্বে স্থান দিতে সক্ষম। সুশৃঙ্খল ব্যবস্থাপনা রাজনীতি, প্রতিষ্ঠান ও প্রণোদনার মধ্যে ভারসাম্য সৃষ্টি করে, যা উদ্যোক্তা সৃষ্টি, উদ্ভাবন এবং সামগ্রিক উন্নয়নকে বিকশিত হওয়ার পরিবেশ প্রদান করে।

দক্ষিণ কোরিয়া ও ভিয়েতনামের মতো দেশগুলো টেকসই ও দ্রুত প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে মূলত তাদের রাজস্ব শৃঙ্খলা, রপ্তানি প্রতিযোগিতা ও নীতিগত বিশ্বাসযোগ্যতা বজায় রাখার মাধ্যমে; এমনকি রাজনৈতিক পরিবর্তনের সময়ও তারা এ ধারাবাহিকতা রক্ষা করেছে।

বিশ্বব্যাংক তার ২০২৪ ও ২০২৫ সালের বাংলাদেশ–সংক্রান্ত আপডেটে জরুরি ভিত্তিতে মুদ্রানীতি সংস্কার এবং একক বিনিময় হারের ব্যবস্থা প্রবর্তনের পরামর্শ পুনর্ব্যক্ত করেছে, যাতে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী করা ও মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হয়। তারা রাজস্ব আয় (দেশীয় সম্পদ আহরণ) বৃদ্ধি করার পরামর্শ দিয়েছে, যাতে অবকাঠামো ও মানবসম্পদ উন্নয়নে বিনিয়োগের জন্য অর্থ জোগান সম্ভব হয়। পাশাপাশি তারা বিশেষ করে আর্থিক খাতে সাহসী ও দ্রুত সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার ওপরও গুরুত্ব দিয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশের রাজস্বঘাটতি জিডিপির প্রায় ৪ দশমিক ৫ শতাংশের সমান। বিশ্বব্যাংক সতর্ক করেছে, রাজস্ব বৃদ্ধির দক্ষতা, মুদ্রানীতির শৃঙ্খলা এবং কাঠামোগত সংস্কার না হলে এই চাপ অব্যাহত থাকবে।

নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ রবার্ট সলো (১৯৫৬) তাঁর প্রবৃদ্ধি মডেলে দেখিয়েছিলেন, দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধি শুধু মূলধন ও শ্রমের ওপর নয়, বরং সম্পদ কতটা দক্ষভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে, তার ওপর নির্ভর করে, যা সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করে। কিন্তু বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি আলোচনায় দক্ষতার বিষয়টি খুব কমই গুরুত্ব পায়।

কয়েক দশক ধরে বাংলাদেশের অর্থনীতি তৈরি পোশাক রপ্তানি, প্রবাসী আয় ও জনমিতিক সুবিধার ওপর ভিত্তি করে সমৃদ্ধ হয়েছে। কিন্তু এই কম মূল্যের শ্রমনির্ভর ও রপ্তানিমুখী প্রবৃদ্ধির মডেল অনন্তকাল টিকে থাকবে না। পরবর্তী ধাপে প্রবৃদ্ধিকে টেকসই করতে হবে উদ্ভাবননির্ভর উন্নয়নের মাধ্যমে, যা নির্ভর করবে শৃঙ্খলাপূর্ণ সামষ্টিক ব্যবস্থাপনার ওপর।

দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজন বিশ্বাসযোগ্য প্রতিষ্ঠান, রাজস্ব শৃঙ্খলা এবং এমন প্রণোদনা, যা সম্পদকে উৎপাদনশীল খাতে প্রবাহিত করে—উন্নত সরকারি অর্থব্যবস্থা ও ব্যাংকিং শৃঙ্খলা, দুর্নীতি ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা হ্রাস এবং দক্ষতা ও উদ্ভাবনে অধিক বিনিয়োগের মাধ্যমে।

  • এন এন তরুণ অর্থনীতির অধ্যাপক, ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ। সাউথ এশিয়া জার্নালের এডিটর অ্যাট লার্জ। nntarun@gmail.com

সংস্কারের বছরের বাজেটেও কোনো সংস্কারের ইঙ্গিত নেই

অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট উপস্থাপন করেন এমন এক সময়ে, যখন শেখ হাসিনার স্বৈরাচারী শাসনের পতনের পর দেশ এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ অতিক্রম করছে। এ অবস্থায় যখন বহু প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার প্রক্রিয়াধীন এবং সালেহউদ্দিন আহমেদ একজন অর্থনীতিবিদ, সাবেক আমলা ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর, তখন তাঁর উপস্থাপিত বাজেটে কোনো দূরদর্শী সংস্কারের ইঙ্গিত না থাকা অত্যন্ত বিস্ময়কর বটে। এই বাজেট বরং অতীতের ধারাবাহিকতা ধরে রাখা এক হতাশাজনক দলিল। অর্থাৎ যথা পূর্বং তথা পরং।

এতে নেই ভবিষ্যতের দিকনির্দেশনা, নেই কোনো সংস্কার পরিকল্পনার প্রতিফলন। উন্নত দেশের অর্থমন্ত্রীরা সবাই পেশায় অর্থনীতিবিদ না হলেও তাঁরা অর্থনীতিতে গভীর জ্ঞানের অধিকারী। তাঁরা কোনো অর্থনৈতিক তত্ত্বের আলোকে বাজেট প্রণয়ন করেন এবং নতুন কোনো উন্নয়ন কৌশলের প্রস্তাব করেন।

উদাহরণস্বরূপ, হার্ভার্ডের অধ্যাপক, জোসেফ শমপিটার তাঁর কর্মজীবনের প্রথম দিকে ১৯১৯ সালে অস্ট্রিয়ান সরকারের অর্থমন্ত্রী হন। তখন তিনি আরেক অস্ট্রিয়ান সমাজবিজ্ঞানী রুডলফ গোল্ডশাইডের একটি বিখ্যাত তত্ত্ব, রাজস্ব সমাজবিজ্ঞানের ধারণাটি প্রয়োগ করে বাজেট প্রণয়ন করেন। ২০২৫-২৬ বাজেটে এসবের অস্তিত্ব নেই। এটি একটি নিছক রক্ষণশীল রাজস্ব ব্যবস্থাপনা, যেখানে প্রকৃত আর্থসামাজিক পরিবর্তনের কোনো ধারণারও স্থান নেই।

আমরা আশা করেছিলাম, এই বছরের বাজেট একটি স্পষ্ট ও সুসমন্বিত অর্থনৈতিক তত্ত্বের ভিত্তিতে প্রণীত হবে। কিন্তু এটি না কেইনসীয় দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন, না কাঠামোগত রূপান্তরের প্রতি কোনো ডেভেলপমেন্টালিস্ট অঙ্গীকার। আবার এটি নিওক্ল্যাসিক্যাল সাপ্লাই-সাইড নীতির পথও অনুসরণ করেনি, যা বেসরকারি খাতকে উদ্দীপিত করতে পারত। বরং বাজেটটি একটি সংখ্যাগত হিসাব–নিকাশ ছাড়া আর কিছু নয়—এর মধ্যে ভবিষ্যতের কোনো দিশাও নেই।

সাবেক অর্থমন্ত্রী এ এস এম কিবরিয়া একবার জাতীয় সংসদে মন্তব্য করেছিলেন, ‘মাননীয় স্পিকার, বিরোধী দলের অর্থমন্ত্রী বাজেটকে হিসাবরক্ষকের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখেন, আর আমি দেখি একজন অর্থনীতিবিদের দৃষ্টিকোণ থেকে।’ দুঃখজনকভাবে এবারের বাজেটও প্রস্তুত হয়েছে একজন হিসাবরক্ষকের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে—কোনোক্রমেই একজন অর্থনীতিবিদের নয়।

বাংলাদেশের জন্য একটি দূরদর্শিতাসম্পন্ন বাজেটের ভীষণ প্রয়োজন। কিন্তু উপস্থাপিত বাজেট একটি গতানুগতিক আমলাতান্ত্রিক অনুশীলন, যা হয়তো জাতীয় হিসাব-নিকাশের ভারসাম্য বজায় রাখতে পারবে, কিন্তু সামাজিক অবিচার ও বৈষম্য দূর করতে পারবে না।

৫ দশমিক ৬৪ ট্রিলিয়ন টাকার রাজস্বের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনযোগ্য বলে মনে হতে পারে, কিন্তু দুর্বল কর আদায়ের ব্যবস্থা, কর প্রশাসনে দীর্ঘস্থায়ী অদক্ষতা, পরোক্ষ করের ওপর অব্যাহত নির্ভরতা, ভ্যাট অব্যাহতি সংস্কারে রাজনৈতিক অনীহা এবং উচ্চপর্যায়ের দুর্নীতির কারণে এই বাজেটকে অত্যন্ত উচ্চাভিলাষীই বলতে হবে। কাঠামোগত কর সংস্কার ছাড়া বাস্তবে এ সংখ্যা অর্জন করা অসম্ভব। এটি বাস্তবায়ন করতে হলে কর আদায়ের প্রক্রিয়ায় গভীর ও পদ্ধতিগত সংস্কার করতে হবে। জরুরি আরও কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে, যেমন করভিত্তি সম্প্রসারণ করা, অর্থাৎ আরও বেশি মানুষ এবং ব্যবসাকে করের জালে আনা, কর ফাঁকি রোধ এবং দুর্নীতি হ্রাস করা।

ডিজিটাইজেশন শক্তিশালী করা। পরোক্ষ করের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা ছেড়ে আয় এবং করপোরেট করের মতো আরও ন্যায়সংগত প্রত্যক্ষ করের দিকে স্থানান্তর করা। এ ধরনের পদক্ষেপ ছাড়া, উচ্চাভিলাষী রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা কেবল কাগজে–কলমে একটি সংখ্যা হয়েই থাকবে।

দ্বিতীয়ত, বর্তমান বাজেটে প্রস্তাবিত ঋণের পরিমাণ অনেক সফল অর্থনীতির ঋণের মাত্রা বিবেচনায় নিলে যথেষ্ট যুক্তিসংগত বটে। যেসব দেশে সরকারের ঋণ-জিডিপি অনুপাত অনেক বেশি, এমন কিছু উদাহরণ দিই। জাপানের মোট সরকারি ঋণ তার জিডিপির ২৬০ শতাংশের বেশি, যা উন্নত দেশগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ। এটি উদ্বেগজনক মনে হতে পারে, কিন্তু বাংলাদেশের বা পাকিস্তানের মতো দেশের বিপরীতে জাপানের বেশির ভাগ ঋণই দেশীয় উৎস থেকে নেওয়া। তাদের সরকারি বন্ডগুলো মূলত তাদের নিজস্ব নাগরিকের ও প্রতিষ্ঠানের হাতে। ফলে জাপানের ঋণের সুদের হার তুলনামূলকভাবে কম।

যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি, যুক্তরাজ্য ও কানাডার ঋণ-জিডিপি অনুপাত যথাক্রমে ১২৩-১২৪ শতাংশ, ১১০ শতাংশ, ৬৩ শতাংশ, ১৩৫ শতাংশ, ১০১ শতাংশ ও ১০৭ শতাংশ। এসব দেশে ঋণ-জিডিপি অনুপাত তুলনামূলকভাবে বেশি হলেও তাদের অর্থনীতি ভালো করছে—সম্ভবত এ জন্য যে তাদের বড় দেশীয় বাজার থাকায় তারা তাদের ঋণের জোগান ও সুদ স্থিতিশীল রাখতে পারে।

বাংলাদেশের বাজেটে প্রস্তাবিত ঋণের মাত্রা যুক্তিসংগত বলে উল্লেখ করার পর একটি সতর্কবার্তাও জারি করা দরকার। চলতি ব্যয়ের পরিবর্তে উৎপাদনশীল বিনিয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। উচ্চ প্রবৃদ্ধি বজায় রাখা, রাজস্ব সংগ্রহ জোরদার করা (একটি বিস্তৃত করভিত্তিসহ কার্যকর রাজস্ব সংগ্রহের ব্যবস্থা, কর্মকর্তাদের দুর্নীতি ও কর ফাঁকি রোধ ইত্যাদি) এবং প্রাতিষ্ঠানিক স্থিতিশীলতা (রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, আইনের শাসন, দক্ষ আমলা এবং একটি বিশ্বাসযোগ্য, স্বাধীন কেন্দ্রীয় ব্যাংক ইত্যাদি) —দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক স্বাস্থ্যের জন্যও অপরিহার্য। যদি অভ্যন্তরীণ সুদের হার বৃদ্ধি পায় বা কোনো আন্তর্জাতিক ধাক্কা (এক্সটারনাল শক) লাগে, তাহলে ঋণ অতিরিক্ত চাপ তৈরি করবে। অতএব এ ক্ষেত্রে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতেই হবে।

বিশেষজ্ঞ ও উন্নয়ন সংস্থাগুলোর বারবার সতর্কীকরণ সত্ত্বেও শিক্ষা ব্যয় জিডিপির মাত্র ২ দশমিক ১ শতাংশ, যেখানে স্বাস্থ্য খাতে ১ শতাংশের কম। এই সংখ্যাগুলো সব আন্তর্জাতিক মানের চেয়ে কম—ইউনেসকোর সুপারিশকৃত ৪ থেকে ৬ শতাংশ, নিম্ন আয়ের দেশগুলোর গড় এবং দক্ষিণ এশিয়ার গড়ের চেয়ে অনেক কম। বাংলাদেশের ২ দশমিক ১ শতাংশের বিপরীতে নেপাল, ভুটান ও মালদ্বীপে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ যথাক্রমে ৪ দশমিক ৩ শতাংশ, ৮ শতাংশ ও ৪ দশমিক ৭ শতাংশ। অথচ নেপালের মাথাপিছু আয় বাংলাদেশের তুলনায় অর্ধেক।

২০১৮ সালে জিডিপির অংশ হিসেবে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ব্যয় দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সর্বনিম্ন ছিল এবং ২০১১ সালে শিক্ষা ব্যয় ছিল সর্বনিম্নের চেয়ে সামান্য বেশি। ২০১২ সাল থেকে, বাংলাদেশ ধীরে ধীরে শিক্ষা বাজেট কমিয়ে আনছে অথচ স্বাস্থ্য ও শিক্ষাই হিউম্যান ক্যাপিটালের তথা মানবপুঁজির ভিত্তি।

এ ধরনের মনোভাব নীতিনির্ধারকদের নৈতিক দেউলিয়াত্বকে প্রতিফলিত করে, যেখানে লাখ লাখ মানুষ শিক্ষাগত বৈষম্য এবং স্বাস্থ্যসেবার অপর্যাপ্ত সুযোগের মুখোমুখি হয় প্রতিদিন। আর একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বাংলাদেশে স্বাধীনতার পর থেকেই দেখা যাচ্ছে, এই সীমিত বরাদ্দের একটি উল্লেখযোগ্য অংশও অব্যবহৃত থেকে যায়। এটি আমলাতান্ত্রিক অদক্ষতা এবং দুর্বল প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতাকে নির্দেশ করে।

বাজেটে বেসরকারি খাতের প্রবৃদ্ধিকে সমর্থন করার দাবি করা হয়েছে, কিন্তু বাগাড়ম্বরের পেছনে বাস্তব প্রচেষ্টা খুব কম। এফবিসিসিআই, বিজিএমইএর মতো ব্যবসায়িক গোষ্ঠীগুলো ইতিমধ্যেই উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। উদাহরণস্বরূপ, টার্নওভার এবং ডিজিটাল পেমেন্টের ওপর নতুন কর ছোট ব্যবসা ও স্টার্টআপগুলোকে ক্ষতি করতে পারে বলে তারা জানিয়েছে। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দূর করার, রপ্তানি বৃদ্ধি করার বা বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করার জন্য কোনো রোডম্যাপ নেই এই বাজেটে। সংক্ষেপে সরকার বেসরকারি খাতের কথা উল্লেখ করে, কিন্তু বাস্তব কর্মকৌশল প্রয়োগ করার নাম নেই।

শিক্ষিত যুব বেকারত্ব মোকাবিলায় বাংলাদেশকে তার পদ্ধতি পুনর্বিবেচনা করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাকে বাজারের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে হবে; প্রযুক্তি, স্বাস্থ্যসেবা ও পরিবেশবান্ধব শিল্পে দক্ষতার ওপর জোর দিতে হবে। তরুণদের ব্যবহারিক দক্ষতায় সজ্জিত করার জন্য বৃত্তিমূলক ও প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণ সম্প্রসারণ করতে হবে। সরকারের উচিত তহবিল ও পরামর্শদানের মাধ্যমে উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করা এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নের মাধ্যমে ডিজিটাল চাকরি ও ফ্রিল্যান্সিংকে সমর্থন করা।

সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব ইন্টার্নশিপ ও শিক্ষানবিশ তৈরি করতে পারে, অন্যদিকে বড় শহরগুলোর বাইরে সুযোগ বিকেন্দ্রীকরণ তরুণদের পূর্ণ সম্ভাবনা কাজে লাগাতে সাহায্য করবে। সঠিক নীতিমালার মাধ্যমে এই বিশাল যুব জনগোষ্ঠী উদ্ভাবন ও প্রবৃদ্ধির একটি শক্তিশালী ইঞ্জিন হয়ে উঠতে পারে।

২০২৫-২৬ সালের বাজেট সাহসী সংস্কার নয়, বরং আর্থিক ব্যয় সংকোচনের মানসিকতার ধারাবাহিকতার প্রতিফলন। এটি একটি সুসংগত অর্থনৈতিক কর্মকৌশল গ্রহণ করতে বা দেশের পরিবর্তিত উন্নয়ন চাহিদা পূরণে সাড়া দিতে ব্যর্থ হয়েছে।

বাংলাদেশের জন্য একটি দূরদর্শিতাসম্পন্ন বাজেটের ভীষণ প্রয়োজন। কিন্তু উপস্থাপিত বাজেট একটি গতানুগতিক আমলাতান্ত্রিক অনুশীলন, যা হয়তো জাতীয় হিসাব-নিকাশের ভারসাম্য বজায় রাখতে পারবে, কিন্তু সামাজিক অবিচার ও বৈষম্য দূর করতে পারবে না।

গতানুগতিক এই ধারা থেকে বেরিয়ে আসার জন্য সরকারকে কেইনসীয় ও কাঠামোগত নীতির ওপর ভিত্তি করে একটি উন্নয়ন কৌশল গ্রহণ করতে হবে; প্রত্যক্ষ কর আদায় বৃদ্ধির জন্য কর প্রশাসন সংস্কার করতে হবে; শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও ডিজিটাল অবকাঠামোয় বিনিয়োগ করতে হবে; প্রতিযোগিতা ও কর্মসংস্থান উন্নত করার জন্য একটি শিল্পনীতি তৈরি করতে হবে এবং বাজেট বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। না হলে একটি উন্নত দেশে উন্নীত হওয়ার স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে যাবে।

  • এন এন তরুণ অর্থনীতির অধ্যাপক, ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ। সাউথ এশিয়া জার্নালের এডিটর অ্যাট লার্জ। nntarun@gmail.com

শ্রমশোষণই বাংলাদেশের উন্নয়নের ভিত্তি

বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের উন্নয়নের প্রশংসা হয়েছে অনেক। অর্থনীতিবিদ ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদের ‘ডিভেলপমেন্ট সারপ্রাইজ’, বিশ্বব্যাংকের প্রাক্তন প্রধান অর্থনীতিবিদ কৌশিক বসুর ‘হোয়াই বাংলাদেশ ইজ বুমিং’ প্রবন্ধে বাংলাদেশ অর্থনীতিকে ‘টাইগার ইকোনোমি’ আখ্যা দেওয়া অথবা মার্কিন সাংবাদিক নিকোলাস ক্রিস্টোফের নিউইয়র্ক টাইমস-এর বাংলাদেশের উন্নয়ন বিষয়ক কলাম বা দি ইকোনোমিস্টের বাংলাদেশের উন্নয়নকে ধাঁধা হিসেবে অভিহিত করা এর সাক্ষ্য।

যথার্থ এ সব প্রশংসার সাথে আরও যোগ করা যায়। পোশাক শিল্পে নারীরা বিশ্ব বাজারে বাংলাদেশকে করে তুলেছে অপ্রতিদ্বন্দ্বী, স্বদেশে এনেছে বিপ্লব। প্রবাসী শ্রমিকের পাঠানো অর্থ পেণ্ডেমিক অবস্থার মধ্যেও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মজুদ বাড়িয়ে চলছিল। কৃষক রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে ফসলের ফলন বাড়িয়ে চলেছেন। কোভিড-১৯ এর ভয়াবহ মহামারির মধ্যেও কৃষক তাঁর ফলন বাড়িয়েছিলেন। তার মানে হল, বাংলাদেশের উন্নয়নের প্রধান কারিগর এ দেশের শ্রমজীবি মানুষ। অথচ এ দেশের মতো এত নিম্ন মজুরি পৃথিবীর আর কোন দেশে নেই। উল্লেখিত ব্যক্তিবর্গও ওপর থেকে প্রবৃদ্ধি আর উন্নয়নের গল্পে বিমোহিত। তাঁরা ভেতরের গল্প জানেন না। তাঁরা জানেন না যে এই প্রবৃদ্ধি আর উন্নয়নের ভিত্তি হল শ্রম শোষণ। এ দেশে শ্রমিকেরা যে মানবেতর জীবন যাপন করেন, তাঁদের লেখায় তার চিহ্নমাত্র নেই। আজ শ্রমদিবসে সেই গল্প লিখলে কিছুটা ‘পাপমোচন’ হতে পারে।

এটা এখন সর্বজন বিদিত যে, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রধান চালিকা শক্তি তৈরি পোশাক শিল্প। রপ্তানিমুখী এই তৈরি পোশাক শিল্পের যাত্রা শুরু হয়েছিল ১৯৭০-এর দশকের শেষভাগে, একটি ক্ষুদ্র ও অপ্রচলিত রপ্তানি খাত হিসেবে। ১৯৭৮ সালে রিয়াজ গার্মেন্টস যখন যুক্তরাষ্ট্রে প্রথম চালান রপ্তানি করে, তখন বাংলাদেশের মোট রপ্তানি মূল্য ছিল মাত্র ৬৯ হাজার মার্কিন ডলার। এর মাত্র দুই দশকের মধ্যেই, ২০০২ অর্থবছরে পোশাক রপ্তানি বৃদ্ধি পেয়ে ৪.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছে।

গত এক দশকে খাতটি গড়ে প্রতি বছর ১৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে—যা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডেও এক অভূতপূর্ব সাফল্য। বস্তুত, বিশ্বের যে কোনো নবীন শিল্পের জন্য এটি একটি ব্যতিক্রমধর্মী উচ্চ প্রবৃদ্ধির উদাহরণ। এই দ্রুত অগ্রগতির সাথে শিল্পভিত্তিরও শক্তিশালী সম্প্রসারণ ঘটেছে—১৯৮৩ সালে যেখানে কারখানার সংখ্যা ছিল ৫০টিরও কম, ২০০২ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৩,৪০০-এর অধিক, এবং আরএমজি শ্রমিকের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে প্রায় ১৫ লাখে পৌঁছে। আর ২০২৩-এ রপ্তানিকারক কারখানা্র সংখ্যা ৩, ৫৫৫টি, শ্রমিকের সংখ্যা ৪০ লক্ষ এবং এই খাত থেকে রপ্তানি পরিমাণ ৪৭, ৩৮ বিলিয়ন ডলার, যা গত কয়েক দশক ধরেই মোট রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশের বেশি।  

কৃষি ও খাদ্য উৎপাদন বাংলাদেশেকে স্বনির্ভর করতে সাহায্য করেছে। বাংলাদেশ এখন বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম চাল উৎপাদনকারী দেশ। ২০২৩ সালে চাল উৎপাদন ৩৯.১ মিলিয়ন মেট্রিক টনে পৌঁছেছে, যা ১৯৭৩ সালের ৯.৯ মিলিয়ন টন থেকে উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি। বাংলাদেশে প্রায় ৬ কোটি ক্ষুদ্র কৃষক রয়েছেন, যারা ১.২ কোটি খামারে কাজ করেন। অথচ কৃষকের স্বার্থ দেখার কেউ নেই।

শ্রমিক সংগঠনের মতো কৃষকদের তেমন কোন সংগঠন নেই। ফলে তাঁদের দাবি আদায়ের ক্ষমতা নেই বললেই চলে।  ১৯৮৪ সালের কৃষি শ্রমিক (সর্বনিম্ন মজুরি) অধ্যাদেশ কৃষি শ্রমিকদের জন্য দৈনিক সর্বনিম্ন মজুরি ৩.২৭ কেজি চাল অথবা তার আর্থিক সমমূল্য নির্ধারণ করে। তবে, বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে এই অধ্যাদেশটি এখনও হালনাগাদ করা হয়নি। বাংলাদেশের শ্রমশক্তির একটি উল্লেখযোগ্য অংশ কৃষি শ্রমিকদের দ্বারা গঠিত হলেও, তারা প্রায়ই মজুরি বৈষম্যের মুখোমুখি হন। উদাহরণস্বরূপ, তথ্য অনুযায়ী পুরুষ কৃষি শ্রমিকদের গড় দৈনিক মজুরি প্রায় ৩৮৬ টাকা, যেখানে নারী শ্রমিকরা গড়ে প্রায় ২৪৬ টাকা আয় করেন, যা বাংলাদেশের অন্য সব ক্ষেত্রের মতোই লিংগ বৈষম্যকে প্রকাশ করে।

রেমিট্যান্স অর্থনীতির আরেকটি প্রধান চালিকাশক্তি। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বাংলাদেশে রেমিট্যান্স আয় ২৩.৯১ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে, যা আগের বছরের ২১.৬১ বিলিয়ন ডলার থেকে বৃদ্ধি পেয়েছে। অর্থনীতিতে রেমিট্যান্সের অবদান দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। দেশের জিডিপির ৫.২১% এবং মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৫০ শতাংশ। অতীতে বিভিন্ন সরকার ​সঠিক মাধ্যমে (প্রপার চ্যানেলে) অর্থ পাঠানোর জন্য প্রবাসী শ্রমিকদের অনেক প্রনোদনা দিয়েছে, কিন্তু আসল কাজটাই আজ পর্যন্ত কোন সরকার করে নি। বাইরে যাওয়ার আগে শ্রমিকদের বিভিন্ন ধরণের প্রশিক্ষণ দিয়ে দক্ষ শ্রমিকে পরিণত করার কাজটিই কেউ করে নি। এটা করতে পারলে শ্রমিকদের জীবনমানের উন্নয়ন ঘটত। রাষ্ট্রের রপ্তানি আয় বৃদ্ধি পেত। এখানে আমি একটি প্রস্তাব করতে চাই। বিদেশ পাঠানো রেমিট্যান্সের অর্থ থেকে রাষ্ট্রের যে আয় হয়, তা থেকে একটি ফান্ড গঠন ক’রে বিদেশে কর্মরত শ্রমিকদের পরিবারের সন্তানদের জন্য বৃত্তির ব্যবস্থা করা। যাতে তাঁদের সন্তানরা সাচ্ছন্দের পড়াশুনা চালিয়ে যেতে পারে। এতে গরীব সন্তানরা ধনীর সন্তানদের সাথে কিছুটা হলেও টিকে থাকতে পারবে। এতে সমাজে বৈষম্য হ্রাস পাবে।

৮০-এর দশকে যখন পোশাক শিল্পের উত্থান শুরু হয়, তখন আনুষ্ঠানিক ন্যূনতম মজুরির কোনো কাঠামো ছিল না।​ ১৯৯৪ সালে প্রথম আনুষ্ঠানিক ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ করা হয় — মাসে ৯৩০ টাকা। এর পর ১২ বছর পর অর্থাৎ ২০০৬ সালে মজুরি বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়ায় ১,৬৬২.৫০ টাকা। ২০১০ সালে মজুরি বৃদ্ধি পেয়ে হয় মাসে ৩,০০০ টাকা।​ ২০১৩ সালে মজুরি বেড়ে হয় ৫,৩০০ টাকা। ২০১৮ সালে শ্রমিকরা ১৬,০০০ টাকার দাবির পরেও, ন্যূনতম মজুরি নির্ধারিত হয় মাত্র ৮,০০০ টাকা। ২০২৩ সালে বিক্ষোভের পর মজুরি বৃদ্ধি পেয়ে হয় ১২,৫০০ টাকা (প্রায় ১১৩ মার্কিন ডলার), যা এখনও শ্রমিকদের দাবিকৃত ২৩,০০০ টাকা (প্রায় ২০৮ মার্কিন ডলার) থেকে অনেক কম।

পক্ষান্তরে, প্রধান পোশাক রপ্তানিকারক সব দেশেই ন্যূনতম মজুরি ছিল আমাদের তুলনায় অনেক গুণ বেশি। কাম্বোডিয়ায় ২০১০ সালে ন্যূনতম মজুরি ছিল ৬১ ডলার, যা ২০১৮ সালে বেড়ে হয় ১৭০ ডলার, ২০২৫ সালে ২০৮ ডলার। ভিয়েতনামে ২০১৬ সালে ন্যূনতম মজুরি ছিল (অঞ্চল ভেদে) প্রায় ১১০ ডলার থেকে ১৬১ ডলার, যা ২০২৫ সালে হয় ১৭৫ ডলার। ভারতে ২০১৬ সালে (অঞ্চল ভেদে) মজুরি ছিল পোশাক ১০৬ ডলার এবং ২০২৫-এ  ১৭৮ ডলার। চীনে ২০২৪ সালে ন্যূনতম মজুরি অঞ্চলভেদে ভিন্ন ভিন্ন; গড়ে  ৪০০ মার্কিন ডলার। পাকিস্তানেও ন্যূনপ্তম মজুরি আমাদের দেশের বেশি, ২০২৫ সালে প্রায় ১৩২ ডলার।

এই তুলনা স্পষ্ট বলে দেয় যে, বাংলাদেশের পোশাক শ্রমিকরা ঐতিহাসিকভাবে অন্যান্য প্রধান রপ্তানিকারক দেশের শ্রমিকদের তুলনায়  অনেক কম মজুরি পেয়ে আসছেন।

গত তিন দশকে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি ২৪ গুণ বেড়েছে। কিন্তু মজুরি বৃদ্ধির হার সেই তুলনায় নগন্য। সংখ্যাগতভাবে কিছুটা বৃদ্ধি পেলেও প্রকৃতপক্ষে মুদ্রাস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় অনুযায়ী এটি এখনও অপর্যাপ্ত। অর্থাৎ শ্রমিকদের নমিনাল ইনকাম কিছুটা বাড়লেও প্রকৃত আয় মোটেই বাড়ে নি।

তার মানে এটা স্পষ্ট যে, বাংলাদেশের বহুল প্রশংসিত এই অর্থনৈতিক উত্থান মূলত শ্রমিক শোষণের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। ২০২৩ সালে শুধুমাত্র তৈরি পোশাক খাত থেকেই ৪২.৭ বিলিয়ন ডলার আয় হয়েছে—যা দেশের মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮৪.৬ শতাংশের সমান—এবং এই আয়ের পেছনে রয়েছে কোটি কোটি স্বল্প-মজুরির শ্রমিকের কঠোর পরিশ্রম, যাদের অনেকেই নারী। এই পোশাক রপ্তানি বাংলাদেশের জিডিপির প্রায় ১০ শতাংশ এবং প্রতি ব্যক্তির জন্য জাতীয় আয়ে গড়ে প্রায় ১৮৪ ডলার অবদান রেখেছে। ৫.৭৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধিতে যে শ্রমিকের অবদান সিংহভাগ, সেই শ্রমিকই রয়ে গেছে দারিদ্র্যের দুষ্ট চক্র আবদ্ধ । এই ‘অর্থনৈতিক বিস্ময়’ ন্যায্য সমৃদ্ধির অর্থাৎ সবার জন্য সমৃদ্ধির ওপর নয়, বরং কর্মজীবী শ্রেণির পদ্ধতিগত দমন-পীড়নের ওপর দাঁড়িয়ে আছে।

ন্যায্য মজুরির দাবিতে এ দেশে বারবার আন্দোলন হয়েছে। প্রতিবারই সরকার ও মালিক পক্ষ একই সুরে এটাকে চক্রান্ত আখ্যা দিয়ে দমন, পীড়ন ও হত্যার পথ বেছে নিয়েছে। একই সুরে কথা বলবে কারণ সরকারের মন্ত্রী, এম.পিরাই কারখানার মালিক। ব্যবসায়ী শ্রেণির হাতে রাজনীতি থাকলে যে শ্রমজীবী মানুষের ভাগ্য ফিরবে না— এটা এখন প্রতিষ্ঠিত সত্য। বাংলাদেশের অবস্থা অন্যান্য উন্নত পুঁজিবাদী দেশে থেকে আলাদা। কারণ এখানে আজও একটি প্রকৃত পুঁজিপতি শ্রেণী গড়ে ওঠে নি। ফলে পুঁজিবাদের উদারতা থেকে আমরা বঞ্চিত। লুটপাটের সংস্কৃতি কোনক্রমেই পুঁজিবাদের সংস্কৃতি নয়।

জীবনের শেষ দিকে, রবীন্দ্রনাথ এক সময় উপলব্ধি করলেন, যাঁদের শ্রমে এই জগৎ-সংসার চলছে তাঁদের জন্য কিছুই লেখা হয় নি, তাঁর সাহিত্যে সেই শ্রমজীবি মানুষেরই কোন স্থান হয় নি। এজন্য তিনি গভীর বেদনা অনুভব করলেন।  ১৯৪১ সালে ‘জন্মদিনে’ কবিতায় তিনি লিখলেন:

‘চাষি ক্ষেতে চালাইছে হাল,

তাঁতি বসে তাঁত বোনে, জেলে ফেলে জাল’

একই কবিতায় তিনি তাঁর সীমাবদ্ধতার কথাও উল্লেখ করেন এবং এমন একজন কবির আবির্ভাব কামনা করেন যিনি তাঁর কবিতায় শ্রমজীবি মানুষের জীবনগাথা রচনা করবেন। তিনি লিখেছেন: 

‘আমার কবিতা, জানি আমি,

গেলেও বিচিত্র পথে হয় নাই সর্বত্রগামী

যে আছে মাটির কাছাকাছি

সে কবির-বাণী-লাগি কান পেতে আছি’

…………………………………………………………………………………………………..

এন এন তরুণ অর্থনীতির অধ্যাপক, ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ । সাউথ এশিয়া জার্নালের এডিটর অ্যাট লার্জ। nntarun@gmail.com

‘ও গঙ্গা তুমি বইছো কেন?’

গাজায় যে হত্যাযজ্ঞ এবং জাতিগত নির্মূলের ও বাস্তুচ্যুতির অভিযান চলছে, তা আজ অতীতের সব মানবতাবিরোধী নারকীয় ঘটনার বিভৎসতার সীমা অতিক্রম করেছে। ইতিহাসের কোন পর্বে কোন দেশে এত শিশুর বোমাবর্ষণে বা গুলিতে কিংবা অনাহারে মৃত্যু ঘটেছে কিনা আমার জানা নেই। প্রশ্ন হল, এর শেষ কোথায়? আদৌ কি শেষ হবে? কীভাবে হবে? আমি জানি না। কিন্তু বিশ্বব্যবস্থার আমুল পরিবর্তন ছাড়া যে এর শেষ নেই, সেটা জানি।

২০২৫ সালের ৪ মার্চ পর্যন্ত গাজা যুদ্ধে মোট ৫০,০০০-এরও বেশি মানুষের মৃত্যুর ঘটেছে—যার মধ্যে ৪৮,৪০৫ জন ফিলিস্তিনি এবং ১,৭০৬ জন ইসরায়েলি। এছাড়া নিহতদের মধ্যে রয়েছেন ১৬৬ জন সাংবাদিক ও গণমাধ্যমকর্মী, ১২০ জন শিক্ষাবিদ এবং ২২৪ জনেরও বেশি মানবিক সহায়তাকর্মী—যার মধ্যে ১৭৯ জন ছিলেন জাতিসংঘের অন্তর্গত।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে ইসরায়েল অন্তত ১৭, ৪০০ শিশুকে হত্যা করেছে। আরও বহু শিশু ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে আছে—তাদের অধিকাংশই মৃত বলে ধারণা করা হচ্ছে।  ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী এ পর্যন্ত ১৭, ০০০ শিশু বাবা-মা বা পরিবার-পরিজন থেকে আলাদা, নিস্ব, নিঃসঙ্গ, একাকী। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত গড়ে প্রতি ৪৫ মিনিটে একজন আর প্রতিদিন ১০০ শিশুকে হত্যা করা হয়েছে।

গাজা এখন আর কোন জনপদ বা লোকালয় নয়, গাজা এখন একটি ধ্বংসস্তূপ যেন মহাপ্রলয়ের শেষ চিহ্ণ। এটা একদা ২৩ লাখ মানুষের বাসস্থান ছিল, তাঁদের অধিকাংশই আজ বাস্তুচ্যুত। এই প্রলয়ংকর হামলায় গাজায় ৩৯,৩৮৪ শিশু পিতা-মাতাদের একজনকে অথবা উভয়কে হারিয়েছে।  যেসব শিশু বেঁচে আছে, তাদের অনেকেই একাধিক যুদ্ধের মানসিক আঘাত বয়ে বেড়াচ্ছে। এদের প্রত্যেকেই জন্মের পর থেকেই ইসরায়েলি অবরোধের দমবন্ধ পরিবেশে বেড়ে উঠেছে—যেখানে তাদের জীবনের প্রতিটি দিনই নিপীড়নের ছায়ায় আচ্ছন্ন।

এই প্রেক্ষাপটে ৭ অক্টোবর ছাত্রদের নেতৃত্বে সংগঠিত হল বৈশ্বিক উদ্যোগ ‘দ্য ওয়ার্ল্ড স্টপস’, যা গাজার ফিলিস্তিনি জনগণের প্রতি গভীর আন্তর্জাতিক সংহতির প্রতিফলন, বিশেষভাবে শিশুদের ওপর বিপর্যয়কর প্রভাব তুলে ধরেছে। এই আন্দোলন শুধু ক্রমবর্ধমান মানবিক সংকটের দিকে মনোযোগ আকর্ষণই করেনি, বরং বৈশ্বিক হস্তক্ষেপের জরুরি প্রয়োজনের কথাও জোর দিয়ে বলেছে। ‘দ্য ওয়ার্ল্ড স্টপস’-এর মতো আন্দোলনের মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী যে ক্ষোভ ও প্রতিবাদ উঠে এসেছে, তা এই নৃশংসতাকে স্বাভাবিক করার প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে একটি সম্মিলিত নৈতিক অবস্থানকে প্রকাশ করে।

একই দিনে বাংলাদেশেও আমাদের ছাত্ররা পালন করল ‘দ্য ওয়ার্ল্ড স্টপ্‌স’ কর্মসূচী। একটা সময় ছিল যখন শুধু সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররাই জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ আন্দোলন-সংগ্রামে সামিল হত, কিন্তু ২০২৪-এর গণভ্যুত্থানের এই ধারণার অবসান ঘটে। জুলাই অভ্যুত্থানে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররাও সমানভাবে অংশ নেয়। আরেকটা লক্ষ্যণীয় বিষয় হল, আন্দোলনে তুলনামূলকভাবে বেশি সংখ্যায় ছাত্রীদের অংশগ্রহণ। আমাদের মেয়েরা আর শুধু সাজগোজ ব্যস্ত নিয়ে থাকে না। আমাদের মেয়েদের মাথার মধ্যে এখন দেশ-জাতি-পতাকাও থাকে — থাকে আর্তমানবতার প্রতি গভীর ভালোবাসা।

বুয়েটের ছাত্রী হোমায়রা বিনতে নাসির লিখেছে, ‘ফেইসবুক ওয়ালে প্রতিবার ফিড রিফ্রেশ করলেই গাজাবাসীর ভাগ্য নামক নির্মম বাস্তবতার কাছে হেরে যাওয়া দেখে কিছু সময়ের জন্য আমি ক্ষুব্ধ ঠিকই, কিন্তু আমার কথিত এম্প্যাথি একটা ক্রাই রি অ্যাক্ট এর মাঝেই সীমাবদ্ধ । পুরনো ডায়রিতে নিজের কিছু নোট দেখে বর্তমান ‘আমি’ কে খুব নিচ আর হীন মনে হচ্ছে।’

ইনডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশ-এর ছাত্র ইরফান মজুমদার বলছে, ‘মনে রাখতে হবে যে, মুসলমান হওয়ার জন্য ফিলিস্তিনিরা নিপীড়িত হচ্ছে না— তারা নিপীড়িত হচ্ছে কারণ তারা ফিলিস্তিনি। কোনো ধর্ম, মতবাদ, গির্জা, মসজিদ বা মন্দির মানবতার ঊর্ধ্বে নয়। মানবতা সবার উপরে। ফিলিস্তিনের নিরপরাধ মানুষদের জন্য আশীর্বাদ রইল।’

ইনডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশ-এর আরেক ছাত্রী, নোশেন ফাইজা মিছিলের মধ্যে যমুনা টিভির সাথে সাক্ষ্যাৎকারে বলছে, ‘আমরা এখানে এসেছি তীব্র প্রতিবাদ জানাতে। যেটা হচ্ছে, তা অসহনীয় এবং এটা আমরা সহ্য করব না।’ ফেইসবুকে আপলোড করা এই ভিডিওটি অসংখ্য ভিউ হয়েছে। ভিডিওটি নিচে তাঁর সহপাঠী যখন লিখেছে, ‘আই অ্যাম প্রাউড অফ ইউ।’ প্রত্যুত্তরে ফাইজা বলছে, ‘ভাই, প্রাউড হওয়ার কিছু নাই। আমি আনন্দিত যে, আমি আমার ভয়েস রেইজ করতে পেরেছি।’

সত্যিই তো। আজ গাজা যখন মৃত্যুপুরী, শত শত শিশুর কবরের দেশ, অসংখ্য দুধের শিশু পিতামাতাহীন অনাহারে কান্নারত, তখন আমরা কী ক’রে ঘরে থাকি? আশির দশকে কবি হেলাল হাফিজ অশুভ রাষ্ট্রশক্তির বিরুদ্ধে মিছিলে যাওয়ার অপরিহার্যতার কথা বলছিলেন। বলেছিলেন,  

‘এখন যৌবন যার মিছিলে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়,

এখন যৌবন যার যুদ্ধে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়।’

এমন দুঃসময়ে কিছু একটা কিছু না করতে পারলে, সারাটা জীবন অনুশোচনার আগুনে জ্বলতে হবে, তাই কবি আর এক কবিতায় সতর্কবার্তা উচ্চারণ করেছেন এভাবে:

‘মানব জন্মের নামে কলঙ্ক হবে

এরকম দুঃসময়ে আমি যদি মিছিলে না যাই,

উত্তর পুরুষে ভীরু কাপুরুষের উপমা হবো

আমার যৌবন দিয়ে এমন দুর্দিনে আজ

শুধু যদি নারীকে সাজাই।’

ইসরায়েল শিশুদের অনাহারকে যুদ্ধের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে, আর তা সমর্থন করছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। প্রশ্ন হল,  এমন নৃশংস মানুষ কীভাবে হতে পারে, তার কারণটা বোঝা দরকার। দরকার সমাজতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ। সমাজতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ হল, পুঁজির তাড়নাই সীমাহীন নৃশংসতায় রূপ নেয়। মার্কিন পুঁজিপতি অস্ত্রব্যবসায়ীরাই সরকার প্রধানকে বা সরকারকে প্ররোচিত করে যুদ্ধ বাধাতে ও জিয়িয়ে রাখতে, আগ্রাসন চালাতে ও আগ্রাসন চালাতে সহায়তা করতে। কারণ তাঁরাই নিজের ও অন্য দেশের সরকারের কাছে এবং সন্ত্রাসবাদী সংগঠনের কাছে অস্ত্র বিক্রি করে। সেই যুদ্ধ বা আগ্রাসন চালাতে গিয়ে যদি গর্ভবতী নারীকে—এমনকি শিশুকেও হত্যা করতে হয়, তাঁরা পিছ পা হবে না কারণ মুনাফার লোভে তাঁরা উন্মত্ত। গত ৭ই অক্টোবর ইসরায়েলের ওপর হামাসের হামলার প্রতিক্রিয়ার গাজায় ইসরায়েলী সেনাদের নির্বিচার আক্রমণ থেকে রক্ষা পেল না কিছুই— বসত বাটি, হাসপাতাল, নারী—এমনকি দুধের শিশুও। আর বিশ্ববাসী প্রত্যক্ষ করল পুঁজিবাদের নগ্ন চেহারা।

মনে রাখতে হবে, মৌলবাদের গায়ে ভর ক’রে পুঁজিবাদ বেড়ে ওঠে। এই তত্ত্বের উৎকৃষ্ট প্রমাণ ভারতীয় জনতা পার্টি। দলটি মৌলবাদের চূড়ান্ত রূপ উগ্র পুঁজিবাদ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। তারা কৃষকদের জমি কর্পোরেট মালিকদের হাতে তুলে দিতে চায়। সামাণ্য ঋণের টাকা শোধ করতে না পারলে কৃষককে জেলে যেতে হয়, কিন্তু ধনী ব্যবসায়ীদের হাজার কৌটি ঋণ মওকুফ করে দেয় বি.জে.পি সরকার। অতএব, মৌলবাদ দিয়ে বিশ্বের অস্ত্রব্যবসায়ী পুজিবাদী আগ্রাসনকে প্রতিহত করা যাবে না। দেশে দেশে একটি ক’রে সাম্যবাদী দলকে ক্ষমতায় আসতে হবে এবং তাহলেই সমতাভিত্তিক, ন্যায়ভিত্তিক একটি বিশ্বব্যবস্থা গড়ে ওঠবে।

বাংলাদেশে কিছু ধর্মীয় গোষ্ঠী ও কিছু ধর্মবাদী রাজনৈতিক দল গাজার ঘটনাকে মুসলমানদের ওপর নিপীড়ন হিসেবে উপস্থাপন করতে চাইছে, কিন্তু আদতে এটি জাতিগত নিপীড়ন এবং একটি মানবিক সংকট। এর বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার জন্য  মুসলমান হওয়ার দরকার নেই, দরকার একজন মানুষ হওয়ার। জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব মানুষের ব্যাপক প্রতিবাদ ছাড়া এ সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। প্রতিবাদটা হতে হবে পুঁজিবাদী সম্প্রসারণবাদের বিরুদ্ধে।

‘বিস্তির্ণ দুপাড়ে অসংখ্য মানুষের হাহাকার শুনেও নিঃশব্দে নিরবে বয়ে চলেছে’ বলে ভূপেন হাজারিকা গঙ্গাকে দোষারোপ করেছিলেন। ‘নৈতিকতার স্খলন দেখেও, মানবতার পতন দেখেও নির্লজ্জ অলসভাবে গঙ্গা বয়ে চলেছে দেখে গণমানুষের এই শিল্পী বিষ্ময় প্রকাশ করেছেন। তিনি অনুরোধ করছেন ‘সহস্র বরষার উন্মাদনার মন্ত্র দিয়ে লক্ষ জনেরে সবল সংগ্রামী, আর অগ্রগামী ক’রে তুলতে’। শিল্পী যথার্থই ব্যাখ্যা করেন, ‘ব্যক্তিকে ব্যক্তিকেন্দ্রিক হলে হবে না, আবার সমষ্টিকে ব্যক্তিত্বরহিত হলেও চলবে না।’ গাজা ইস্যুতেও আমরা মনে করি, দরকার বিশ্বব্যাপি সমষ্টির জাগরণ। কোন একক ধর্মাবলম্বী মানুষের জাগরণে ফল হবে না।  

গাজার শিশুদের হাহাকার শুনেও কিছু করতে না পারার জন্য কাকে দোষারোপ করব আমরা? কাকে অনুরোধ করব লক্ষ কোটি জনতাকে মানবতার মন্ত্রে উজ্জীবিত করে এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে বিদ্রোহে সামিল হতে? ছাত্রসমাজ পৃথিবীকেই অনুরোধ করছিল ক্ষণিকের জন্য থেমে যেতে, প্রতিবাদী হতে।

হয়তো একদিন স্বাধীন ফিলিস্তিনী ভূখণ্ড হবে, আবার ভোর হবে, নতুন সূর্য উঠবে; কিন্তু দেখতে না দেখতেই পৃথিবীর আলো যাঁদের জন্য দপ ক’রে নিভে গেল— সেই ইয়াজান, হিন্দ রজব, সাবরিন, ওয়েসাম, নাঈম, আলার মতো শিশুরা সেদিন থাকবে না। আর আমরা বেঁচে থাকব অপরাধবোধের তীব্র যন্ত্রণা নিয়ে, এবং অবশেষে একদিন আমাদেরও ‘নদীগুলোকে বুকের রেখেই চলে যেতে হবে’ ঐ শিশুদের পথে অনন্ত যাত্রায়!

————————————————————————————————————————

এন এন তরুণ অর্থনীতির অধ্যাপক, ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ। সাউথ এশিয়া জার্নালের এডিটর অ্যাট লার্জ। nntarun@gmail.com

রাজনৈতিক দলের অনুদান গ্রহণও দুর্নীতি

রবার্ট ক্লিটগার্ড (১৯৮৮) দুর্নীতির সর্বাধিক স্বীকৃত সংজ্ঞাটি প্রদান করেছেন। তাঁর মতে, ‘দুর্নীতি হল ব্যক্তিগত লাভের জন্য রাষ্ট্রীয় পদের অপব্যবহার।’ দুর্নীতির বিভিন্ন রূপের মধ্যে ঘুষ, চাঁদাবাজী, কমিশন, রেন্ট-সিকিং, তহবিল আত্মসাৎ, পৃষ্ঠপোষকতা, স্বজনপ্রীতি, গোষ্ঠীপ্রীতি, পক্ষপাতিত্ব ইত্যাদি অন্তর্ভুক্ত। বিশেষভাবে, রাজনৈতিক অনুদানকেও রেন্ট-সিকিং তথা অন্যায়ভাবে রাষ্ট্রীয় সুবিধা লাভের জন্য ঘুষ প্রদানের চেষ্টা বৈ আর কিছুই নয়।  

ঠিক একই সুরে, খ্যাতনামা বাংলাদেশি অর্থনীতিবিদ, প্রফেসর মুশতাক খান তার বিখ্যাত ‘ডিটারমিন্যান্টস অফ করাপশন…’ বইয়ে যুক্তি দেন যে, লবিং ও রাজনৈতিক অনুদানও রেন্ট-সিকিং আচরণের অংশ।

এই প্রবণতা বিভিন্ন ক্ষেত্রে দেখা যায়। এর মধ্যে নোবেল পুরস্কারের মতো মর্যাদাপূর্ণ সম্মান অর্জনের প্রচেষ্টাও অন্তর্ভুক্ত। এটি সর্বজনবিদিত যে, কিছু ব্যক্তি এই ধরনের সম্মান লাভের সম্ভাবনা বাড়ানোর জন্য লবিস্ট নিয়োগ করেন যাতে তাঁরা বিশাল অর্থ ব্যয় করেন। যখন কোন ব্যক্তি এ ধরনের পন্থা গ্রহণ করেন, তাঁরা শুধু ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করেন না, বরং সামগ্রিকভাবে সমাজে দুর্নীতির বিস্তারেও ভূমিকা রাখেন।

বাংলাদেশে রাজনীতির, ব্যবসার এবং প্রভাব খাটানোর সংস্কৃতি একটি উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। এটা এখন সবারই জানা যে, যাঁরা আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির ও বিপুল আর্থিক সম্পদের অধিকারী, তাঁরা বাইরের শক্তির সাহায্যে প্রচলিত আখ্যান পরিবর্তন করতে, রাজনৈতিক আন্দোলন গঠন করতে এবং এমনকি রাষ্ট্রের উচ্চ পদ কুক্ষিগত করতেও সক্ষম। শক্তিশালী দেশের শক্তিশালী ব্যক্তির বা এজেন্সির সাথে লবিং-ই এখন মনে হচ্ছে ‘সকল ক্ষমতা উৎস।’ আন্তর্জাতিক খ্যাতি গড়া এবং সম্মান অর্জনের জন্য লবিস্ট নিয়োগের এই প্রক্রিয়া দীর্ঘদিন ধরেই অভিজাতদের একটি অস্ত্র, যেখানে পর্দার আড়ালে বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করা হয়।

বাংলাদেশে আমরা এখন দেখতে পাচ্ছি যে, নব্গঠিত রাজনৈতিক দল, যাঁরা দেশের রাজনীতির ধারা পরিবর্তনের কথা বলে আসছে, তাঁরাও স্বৈরশাসনের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকা কর্পোরেট মালিকদের ও ব্যক্তিদের কাছ থেকে অনুদান গ্রহণ করছে। একসময় যারা ফ্যাসিস্ট তথা দমনমূলক শাসনের সাথে যুক্ত ছিলেন, তাঁরা এখন সুবিধামতো তাদের আনুগত্য পরিবর্তন করে নতুন ক্ষমতার কাঠামোর সন্ধান করছেন। যখন এ ধরনের একটি দল নিজেদের গণতন্ত্রের রক্ষক হিসেবে উপস্থাপন করেন, অথচ দুর্নীতিকে টিকিয়ে রাখার জন্য ব্যবহৃত একই পন্থার ওপর নির্ভর করেন, তখন তাদের প্রকৃত উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তোলা জরুরি।

উন্নত দেশগুলো ও তাদের সমণ্বয়ে গঠিত সংস্থা উন্নয়নশীল দেশকে দুর্নীতি বিষয়ে জ্ঞান দিয়ে থাকে, কিন্তু তাদের দেশেই দুর্নীতির প্রধান প্রধান উপসর্গ বিদ্যমান। উদাহরণস্বরূপ, যুক্তরাষ্ট্রে রাজনৈতিক প্রচারণার অর্থায়ন কর্পোরেট অনুদানের সাথে গভীরভাবে যুক্ত, যার ফলে এমন একটি ব্যবস্থা সৃষ্টি হয়েছে যেখানে বড় ব্যবসাগুলো নির্বাচিত কর্মকর্তাদের ওপর বিশাল প্রভাব বিস্তার করে। প্রেসিডেন্ট বা অন্য যে কোনো সরকারি পদপ্রার্থী মূলত বড় কর্পোরেশন, বিলিয়নিয়ার এবং বিশেষ স্বার্থগোষ্ঠীগুলোর আর্থিক অনুদানের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। এসব অনুদান কেবল উদারতার বহিঃপ্রকাশ নয়; বরং এগুলো একটি কৌশলগত বিনিয়োগ, যা রাজনৈতিক সুবিধা নিশ্চিত করার জন্য প্রদান করা হয়। এমনকি নির্বাচনী সময়সীমার বাইরেও কর্পোরেশনগুলো রাজনৈতিক দলগুলোতে অর্থ ঢালতে থাকে, যাতে ক্ষমতায় গেলে রাজনীতিবিদরা জনকল্যাণের চেয়ে কর্পোরেট স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেয়।

কর্পোরেট অনুদানের প্রভাব অনেক মার্কিন প্রেসিডেন্টের নীতিতে স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, বারাক ওবামা, যিনি তার প্রচারণায় ওয়াল স্ট্রিটের ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তিনি গোল্ডম্যান স্যাক্স এবং জেপি মরগান চেজ-এর মতো বৃহৎ ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে উল্লেখযোগ্য আর্থিক সহায়তা পেয়েছিলেন। আর্থিক সংস্কারের বিষয়ে তাঁর বক্তব্য সত্ত্বেও, তাঁর প্রশাসন ২০০৮ সালের আর্থিক সংকটের সময় ওয়াল স্ট্রিটকে বেইলআউট দিয়েছিল, যখন লক্ষ লক্ষ আমেরিকান তাদের বাড়িঘর হারিয়েছিল।

ডোনাল্ড ট্রাম্প, যিনি নিজেকে একজন জনগণের নেতা ও বহিরাগত রাজনীতিক হিসেবে উপস্থাপন করেছিলেন, তিনি জীবাশ্ম জ্বালানি কোম্পানি ও বৃহৎ ওষুধ নির্মাতা সংস্থাগুলিসহ কর্পোরেট দাতাদের কাছ থেকে কোটি কোটি ডলার সংগ্রহ করেছিলেন। এর প্রতিদানে, তার প্রশাসন পরিবেশগত বিধিনিষেধ শিথিল করে এবং এমন কর হ্রাস কার্যকর করে, যা মূলত বড় কর্পোরেশনগুলোরই সবচেয়ে বেশি লাভবান করেছে।

জো বাইডেনের প্রচারণার বড় অংশ অর্থায়ন করেছিল গুগল ও মাইক্রোসফটের মতো প্রযুক্তি জায়ান্টরা, পাশাপাশি ওষুধ ও স্বাস্থ্যসেবা খাতের প্রতিষ্ঠানগুলো। মোটেই আশ্চর্যের কিছু নয় যে, তার প্রশাসন বিগ টেক একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ এবং ওষুধের মূল্য সংস্কারের বিষয়ে কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপে ধীরগতিতে অগ্রসর হয়েছে।

এই প্রবণতা সাম্প্রতিক প্রেসিডেন্টদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। জর্জ ডব্লিউ বুশের প্রেসিডেন্ট থাকা অবস্থায়, হলিবার্টন-এর মতো প্রতিরক্ষা ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অনুদান এসেছিল, যা পরবর্তীতে ইরাক যুদ্ধে লাভজনক সরকারি চুক্তি অর্জন করেছিল। বিল ক্লিনটনের প্রশাসন আর্থিক খাতের দাতাদের কাছ থেকে সুবিধা পেয়েছিল, যার ফলে গ্লাস-স্টিগল অ্যাক্ট বাতিলের পথ প্রশস্ত হয়েছিল—এটি ব্যাংকিং খাতের নিয়ন্ত্রণ শিথিল করেছিল এবং ২০০৮ সালের অর্থনৈতিক বিপর্যয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। এমনকি রোনাল্ড রেগান, যিনি মুক্ত বাজার নীতির জন্য প্রশংসিত হন, তিনিও বড় কর্পোরেট স্বার্থের দ্বারা সমর্থিত ছিলেন, যা তাঁর বৈষম্যমূলক কর হ্রাস ও শ্রমিক ইউনিয়ন দমন নীতির মাধ্যমে ব্যাপকভাবে লাভবান হয়েছিল।

এই কর্পোরেট প্রভাবের চক্র গণতন্ত্রকে বিকৃত করে, যেখানে নির্বাচিত কর্মকর্তারা জনগণের প্রতিনিধির পরিবর্তে কার্যত কর্পোরেট আমেরিকার স্বার্থ রক্ষকের ভূমিকায় পরিণত হন। যখন কর্পোরেশনগুলো রাজনৈতিক প্রচারণার জন্য অর্থায়ন করে, তারা এর বিনিময়ে প্রতিদান আশা করে—হোক তা অনুকূল আইনপ্রণয়ন, কর ছাড়, কিংবা নিয়ন্ত্রণ শিথিলকরণের মাধ্যমে। এটি মূলত আইনি দুর্নীতি, যা গণতন্ত্রের মৌলিক নীতিগুলোকে দুর্বল করে দেয়।

সত্যিকারের রাজনৈতিক সংস্কারের জন্য এই চক্র ভাঙা জরুরি, যা কঠোর প্রচারণা অর্থায়ন আইন প্রয়োগ, কর্পোরেট অনুদান নিষিদ্ধকরণ এবং সরকারি অর্থায়নে পরিচালিত নির্বাচন প্রচারের মাধ্যমে সম্ভব। এ ধরনের পদক্ষেপ ছাড়া, মার্কিন রাজনৈতিক ব্যবস্থা ধনী অভিজাতদের খেলার মাঠ হিসেবেই রয়ে যাবে, যেখানে আইন জনগণের জন্য নয়, বরং তাদের জন্য তৈরি হয় যারা প্রভাব কিনতে সক্ষম।

বাংলাদেশে অর্থনীতির ও রাজনীতির বিষাক্ত মিশ্রণ বছরের পর বছর ধরে আরও গভীর হয়েছে। ফলে এমন একটি ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে যেখানে কর্পোরেট স্বার্থ রাজনৈতিক সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে। দশকের পর দশক ধরে, বেক্সিমকো গ্রুপ, বসুন্ধরা গ্রুপ এবং এস. আলম গ্রুপ-এর মতো শক্তিশালী ব্যবসায়িক সাম্রাজ্য দেশের শাসন ব্যবস্থার ওপর প্রভাব বিস্তার করেছে। তারা শাসকগোষ্ঠীর সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলে, নিজেদের জন্য সুবিধাজনক নীতি, লাভজনক চুক্তি এবং লাগামহীন অর্থনৈতিক আধিপত্য নিশ্চিত করেছে। শেখ হাসিনার স্বৈরাচারী শাসনামলে, এই ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলো আরও সমৃদ্ধ হয়েছে, সরকারকে জবাবদিহিতার বাইরে রাখতে সহায়তা করেছে এবং বিপুল আর্থিক সুবিধা ভোগ করেছে।

অনেকে আশা করেছিলেন যে ২০২৪ সালের কথিত ‘জুলাই অভ্যুত্থান’ বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে একটি পরিবর্তন আনবে। কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনাবলি সেই আশাকে নস্যাৎ করে দিচ্ছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, বসুন্ধরা গ্রুপ—যা দীর্ঘদিন ধরে হাসিনা প্রশাসনের ঘনিষ্ঠ পৃষ্ঠপোষক ছিল—এখন নতুন গঠিত ন্যাশনাল সিটিজেনস পার্টি (NCP)-কে আর্থিক সহায়তা দিয়েছে। এই তথ্য অবাক করার মতো এবং একইসঙ্গে গভীরভাবে উদ্বেগজনক। যদি স্বৈরাচারী শাসনের অতীত আর্থিক পৃষ্ঠপোষকরা নতুন রাজনৈতিক শক্তিগুলোকে অর্থায়ন করা অব্যাহত রাখে, তাহলে বাংলাদেশের জনগণ আদতে কী ধরনের পরিবর্তনের প্রত্যাশা করতে পারে?

এই পরিস্থিতি একটি অস্বস্তিকর সত্যকে উন্মোচিত করে এবং তা হল, বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির মৌলিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে। পৃষ্ঠপোষকতার যে চক্রটি কর্পোরেট অভিজাতদের কৌশলগত অনুদানের মাধ্যমে গণতন্ত্রকে নিয়ন্ত্রণের সুযোগ দেয়, তা কোনো বাধা ছাড়াই অব্যাহত রয়েছে। রাজনৈতিক অনুদান এখন আর সদিচ্ছা বা গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণের মাধ্যম নয়; বরং এটি প্রভাব কেনাবেচার হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে, যা ক্ষমতাকে কিছু নির্দিষ্ট প্রভাবশালী গোষ্ঠীর হাতেই সীমাবদ্ধ রাখে।

বাংলাদেশের সাধারণ জনগণের জন্য, এটি এক অন্ধকার ভবিষ্যতের ইঙ্গিত দেয়—যেখানে আশার কোনো আলো নেই। রাজনীতির আনুগত্য পরিবর্তনের এই চক্র কেবল একদল অভিজাতদের পরিবর্তে আরেকদল অভিজাতদের ক্ষমতায় বসানোর কাজ করছে, ফলে জনগণ বঞ্চিত, হতাশ এবং একটি এমন ব্যবস্থার মধ্যে বন্দী রয়ে গেছে, যা জনস্বার্থের পরিবর্তে সুবিধাভোগী শ্রেণির সেবা করে।

বাংলাদেশের রাজনীতি যদি কখনো আর্থিক স্বার্থান্বেষণের কবল থেকে মুক্ত হতে চায়, তবে রাজনৈতিক অর্থায়নের স্বচ্ছতা, লবিংয়ের নৈতিকতা এবং পরিবর্তনের দাবিদারদের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে গভীর আলোচনা হওয়া প্রয়োজন। এই বিষয়গুলো পর্যবেক্ষণের বাইরে থাকলে, ক্ষমতা, সুবিধাভোগিতা এবং দুর্নীতির চক্র অব্যাহত থাকবে, যা সমাজের জন্য দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিকর হয়ে উঠবে।

যদি রাজনৈতিক অর্থায়নে স্বচ্ছতার জন্য কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া না হয়, তবে গভীরতর সংস্কারের প্রতিশ্রুতি শুধুই একটি মরিচিকা হয়ে থাকবে। কর্পোরেট অনুদানের লাগাম টানতে এবং অর্থনৈতিক অভিজাতদের শাসন ব্যবস্থার ওপর কর্তৃত্ব কমাতে কার্যকর বিধিনিষেধ ছাড়া, বাংলাদেশ গণতন্ত্রের মুখোশ পরা একটি ধনিকতন্ত্রে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে থেকে যাবে।

কান্টের শান্তির দর্শন: একটি বৈশ্বিক সম্প্রীতির রূপরেখা

বাংলাদেশ বর্তমানে এক সংকটময় কাল অতিক্রম করছে, যেখানে একদিকে গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারের প্রচেষ্টা চলছে, অন্যদিকে দেশের সবচেয়ে বড় প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক ক্রমশ অবনতির দিকে যাচ্ছে। সম্পর্ক এতটাই অবনতি ঘটেছে যে, বাংলাদেশে কিছু মহল যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।

সংস্কার কার্যক্রমের অংশ হিসেবে, বর্তমান সরকার নতুন একটি সংবিধান প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে, যা প্রধানমন্ত্রী, রাষ্ট্রপতি, সংসদ, নির্বাহী এবং বিচার বিভাগের মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য নিশ্চিত করতে এবং আইনসভার সামগ্রিক কাঠামো নির্ধারণ করতে সহায়তা করবে। একই সময়ে, বিশ্ব বর্তমানে গাজায় এবং ইউক্রেনে দুটি বড় সংঘাত প্রত্যক্ষ করছে, যা কোন না কোনভাবে বিশ্বব্যাপী মানুষের ওপর প্রভাব ফেলছে।

এই প্রেক্ষাপটে, হঠাৎ করেই ইমানুয়েল কান্টের শান্তির দর্শনের কথা মনে পড়ল এবং তৃতীয়বারের মতো তাঁর গুরুত্বপূর্ণ রচনা, ‘Perpetual Peace: A Philosophical Sketch (1795)’ পড়তে শুরু করলাম। Perpetual Peace: A Philosophical Sketch (1795) রাজনৈতিক দর্শনের ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ, যা বিভিন্ন দেশের মধ্যে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য একটি কাঠামো প্রদান করে। এই বইয়ে কান্ট যুদ্ধ এড়ানোর ও বৈশ্বিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবহারিক ও নৈতিক নির্দেশনা উপস্থাপন করেছেন। পশ্চিমা আধুনিক দর্শনের প্রভাবশালী দার্শনিক কান্ট ১৭২৪ সালে জন্মগ্রহণ করেন এবং একাধিক যুদ্ধ প্রত্যক্ষ করেছেন। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, ভবিষ্যতেও যুদ্ধ অনিবার্য। এমন আশঙ্কাই সম্ভবত তাঁকে যুদ্ধ সম্পর্কিত তত্ত্ব এবং তা প্রতিরোধের জন্য বাস্তবসম্মত ব্যবস্থা প্রস্তাব করতে উদ্বুদ্ধ করেছিল।

বইটিতে, কান্ট এমন সব ধারণা উপস্থাপন করেছেন যা পরবর্তীতে গণতান্ত্রিক শান্তির, বাণিজ্যিক শান্তির এবং প্রাতিষ্ঠানিক শান্তির সাথে যুক্ত হয়েছে। তাঁর বইটি আধুনিক গণতান্ত্রিক শান্তিতত্ত্বের সাথে মিল খুঁজে বের করে, কারণ তিনি প্রজাতন্ত্রী রাষ্ট্রগুলি নিয়ে আলোচনা করেন, যাকে তিনি আইনসভা এবং নির্বাহী বিভাগের মধ্যে ক্ষমতার বিভাজনসহ প্রতিনিধিত্বমূলক সরকার হিসাবে সংজ্ঞায়িত করেন। কান্ট যুক্তি দেন, প্রজাতন্ত্রগুলি স্বাভাবিকভাবেই একে অপরের সাথে শান্তিতে থাকবে, কারণ অন্যান্য ধরণের সরকারের তুলনায় তাদের শান্তিবাদের প্রতি বেশি ঝোঁক থাকে। তবে, কান্ট এ-ও বলেন যে, কেবল প্রজাতন্ত্রী সরকারই স্থায়ী শান্তি নিশ্চিত করতে পারে না। সার্বজনীন উদারতার ও বন্ধুত্বের নীতিতে গঠিত মুক্ত রাষ্ট্রের ফেডারেশন চিরস্থায়ী শান্তিতে পৌঁছাতে পারে, কিন্তু তার জন্য কিছু শর্ত পুরণ করতে হবে। এই সব শর্তেরই একটি রূপরেখা প্রফেসর কান্ট দিয়েছেন তাঁর ‘পাপেচুয়াল পিস’ তথা ‘চিরস্থায়ী শান্তি’ শীর্ষক বইয়ে, যা দর্শনশাস্ত্রে  ছয়-দফা কর্মসূচি হিসেবে খ্যাত।

এই ছয়টি নীতি নিম্নরূপ:

১) গোপন চুক্তি নয়: কান্ট জাতিগুলোর মধ্যে প্রতারণা এবং অবিশ্বাস রোধে আন্তর্জাতিক চুক্তিতে স্বচ্ছতার প্রয়োজনীয়তার উপর জোর দেন।

২) স্থায়ী সেনাবাহিনী নয়: তিনি স্থায়ী সামরিক বাহিনী বিলুপ্তির পক্ষে যুক্তি দেন; বলেন,  তাদের সেনাবাহিনীর অস্তিত্ব, শান্তির জন্য একটি স্থায়ী হুমকি সৃষ্টি করে এবং সংঘাতের সম্ভাবনাকে উসকে দেয়।

৩) সামরিক উদ্দেশ্যে জাতীয় ঋণ নয়: যুদ্ধের অর্থায়নের জন্য জাতিগুলোর ঋণ নেওয়া এড়িয়ে চলা উচিত, কারণ এটি অর্থনৈতিক শোষণ এবং দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতকে উৎসাহিত করে।

৪) অন্যান্য রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ নয়: জাতীয় সার্বভৌমত্বকে সম্মান করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ; শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলোকে অন্যদের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করা থেকে বিরত থাকতে হবে।

৫) ভবিষ্যতের আস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে এমন কোনও শত্রুতামূলক কাজ নয়: জাতিগুলোকে এমন কর্মকাণ্ড এড়িয়ে চলতে হবে, যা আস্থা নষ্ট করে এবং ভবিষ্যতের শান্তি আলোচনাকে বাধাগ্রস্ত করে।

৬) জোরপূর্বক সংযুক্তি নয়: বলপ্রয়োগের মাধ্যমে আঞ্চলিক সম্প্রসারণ অন্যায্য এবং আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার জন্য এটি নিষিদ্ধ করা উচিত।

ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের প্রেক্ষাপটে এই নীতিগুলি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। উদাহরণস্বরূপ, দুই দেশের মধ্যে কিছু চুক্তি গোপনীয়তার সাথে সম্পাদিত হয়েছিল, যার ফলে জনসাধারণের মধ্যে ব্যাপক অবিশ্বাস তৈরি হয়েছিল। স্বচ্ছতার এই অভাব ভারত ও বাংলাদেশ— উভয় সরকারের বিরুদ্ধেই ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। হাসিনা সরকার অপ্রয়োজনীয় মিগ-২৯ যুদ্ধবিমান এবং অন্যান্য সামরিক অস্ত্র কেনার জন্য প্রচুর বিদেশী ঋণ নিয়েছে। বাংলাদেশের এই অবস্থা সরাসরি কান্টের তৃতীয় নীতির সাথে মিলে যায়।

কান্টের চতুর্থ নীতি অর্থাৎ অন্যান্য রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা— আজ বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। ভারত, চীন এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো শক্তিশালী দেশের বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে জড়িত থাকার ফলে দেশের জন্য উল্লেখযোগ্য রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। একইভাবে, কান্টের ষষ্ঠ নীতি, যা জোরপূর্বক দখলের নিন্দা করে, সমসাময়িক ভূ-রাজনৈতিক সংঘাতে উদ্বেগজনক অনুরণন খুঁজে পায়। ইউক্রেনে রাশিয়া্র এবং গাজায় ইসরায়েলের আগ্রাসন প্রমাণ করে, সার্বভৌমত্বের লঙ্ঘন কীভাবে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে পরিণত হতে পারে, ইমানুয়েল কান্ট বহু আগেই তা ভবিষ্যৎ বাণী করে গেছেন। শক্তিশালী রাষ্ট্রের অন্য রাষ্ট্রে হস্তক্ষেপের এবং  আগ্রাসনের পরিণতি সম্পর্কে কান্টের দূরদর্শিতা কল্পণাকেও হার মানায়।

কান্টের শান্তির দর্শন আজকের জটিল ও আন্তঃসংযুক্ত বিশ্বেও অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। কান্ট মানবিক যুক্তিবাদ, স্বায়ত্তশাসন এবং আইনের শাসনের ওপর গুরুত্ব প্রদান ক’রে সমসাময়িক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় এক কালজয়ী কাঠামো মির্মাণ ক’রে গেছেন।  আন্তর্জাতিক সংঘাত নিরসরণে, মানবাধিকার লঙ্ঘন রোধে একটি বিশ্বব্যবস্থা তৈরিতে কান্টের তত্ত্ব প্রয়োগ করা জরুরি। আধুনিক ভূরাজনীতির জটিলতা অতিক্রম করার সময়, কান্টের শান্তিময় বিশ্বব্যবস্থার দৃষ্টিভঙ্গি এখনও একটি ন্যায়সঙ্গত ও সুসামঞ্জস্যপূর্ণ বৈশ্বিক সম্প্রদায় গঠনের প্রচেষ্টাকে অনুপ্রাণিত করে।

ইমানুয়েল কান্টের শান্তির দর্শন জাতিসমূহের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী সম্প্রীতি অর্জনের জন্য একটি গভীর ও স্থায়ী রূপরেখা প্রদান করে। রাজনৈতিক, আইনী এবং নৈতিক উপপাদ্যগুলোকে একত্রিত করে, কান্ট যুক্তিবাদ, স্বায়ত্তশাসন এবং আইনের শাসনের ভিত্তিতে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য একটি বিস্তৃত দিকনির্দেশনা প্রদান করেন। আমরা যখন তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি বাস্তবায়নের প্রচেষ্টা চালাই, তখন মানবজাতির জন্য শান্তি ও ন্যায়বিচার অনুসরণের নৈতিক কর্তব্য আমাদের স্মরণে আসে।

দর্শনশাস্ত্রের প্রভাব মূলত মানুষের মনোজগতেই ক্রিয়াশীল, কিন্তু কান্টের ‘শান্তির দর্শন’-এর প্রভাব বাস্তব জগতেও ব্যাপক এবং একটি শান্তিপূর্ণ পৃথিবী নির্মাণে চিরকালই প্রাসঙ্গিক থাকবে। কান্টের ধারণাগুলো জাতিসংঘের মতো আধুনিক আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর এবং আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকারের মতো ধারণার বৌদ্ধিক ভিত্তি স্থাপন করেছে। স্বাধীন রাষ্ট্রসমূহের একটি ফেডারেশন গঠনের জন্য তাঁর আহ্বান কূটনীতি ও আইনি কাঠামোর মাধ্যমে সংঘাত প্রতিরোধের লক্ষ্যে বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সৃষ্টিতে প্রভাব ফেলেছে।

কান্টের শান্তির দর্শনের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে একটি গভীর নৈতিক বাধ্যবাধকতা। তিনি যুক্তি দেন, শান্তি কেবল একটি বাস্তবসম্মত প্রয়োজনীয়তা নয় বরং একটি নৈতিক কর্তব্য যা প্রত্যেক মানবিকবাদী মানুষের অনুসরণ করা উচিত। শান্তির সন্ধান মানবতার সর্বোচ্চ নৈতিক আদর্শের একটি প্রকাশ, যা ন্যায়বিচার, স্বায়ত্তশাসনের প্রতি শ্রদ্ধা এবং সাধারণ কল্যাণের প্রতি আমাদের প্রতিশ্রুতি প্রতিফলিত করে। কান্টের মতে, চিরস্থায়ী শান্তি অর্জন হল মানব অগ্রগতির চূড়ান্ত লক্ষ্য এবং আমাদের নৈতিক সম্ভাবনার পরিপূর্ণতা।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ঠান্ডা যুদ্ধের সময়ে যখন পারমানবিক যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা দেখা দেয়, তখন বার্ট্রান্ড  রাসেলের  ও  আইনস্টাইনের নেতৃত্বে জিবিত সব নোবেল লরিয়েটসহ অজস্র মানুষ যুদ্ধের বিরুদ্ধে বিশ্ব জনমত গঠনে প্রয়াসী হয়। আর বিংশ শতাব্দীর সাড়া জাগানো অর্থনীতিবিদ জে. এম. কেইন্স ভারসাই চুক্তিতে জার্মানীকে মাত্রারিক্ত শাস্তি দেওয়ার প্রতিবাদ জানিয়ে ইংল্যান্ডের প্রতিনিধি দলের প্রধান আলোচকের পদ থেকে পদত্যাগ করেন এবং ‘দি ইকোনোমিক কনসিকুয়েন্সেজ অফ পিস’ লেখেন । উভয় ক্ষেত্রেই মূল সুর ছিল কান্টের শান্তিবাদের ধারণা।

————————————————————————–

এন এন তরুণ অর্থনীতির অধ্যাপক, ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশ। সাউথ এশিয়া জার্নালের এডিটর অ্যাট লার্জ। nntarun@iub.edu.bd

Can Anti-Discrimination Student Movement Free Bangladesh From The Family Dynasty?

Plato, the proponent of the concept of state, is the right person to impart us the aim of politics. When he, in his magnum opus, ‘The Republic’, portrays his ideal state as one that ensures justice, harmony and the well-being of its citizens, we can extract that the aim of politics is to increase the wellbeing of people.

In fact, Plato’s concept of ideal state is still in line with contemporary ideas. A philosopher-king, in his ideal state theory, is one who must be an enlightened ruler with a deep understanding of the state affairs and the ability to discern absolute truth and justice. 

In the modern times, however, one may express her caveats about the use of the words, ‘king’ and ‘ruler’. Whatever be the words, the inner meaning remains the same and what stands out from Plato’s concept of ideal state is, wellbeing of the people should be the ultimate goal of politics, but when politics is dominated by family dynasties or if the state suffers from crony capitalism, wellbeing of the people is seen to be diminishing. 

The historical events that have given rise to this modern world are the Industrial Revolution, Magna Carta, Glorious Revolution of England, French Revolution, Bill of Rights enacted in the USA and Russian Revolution. The gist of all these events is the empowerment of people and in some cases transition from monarchy (centralized power to one family) to democracy (the government of the people, by the people, for the people). Why did this transition take place? The answer is to uphold people’s interest— to maximize people’s wellbeing. It means that when power is captured by one family, people’s wellbeing is never maximized. And that’s the reason why people revolted against monarchy so that opportunities that the state could provide, become open to all irrespective of caste and creed— so that people might enjoy the freedom of choice, freedom of enterprise, and thus maximize their wellbeing. 

In the states where all these revolutions took place, people’s wellbeing increased significantly after the transitions. The reason behind it is explained in Amartya Sen’s capability approach to development, which says, the development of capacities of individuals is the key to the overall human development. ‘Enhancement of Capacities’ means utilizing the potentials that already exist in humans. If individuals’ capacities were enhanced, they would be able to do anything. With a view to enhancing individuals’ capacities, the state must play a very important role by making all the necessary arrangements such as alleviating poverty, schooling etc. But in the states where the power is concentrated to one family or where crony capitalism exists, individuals’ capacities cannot be enhanced, that is, human potentials remain unutilized. 

A very important thing in this context is that human beings don’t enjoy receiving alms from others, be it, from individuals or from the state. They wish to stand on their own feet, exert their own effort, build their own enterprise and then earn their bread all by themselves. They don’t enjoy being the objects of pity from ‘Royal Families’. This important phenomenon of human nature calls for the necessity of ‘enhancement of capacities’ construed in Sen’s capability approach.

The existence of a family dynasty is dependent solely on a psychological ‘disease’ called ‘person worship’ or personality cult mostly visible in developing countries where uneducated people consider the family members or descendants of their ‘hero’ superior to themselves. Once the people start ‘worshipping’ a certain individual, they continue to ‘worship’ his or her descendants over generations. 

The families of Sheikh Mujibur Rahman and General Ziaur Rahman are two such dynasties in Bangladesh. As has already been mentioned that the level of wellbeing in a state contaminated by family dynasties is seen to be lower, but moral issues are even more crucial. That is to say that every individual, be it someone from a peasant family or someone from a rich family should be able to go to the top of the ladder in the state. Family dynasty is an absolute barrier in the path of every individual to such a rise. This means, the family dynasty creates a discriminatory, unfair and unjust society. Since the recent movement in Bangladesh which overthrew the Sheikh Hasina regime is called Anti-Discrimination Student Movement, we would expect our students with modern values ​​of modern times to adopt the agenda of abolition of the family dynasty.  

In India, Jawaharlal Nehru, due to his long tenure as the Congress Party president, became an object of personal adulation among the Indian populace. Mahatma Gandhi, the undisputed leader of India’s independence movement, benefitted even more from such personal veneration. Although Nehru never nominated his daughter Indira for leadership, she became the Congress chief and later the Prime Minister following Lal Bahadur Shastri. Most Congress Party supporters preferred a member of the Nehru family to lead them, even if that individual was less competent. For instance, when Indira took over as Prime Minister, there were leaders in Congress, such as Jagjivan Ram, who were far more qualified than Indira Gandhi.

After Indira Gandhi’s death, Congress had many talented leaders, including Pranab Mukherjee and Narasimha Rao, but it was Indira’s son, Rajiv Gandhi, who became the Congress president and then the country’s Prime Minister. Later, at one stage, the positions of party president and general secretary were held by the mother-son duo of Sonia Gandhi and Rahul Gandhi. This could be considered the epitome of dynastic politics, and any Congress member with modern values might feel ashamed of this.

The situation in Bangladesh is not as dire. Here, at least the position of general secretary in both major parties is “graciously” given to someone outside the “royal family.” However, we must break free from the grip of dynastic politics. Students with modern values and progressive mindsets can help us achieve this goal.

Anti-discrimination student movement is a blessing for Bangladesh, which has helped us with a tremendous transition. Now the students can help us with the formation of a new political party and free us from the burden of the family dynasty. Those who have already completed their studies, may be the members of this new political party and others may be waiting. They may also invite others to join their team who have passed the test of time in terms of knowledge, integrity and patriotism. If they really do try to do this, I would issue two warnings. First, I would ask them to consider Plato’s idea regarding the formation of ​​a new political party and then build a new state. Plato advocated a meritocratic society in which individuals are assigned roles and responsibilities based on their own abilities rather than their inherited or acquired status. Education plays a leading role in shaping the citizens of an ideal state. The education system focused on rigorous, philosophical training, mathematics, ethics and physical fitness, aimed at nurturing the intellect and moral character of the people.

Secondly, I would insist that the principle of equality be the core spirit of the proposed political party. We must remember that human emancipation is not possible without social ownership of wealth, for which we must cultivate the spirit of collective life in the society. We must develop an education system that teaches the spirit of collective life.

Once there were revolutions to break the stronghold of monarchy in many countries. Today the modern world needs another revolution to demolish family dynasties. Let that revolution start from Bangladesh.

FacebookTwitterEmailFlipboardMastodonLinkedInShare

Can we uplift Bangladesh to a modern state?

The French Revolution aimed to equip France with some key attributes necessary for becoming a modern state. Ultimately, a modern state can be defined by its possession of these essential characteristics. The first characteristic is that the state must be governed by man-made laws— not by laws made by kings or by revelation. The theory of classical mechanics says that everything in the universe changes over time. Therefore, no law can last forever. New laws must be made in new times. Accepting change is modernity.

The worldview that Europe’s Enlightenment Movement in the seventeenth and eighteenth centuries built throughout the West was based on the reliance on reason over faith, the primacy of matter over ideas, emphasis on worldliness rather than the after world. For example, Karl Marx, a disciple of the idealist philosopher Hegel, abandoned his master and took refuge in the materialist philosopher Feuerbach.

The Enlightenment Movement was the foundation of the French Revolution. Therefore, looking at terminology of the Enlightenment Movement will give an idea of ​​the modern state. The main themes of the Enlightenment Movement included the celebration of the glory of reason and the application of reason; freedom from beliefs and Prejudices; to awaken the power by which man can know this universe and improve the condition of human society; knowledge, liberation and happiness are the goals of rational humanity etc. Let me explain the term ‘rational humanity’. Suppose ‘revelation’ says, lower castes cannot be allowed to enter the temple. Then someone who believes in Charbak philosophy might say, ‘No. It can’t be the case. God cannot discriminate like that. Therefore, this revelation is not the word of God. It is merely a manipulation of self-interested Brahmins.’

When a drought of knowledge-science-philosophy is going on in the society of Bangladesh, notice the preparation phase of the people before the French Revolution. A group of avant-garde thinkers and writers began writing extensively in eighteenth-century France, including Voltaire and Rousseau. These were philosophical thoughts about the state, politics, society, universe, man, God etc. This philosophy emphasized the use of human reason. And there was criticism of established religious and prevailing political practices. The people of France read their philosophy widely, adopted it, and prepared for an all-out revolution to bring about drastic changes.

The roots of the French Revolution lie deep in the European Renaissance of the fourteenth to seventeenth centuries. And the Renaissance is the European cultural, artistic, political and economic rebirth. The Renaissance was a rediscovery of classical philosophy, literature, and art. After the fall of the Roman Empire in 476 A.D. to the thirteenth century, this rediscovery is that man is at the center of this universe— at the center of all human action. The achievements in all fields of science, art, literature, etc. are for the people— for the improvement of their quality of life on this earth.

The invention of science and technology led to the Industrial Revolution in England. The Industrial Revolution then spread to other European countries and the United States. As a result, urbanization and unprecedented development of transportation systems took place. The standard of living of the workers leaped. This was followed by the passage of the Bill of Rights (1689) regarding civil rights and liberties, the authority of Parliament over the King, the separation of religion and state, and the Glorious Revolution (1688–1689). Inspired by the English Bill of Rights, the United States also passed the Bill of Rights in 1789, which guarantees human rights and individual freedoms, such as freedom of speech, press, assembly and exercise of religion; due process of law and the right to bear arms; And powers not delegated to the federal government shall be reserved to the states and the people.

The French Revolution was completed in 1792 with the abolition of the monarchy and the establishment of the Republic. With this, a bicameral legislature was established and the role of religion in any state affairs was eliminated. Three ideals of the French Revolution were established: Liberty, equality, fraternity. A new era began in the whole world. The French Revolution inspired many people in many countries, who fought for freedom and changed the destiny of people.

There is a fundamental difference between the revolutions discussed so far and   the Russian Revolution. These revolutions did not ensure equality among people. These historical events achieved the right to vote, the right to express opinion, the right to live according to one’s own way etc., but didn’t ensure equality among people— didn’t ensure the fair dues of the working people. It is only the Russian Revolution which guaranteed working people’s right to food. In fact, there is no emancipation of man without the emancipation of the backward section of people: women and workers. This liberation is impossible without the implementation of communist ideals. Because only in a state built on communist ideals the working people exist at the center of power.

The Soviet Union built through the Russian Revolution is such an example of the emancipation of workers and women. Apart from the Soviet Union’s phenomenal progress in science and its emergence as a superpower, its incredible progress in literacy and women’s empowerment, two fundamental elements of development, is simply a wonder of human civilization.

After the establishment of the Bolshevik government in 1917, the urban and rural literacy rates rose to 94 and 86 respectively by 1939, which rose to 99 and 98 by 1959, while, according to the 1897 census report, Russia had a nominal literacy rate of under 21 percent. At the same time, the Soviet Union was fully able to bring equality between men and women in all areas. Historian Ben Eckloff commented, ‘What Britain, France and Germany took at least 100 years to do, the Soviet Union did in just 22 years.’

Women’s freedom in the capitalist world is, in my opinion, only a rhetorical slogan. Those who associate with it love thinking of themselves as progressives and sink into a sort of delusion. A capitalist cannot practice women’s freedom because women’s freedom cannot be practiced separately without the practice of equality in all spheres of life. Women can be equal to men in decision-making, economic capacity and political power in the state, society and family only in a state founded on communist ideals. Therefore, if one wants to practice women’s freedom, he must work for the establishment of a communist state.

Doing the same work, women get paid less than men, blacks get paid less than whites in the US, the highest form of capitalism. Death rates are higher for blacks than whites, and for women more than men, because blacks and women suffer from caloric deprivation for years, resulting in weakened immune systems. In capitalist countries, cases of sexual harassment and rape of women by colleagues or superiors, teachers in various institutions including Hollywood, Oxford University are constantly happening. It proves that one of the ideals of the French Revolution, ‘equality’, is still an empty bully.

If our students want to build a modern state, they must read the history of the French Revolution and build Bangladesh on the ideals of the French Revolution. And if they want to materialize the anti-discrimination movement, they must go beyond the French Revolution and move farther eastward, to the Russian Revolution.