বিএনপি থেকে যে শিক্ষা নিতে পারে আওয়ামী লীগ

শেখ হাসিনার পতনের সঙ্গে সঙ্গে তাঁর দলের প্রায় সব নেতা-কর্মী কেন অদৃশ্য হয়ে গেলেন? এ প্রশ্নের উত্তরের মধ্যেই আন্দাজ পাওয়া যাবে দলটির দেউলিয়াত্বের মাত্রা। শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগের প্রত্যেক সদস্য ও সমর্থক গোষ্ঠী—শিল্পী, সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবী—কতটা অর্বাচীন হলে ধরে নিতে পারেন, তাঁদের এ ক্ষমতা অনন্তকাল স্থায়ী হবে। আর যদি তা ধরে না নিয়ে থাকেন, তাহলে তাঁরা কীভাবে দুর্নীতিতে নিমজ্জিত থাকতে পারেন?

বলা বাহুল্য, তাঁরা দুর্নীতি করেছেন বলেই অদৃশ্য হয়ে গেছেন। একটি বক্তৃতা রাখা তো দূরের কথা, প্রকাশ্যেই আসতে সাহস করছেন না তাঁরা। কারণ, প্রকাশ্য বক্তৃতা-বিবৃতি দিলেই দুর্নীতির অভিযোগে মামলা হবে এবং তাঁরা গ্রেপ্তার হবেন।

কতটা দেউলিয়া হলে দলের তৃতীয় সারির একজন নেতাও নিজেকে দুর্নীতিমুক্ত ঘোষণা দিয়ে রাজনীতির মাঠে দাঁড়িয়ে দলকে সংগঠিত করতে পারেন না। কর্মীদের অভয় দিয়ে ধীরে ধীরে দলটিকে গোছাতে শুরু করতে পারেন—এমন একজন নেতা বা আওয়ামী বুদ্ধিজীবী নেই। আওয়ামী লীগের দেউলিয়াত্বের আরেকটি দিক হলো নেতা ও বুদ্ধিজীবীদের অন্তঃসারশূন্যতা।

একাত্তরে গণহত্যার দোসর জামায়াত ও তাদের ছাত্রসংগঠন ছাত্রশিবির এ দেশে রাজনীতি করতে পারবে আর আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগ পারবে না, যারা দেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের ও মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব দিয়েছে? এ রকম যুক্তিপূর্ণ ভাষায় কথা বলে জনগণের দৃষ্টি আকর্ষণ করে তাঁদের পক্ষে জনমত গঠন করার মতো বুদ্ধিমান ও সৎ কোনো লোক আওয়ামী লীগে একটিও নেই এখন।

এরশাদের পতনের পর যখন জাতীয় পার্টির অধিকাংশ নেতা জেলে, তখন মিজান চৌধুরী দলের নেতৃত্ব দিয়ে, নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে সংসদে ৩৫টি আসন পেতে সক্ষম হয়েছিলেন। ১৫ বছর আওয়ামী লীগ সরকার বিএনপিকে অফিসে বসতে দেয়নি, মাঠে দাঁড়াতে দেয়নি এবং নেতা-কর্মীদের মামলা দিয়ে ব্যাপক ধরপাকড়, জেল-জুলুম করেছে। তা সত্ত্বেও বিএনপির মুখপাত্র রুহুল কবির রিজভী দলের কার্যালয়ে থেকে প্রতিদিন বক্তৃতা-বিবৃতি-সমালোচনা চালিয়ে গেছেন। কিন্তু আজ আওয়ামী লীগের কেউ কোথাও নেই। তাদের লন্ডভন্ড দলীয় কার্যালয় এখন ছিন্নমূল মানুষের আস্তানায় পরিণত হয়েছে।

স্বৈরাচারী হাসিনা সরকারের সবচেয়ে সুবিধাভোগী তাঁর আত্মীয়ের মধ্যে প্রায় ৪০ জন সংসদ সদস্য ছিলেন। তাঁদের অহমিকা, নৃশংসতা ও দুর্নীতির মাত্রা রূপকথাকেও হার মানায়। শেখ হাসিনা ফুফাতো ভাইয়ের ছেলেকে সংসদ সদস্যের চেয়েও বেশি টাকা মারার সুযোগ দেওয়ার জন্য ঢাকা উত্তরের মেয়র করেছেন। সেই লোক পতন আঁচ করতে পেরে দুই দিন আগেই সিঙ্গাপুর হয়ে অন্য কোনো দেশে পাড়ি জমিয়েছেন। হাসিনার আত্মীয়রা প্রায় সবাই নিরাপদে দেশ ছাড়তে পেরেছেন। এর মানে হলো, সব ধরনের আগাম প্রস্তুতি তাঁদের ছিল।

শেখ হাসিনা যখন ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় ছিলেন, তাঁর কিছু সফলতা ছিল, দুর্নীতির মাত্রা কম ছিল। ২০০১ সালের নির্বাচনে জনগণ তাঁকে প্রত্যাখ্যান করার পর তিনি ২০০৯ সালে ক্ষমতায় এসেই সংসদে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা রদের বিল উপস্থাপন করেন। একটা সময় ছিল, শেখ হাসিনার গণতন্ত্রে বিশ্বাস ছিল। ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় এসে আওয়ামী লীগের বাইরে থেকে বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদকে প্রেসিডেন্ট করেছিলেন তিনি এবং একই সংসদে ডেপুটি স্পিকার পদটি বিএনপিকে ছেড়ে দিতে চেয়েছিলেন। পরে অবশ্য ‘ঘনিষ্ঠজনদের’ পরামর্শে এ সিদ্ধান্ত থেকে তিনি সরে আসেন।

২০০৯ সালের পর থেকে শেখ হাসিনার স্বেচ্ছাচারিতার সব সীমা ছাড়িয়ে যায়। বাংলাদেশে শেয়ারবাজার ও আর্থিক খাত ধ্বংসের প্রধান কারিগর হিসেবে বিবেচিত সালমান এফ রহমানকে তিনি বানিয়েছেন উপদেষ্টা। বাংলাদেশের অর্থনীতিবিদদের অধিকাংশই আওয়ামী লীগ ঘরানার, অথচ তিনি অর্থমন্ত্রী করেন সব সময় একজন আমলা বা ব্যবসায়ীকে।

তাঁর পতনের পর খবর বেরিয়েছে, ‘সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামানের বিদেশে ৬২০টি বাড়ি, আরও বিপুল সম্পত্তির খোঁজ’। এস আলম গ্রুপসহ বিভিন্ন ব্যবসায়ী গোষ্ঠির দুর্নীতি, আইজিপি বেনজীরের দুর্নীতিসহ সবই হাসিনার শুধু জ্ঞাতসারেই নয়, তাঁর প্রত্যক্ষ মদদে হয়েছে। বিনিময়ে তিনি চেয়েছিলেন তাঁর দলের প্রতি আনুগত্য এবং পার্টি তহবিলে বড় অঙ্কের চাঁদা। এসব তো এখনা জানা কথা এবং সর্বত্র আলোচনার বিষয়বস্তু।

গণতন্ত্রহীনতায় প্রতিষ্ঠানগুলো ভেঙে পড়ে, দেখা দেয় ক্রোনি ক্যাপিটালিজম। তখন সরকারের টিকে থাকার জন্য দরকার হয় সামরিক-বেসামরিক আমলা ও পুলিশ, ব্যবসায়ী শ্রেণির সমর্থন। এ সমর্থন মেলে অন্যায় রাষ্ট্রীয় সুবিধার বিনিময়ে। শেখ হাসিনা ভেবেছিলেন, তিনি সামরিক-বেসামরিক আমলার, পুলিশের, ব্যবসায়ী শ্রেণির ক্ষমতা, অর্থ, সমর্থন দ্বারা সুরক্ষিত। কিন্তু তা হয়নি। তাসের ঘরের মতো উড়ে গেছে তাঁর মসনদ।

আওয়ামী লীগের সব নেতার মুখে যখন অতিকথন ও দম্ভের প্রকাশ, তখন বিএনপি নেতা তারেক রহমানসহ অন্য নেতাদের মধ্যে দেখা যায় পরিপক্বতার ছাপ। তাঁরা অনেক দিন ধরেই বলে আসছেন জাতীয় সরকার গঠনের কথা। বলছেন দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদের পরিকল্পনার কথা। ‘আমাকে দেশনায়ক-রাষ্ট্রনায়ক সম্বোধন করবেন না’, ‘আমার জন্মদিনের কেক কাটবেন না’, ‘প্রধানমন্ত্রীও স্বেচ্ছাচারী হবেন না, এটা নিশ্চিত করতে চাই’, ‘ভোটের অধিকার নিশ্চিত হলে কোনো দল নিষিদ্ধ করার দায়ভার রাষ্ট্রকে বহন করতে হবে না’, ‘একই ব্যক্তি সরকারপ্রধান ও দলীয় প্রধান থাকবেন না’, ‘এক ব্যক্তি দুই মেয়াদের বেশি প্রধানমন্ত্রী থাকতে পারবেন না’।

হাসিনা সরকারের পতনের পর নেতা-কর্মীদের সংখ্যালঘুদের পাশে দাঁড়ানোর জন্য নির্দেশ প্রদান, ধর্ম যার যার, নিরাপত্তা পাওয়ার অধিকার সবার এবং প্রতিহিংসার পথ পরিহার, মুক্তিযুদ্ধের অসাম্প্রদায়িক চেতনায় দেশ গড়ার অঙ্গীকার তারেক রহমানের বুদ্ধিমত্তা ও পরিপক্বতার সাক্ষ্য দেয়।

অভ্যুত্থান–পরবর্তী সময়ে বিএনপির প্রধান দুই নেতা—মহাসচিব মির্জা ফখরুল, মুখপাত্র রুহুল কবির রিজভী যেসব বক্তব্য দিচ্ছেন, তার মধ্যেও পরিপক্ব রাজনীতিজ্ঞানের পরিচয় মেলে; যেমন ‘রাষ্ট্রপতিকে অপসারণ করলে অনাবশ্যক রাজনৈতিক জটিলতার সৃষ্টি হবে’, ‘আমরা কোনো দলকে নিষিদ্ধ করার পক্ষে নই’ ইত্যাদি। ‘আওয়ামী লীগ নির্বাচনে এলে আমাদের আপত্তি নেই’ অথবা ‘বঙ্গবন্ধুর ছবি নামানো ঠিক হয়নি’—১৫ বছর ধরে আওয়ামী লীগের হাতে সীমাহীন জেল-জুলুম-নির্যাতনের পরও তাঁরা যখন এসব কথা বলেন, তখন তাঁরা উঠে যান অন্য এক উচ্চতায়, যা আওয়ামী লীগের যেকোনো নেতার নাগালের বাইরে।

কিন্তু একটি রাজনৈতিক দলের নেতা হিসেবে তারেক রহমানের অতীতের কর্মকাণ্ডের ও কথাবার্তার যে রেকর্ড, তাতে তিনি যে এসব বক্তব্যের সঙ্গে আন্তরিক, তা মানুষের পক্ষে আস্থায় আনা কঠিন। তিনি ২১ আগস্ট শেখ হাসিনাকে হত্যাচেষ্টা ও ১০ ট্রাক অস্ত্র মামলার আসামি হিসেবে তিনি শাস্তিপ্রাপ্ত। ইতিহাস বিকৃতির অভিযোগও তাঁর বিরুদ্ধে। তিনি জিয়াউর রহমানকে বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি হিসেবে আখ্যায়িত করেছিলেন। তাঁর মা, খালেদা জিয়ার ১৫ আগস্টে জন্মদিন পালন নিয়েও ছিল সমালোচনা ও বিতর্ক। তাঁকে আস্থায় নেওয়ার আগে মানুষের এসব বিষয় মনে পড়বে।

উইকিলিকসের ফাঁস হওয়া তথ্য থেকে জানা যায়, তারেক রহমানকে তৎকালীন মার্কিন রাষ্ট্রদূত ‘ক্লেপ্টোক্রেটিক সরকারের’ প্রতিভূ হিসেবে চিত্রিত করেছেন, তাঁকে বাংলাদেশে মার্কিন স্বার্থের জন্য গুরুতর হুমকি হিসেবে দেখেছেন এবং যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তাঁর সম্পর্কে একই মনোভাব কানাডার ও ভারতেরও।

কিন্তু কেউ যদি নিজেকে পরিবর্তন করে একজন মহৎ মানুষে উন্নীত হতে চান, সমাজের উচিত তাঁকে সুযোগ দেওয়া। আদি মহাকাব্য রামায়ণের রচয়িতা বাল্মিকী প্রথম জীবনের ছিলেন রত্নাকর দস্যু। কিন্তু প্রথম জীবনে তিনি কী ছিলেন, তা কেউ মনে রাখেনি। মনে রেখেছে একজন অমর স্রষ্টা হিসেবে বাল্মিকীকে।

বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানকে নেতা-কর্মীরা স্বাধীনতার ঘোষক হিসেবে গর্ব করতে চান। কোন তারিখে তিনি বঙ্গবন্ধুর পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন, সেটা বড় কথা নয়। গর্ব করার মানে হলো, তাঁরা মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে মূল্যবান মনে করেন। তাঁদের নেতা জিয়াউর রহমান শেখ মুজিবকে স্বাধীনতাসংগ্রামের মহান নেতা ও মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনা হিসেবে গণ্য করতেন। কখনো অসম্মান করে কথা বলেননি।

একটি আধুনিক রাষ্ট্র কীভাবে নির্মাণ করতে হয়, বিএনপির নীতিনির্ধারকেরা নিশ্চয়ই জানেন। তবু তাঁদের গভীর মনোযোগ দিয়ে ফরাসি বিপ্লবের ইতিহাস পাঠ করতে অনুরোধ করব। একটি আধুনিক রাষ্ট্র মানেই একটি প্রজাতন্ত্র, যার প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো মানুষ তৈরি করবে রাষ্ট্রের সব বিধিবিধান। রাষ্ট্র একটি নৈর্ব্যক্তিক প্রপঞ্চ, অতএব এর কোনো ধর্ম থাকবে না, রাষ্ট্র হবে সব ধর্মের সব মানুষের।

বিএনপির নেতৃত্ব যদি একটি আধুনিক রাষ্ট্র নির্মাণে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সমুন্নত রাখে, তাহলে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি তাদের পতাকাতলে হাজির হতে পারে। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা বলে তারা যদি মানুষকে ধোঁকা দেওয়ার চেষ্টা করে, ধর্মীয় ও রাজনৈতিকভাবে উগ্র মতাদর্শের শক্তিকে লালন করে, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত করে, ক্রোনি ক্যাপিটালিজম সৃষ্টি করে, তাদের অবস্থাও আওয়ামী লীগের মতো হবে—এটা সারাক্ষণ মনে রাখতে হবে।

  • এন এন তরুণ অর্থনীতির অধ্যাপক, ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ। সাউথ এশিয়া জার্নালের এডিটর অ্যাট লার্জ। nntarun@gmail.com

https://www.prothomalo.com/opinion/column/i5hf6doi3vNewspaper columns, Op-Eds & Media coverage

বাংলাদেশকে কি একটি আধুনিক রাষ্ট্র বানানো সম্ভব

বাংলাদেশকে কি একটি আধুনিক রাষ্ট্র বানানো সম্ভব

আধুনিক রাষ্ট্র বলতে কী বোঝায়? সংক্ষেপে যদি বলি, রাষ্ট্রের যেসব চারিত্র্য লাভের জন্য ফরাসি বিপ্লব হয়েছিল, সেগুলো যে রাষ্ট্রে থাকবে, সেই রাষ্ট্রই আধুনিক রাষ্ট্র। সর্বপ্রথম যে বৈশিষ্ট্য, তা হলো রাষ্ট্র চলবে মানুষের তৈরি আইনের দ্বারা—রাজার তৈরি আইন দিয়ে নয়। ক্ল্যাসিক্যাল মেকানিকসের তত্ত্ব অনুসারে, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মহাবিশ্বের সবকিছু পরিবর্তিত হয়ে যায়—পরিবর্তিত হয়ে যায় প্রাণী ও উদ্ভিদ জগতের জিনও। অতএব কোনো আইনই অনন্তকাল চলতে পারে না। নতুন সময়ে প্রণীত হতে হবে নতুন আইন। পরিবর্তনকে মেনে নেওয়াই আধুনিকতা।

সপ্তদশ ও অষ্টাদশ শতকে ইউরোপের এনলাইটেনমেন্ট মুভমেন্ট পুরো পশ্চিমা দুনিয়ায় যে বিশ্ববীক্ষা তৈরি করেছিল, তার মূলকথা ছিল বিশ্বাসের পরিবর্তে যুক্তির আশ্রয়, ভাবের বিপরীতে বস্তুর প্রাধান্য। এনলাইটেনমেন্ট মুভমেন্টই ফরাসি বিপ্লবের ভিত্তি। অতএব এনলাইটেনমেন্ট মুভমেন্টের পরিভাষার কয়েকটি শব্দবন্ধ লক্ষ করলে আধুনিক রাষ্ট্র বিষয়ে একটি ধারণা পাওয়া যাবে। যেমন এনলাইটেনমেন্ট মুভমেন্টের মূল বিষয়গুলোর মধ্যে আছে যুক্তির মহিমা উদ্‌যাপন ও যুক্তির প্রয়োগ; বিশ্বাস ও পূর্বধারণা থেকে মুক্তি; যে ধীশক্তি দিয়ে মানুষ এই অনন্ত বিশ্বকে জানতে পারে ও মানবসমাজের অবস্থার উন্নতি ঘটাতে পারে, সেই শক্তির উন্মেষ ঘটানো; জ্ঞান, মুক্তি ও সুখ হলো যুক্তিবাদী মানবতার লক্ষ্য ইত্যাদি।

‘যুক্তিবাদী মানবতা’ পরিভাষাটি একটু ব্যাখ্যা করি। ধরুন, ‘প্রত্যাদেশ’ বলছে, নিম্নবর্ণকে মন্দিরে ঢুকতে দেওয়া যাবে না। তখন চার্বাক দর্শনে বিশ্বাসী কেউ একজন হয়তো বলে বসবেন, ‘না। এটা হতে পারে না। ঈশ্বর এমন বৈষম্য করতে পারেন না। অতএব এই প্রত্যাদেশ ঈশ্বরের বাণী নয়। এটা নিছক কায়েমি স্বার্থবাদী ব্রাহ্মণদের কারসাজি।’

বাংলাদেশের সমাজে যখন জ্ঞান-বিজ্ঞান-দর্শনচর্চার খরা চলছে, তখন ফরাসি বিপ্লবের পূর্বক্ষণে জনগণের প্রস্তুতির পর্বটি খেয়াল করুন। ভল্‌তেয়ার, রুশোসহ অষ্টাদশ শতাব্দীতে ফ্রান্সে কালের অগ্রবর্তী চিন্তাবিদদের এবং লেখকদের একটি দল ব্যাপকভাবে লেখালিখি শুরু করেন। এগুলো ছিল রাষ্ট্র, রাজনীতি, সমাজ, মহাবিশ্ব, মানুষ, ঈশ্বর ইত্যাদি সম্পর্কিত দার্শনিক চিন্তা। এই দর্শনে ছিল মানবিক যুক্তির ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব। আর ছিল প্রতিষ্ঠিত ধর্মীয় ও বিরাজমান রাজনৈতিক অনুশীলনের সমালোচনা। ফ্রান্সের জনগণ তাঁদের এই দর্শন ব্যাপকভাবে পাঠ করে, গ্রহণ করে এবং ঘোরতর পরিবর্তন সাধনের জন্য সর্বাত্মক বিপ্লবের প্রস্তুতি নেয়।

ফরাসি বিপ্লবের শিকড় প্রোথিত চতুর্দশ শতক থেকে সপ্তদশ শতকে ঘটা ইউরোপের রেনেসাঁসের গভীরে। আর রেনেসাঁস হলো ইউরোপীয় সাংস্কৃতিক, শৈল্পিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পুনর্জন্ম। রেনেসাঁ ধ্রুপদি দর্শনশাস্ত্রের, সাহিত্যের ও শিল্পের পুনারাবিষ্কার। ৪৭৬ খ্রিষ্টাব্দে রোম সাম্রাজ্যের পতনের পর থেকে ত্রয়োদশ শতক পর্যন্ত বিরাজমান অন্ধকার যুগ পার হয়ে এই যে পুনরাবিষ্কার, কী সেই পুনরাবিষ্কার? পুনরাবিষ্কারটা হলো এই মহাবিশ্বের কেন্দ্রে মানুষ, মানুষের সব কর্মের কেন্দ্রে থাকবে মানুষ; জ্ঞান-বিজ্ঞান, শিল্প, সাহিত্য ইত্যাদি সব ক্ষেত্রে মানুষের যে অর্জন—সব মানুষের জন্য, এই মাটির পৃথিবীতে তাঁদের জীবনমানের উন্নতির জন্য।

ইউরোপের দেশ ইংল্যান্ডেও ঘটে গেল অনেক কিছু এবং বিরাট কিছু। বিজ্ঞানের আবিষ্কার ও প্রযুক্তির উদ্ভাবনী ইংল্যান্ডে ঘটাল শিল্পবিপ্লব। সেই বিপ্লব ছড়িয়ে পড়ল ইউরোপের অন্য দেশে ও যুক্তরাষ্ট্রে। ফলে নগরায়ণ হলো, যাতায়াতব্যবস্থার অভূতপূর্ব উন্নতি ঘটল। শ্রমিকের জীবনমানের উল্লম্ফন হলো। এরপর নাগরিক অধিকার ও স্বাধীনতা, রাজার ওপর পার্লামেন্টের কর্তৃত্ব, রাষ্ট্র ও ধর্মকে আলাদা করাসংক্রান্ত বিল অব রাইটস (১৬৮৯) পাস হলো এবং গ্লোরিয়াস রেভল্যুশন (১৬৮৮-১৬৮৯) ঘটল।

ইংলিশ বিল অব রাইটসের অনুপ্রেরণায় যুক্তরাষ্ট্রেও ১৭৮৯ সালে পাস হলো বিল অব রাইটস। যার মধ্যে মানুষের অধিকার ও ব্যক্তিস্বাধীনতার নিশ্চয়তা বিধান করা হয়েছে, যেমন বাক্‌স্বাধীনতা, সংবাদপত্র, সমাবেশ এবং ধর্মের অনুশীলনের নিশ্চয়তা; ন্যায্য আইনি প্রক্রিয়া এবং অস্ত্র বহন করার অধিকার এবং যে ক্ষমতা ফেডারেল সরকারের কাছে অর্পিত নয়, তা রাজ্য ও জনগণের জন্য সংরক্ষিত থাকবে।

১৭৯২ সালে রাজতন্ত্রের অবসান ঘটিয়ে প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে ফরাসি বিপ্লব পূর্ণতা লাভ করে। এর সঙ্গে প্রতিষ্ঠিত হয় দ্বিকক্ষবিশিষ্ট আইনসভা আর বিনাশ হয় যেকোনো রাষ্ট্রীয় বিষয়ে ধর্মের ভূমিকা। প্রতিষ্ঠিত হয় ফরাসি বিপ্লবের তিন আদর্শ: সাম্য, মৈত্রী, ভ্রাতৃত্ব। সমগ্র পৃথিবীতেই শুরু এক নতুন যুগের। ফরাসি বিপ্লবের অনুপ্রেরণায় কত দেশে কত যে মানুষ স্বাধিকারের জন্য লড়াই-সংগ্রাম করেছে এবং বিজয়ী হয়ে মানুষের ভাগ্য পরিবর্তন করেছে, তার ইয়ত্তা নেই।

এতক্ষণ যেসব বিপ্লবের ও মানুষের স্বাধিকার অর্জনের গল্প বলা হলো, তার সঙ্গে সর্বশেষ বিপ্লব, রুশ বিপ্লবের মৌলিক পার্থক্য আছে। অন্য সব বিপ্লব মানুষে মানুষে সাম্য নিশ্চিত করেনি। ভোটের অধিকার, মতপ্রকাশের অধিকার, নিজের মতো করে জীবনযাপনের অধিকার ইত্যাদির সঙ্গে ভাতের অধিকার তথা শ্রমজীবী মানুষের ন্যায্য পাওনা রুশ বিপ্লব ছাড়া অন্য কোনো বিপ্লব নিশ্চিত করতে পারেনি। বস্তুত, পিছিয়ে পড়া মানুষ তথা নারীর ও শ্রমিকের মুক্তি ছাড়া মানুষের মুক্তি হয় না। এই মুক্তি সাম্যবাদী আদর্শের বাস্তবায়ন ছাড়া অসম্ভব। কারণ, একমাত্র সাম্যবাদী আদর্শের ভিত্তিতে নির্মিত রাষ্ট্রেই ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকে শ্রমজীবী মানুষ—সে পুরুষ কিংবা নারী হোক। প্রমাণ তদানীন্তন সোভিয়েত ইউনিয়ন।

রুশ বিপ্লবের অমর সৃষ্টি সোভিয়েত ইউনিয়নের জ্ঞান-বিজ্ঞানে বিস্ময়কর অগ্রগতি এবং একটি পরাশক্তি হিসেবে উত্থান ছাড়াও উন্নয়নের মৌলিক দুটি উপাদান সাক্ষরতায় ও নারীর ক্ষমতায়নে দেশটি যা করেছে, তা অসম্ভবকে সম্ভব করার মতো। ১৯১৭-এ বলশেভিক সরকার গঠনের পর ১৯৩৯ সাল নাগাদ শহর ও গ্রামে শিক্ষার হার যথাক্রমে ৯৪ ও ৮৬-তে উন্নীত হয়, যা ১৯৫৯ সাল নাগাদ হয় ৯৯ ও ৯৮, যেখানে ১৮৯৭ সালের রাশিয়ার সেন্সাস রিপোর্ট অনুযায়ী নামমাত্র সাক্ষরতার হার ছিল ২১ শতাংশের নিচে। একই সময়ে সোভিয়েত ইউনিয়ন সর্বক্ষেত্রে নারী-পুরুষে সমতা আনতেও পুরোপুরি সক্ষম হয়। ইতিহাসবিদ বেন একলফ মন্তব্য করেন, ‘ব্রিটেন, ফ্রান্স ও জার্মানির যা করতে লেগেছে কমপক্ষে ১০০ বছর, সোভিয়েত ইউনিয়ন তা করেছে মাত্র ২২ বছরে।’

পুঁজিবাদী বিশ্বে নারী স্বাধীনতা, আমার মতে একটি আলংকারিক স্লোগানমাত্র। এর সঙ্গে যাঁরা যুক্ত, তাঁরা নিজেদের প্রগতিশীল গণ্য করে একধরনের ভাবালুতার ডুবে যেতে পছন্দ করেন। একজন পুঁজিবাদী নারী স্বাধীনতার চর্চা করতে পারেন না, কারণ জীবনের সর্বক্ষেত্রে সমতার চর্চা ছাড়া আলাদাভাবে নারী স্বাধীনতার চর্চা করা যায় না। রাষ্ট্রে, সমাজে ও পরিবারে সিদ্ধান্ত গ্রহণে, অর্থনৈতিক সক্ষমতায় ও রাজনৈতিক ক্ষমতায় নারী-পুরুষের সমান হতে পারে একমাত্র সাম্যবাদের ওপর প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রে। অতএব, কেউ যদি নারী স্বাধীনতার চর্চা করতে চান, তাঁকে সাম্যবাদী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় কাজ করতে হবে।

পুঁজিবাদী বিশ্বের শিরোমণি যুক্তরাষ্ট্রে একই কাজ করে পুরুষের চেয়ে নারীরা, শ্বেতাঙ্গদের চেয়ে কৃষ্ণাঙ্গরা কম মাইনে পান। মৃত্যুর হার শ্বেতাঙ্গদের চেয়ে কৃষ্ণাঙ্গদের, পুরুষের চেয়ে নারীর অনেক বেশি। কারণ, বছরের পর বছর কৃষ্ণাঙ্গরা, নারীরা ক্যালোরি–স্বল্পতায় ভোগার কারণে দেহে রোগ প্রতিরোধব্যবস্থা দুর্বল। পুঁজিবাদী দেশগুলোতে হলিউড, অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটিসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে সহকর্মী বা উচ্চপদস্থদের দ্বারা, শিক্ষকদের দ্বারা নারীদের যৌন হয়রানির ও ধর্ষণের ঘটনা নিরন্তর ঘটে যাচ্ছে। এতে প্রমাণিত হয় ফরাসি বিপ্লবের অন্যতম আদর্শ ‘সাম্য’ এখনো একটি ফাঁকা বুলি হিসেবে রয়ে গেছে।

আমাদের ছাত্ররা যদি একটি আধুনিক রাষ্ট্র নির্মাণ করতে চায়, তাহলে তাদের ফরাসি বিপ্লবের ইতিহাস পাঠ করতে হবে, শিক্ষা নিতে হবে এবং ফরাসি বিপ্লবের আদর্শে বাংলাদেশকে গড়তে হবে। আর যদি বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন বাস্তবায়ন করতে চায়, তাহলে ফরাসি বিপ্লব পার হয়ে হেঁটে যেতে হবে আরও দূরে—পূর্ব দিকে, রুশ বিপ্লবের কাছে।

  • এন এন তরুণ অর্থনীতির অধ্যাপক, ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ। সাউথ এশিয়া জার্নালের এডিটর অ্যাট লার্জ। nntarun@gmail.com

Can the student movement free us from dynastic politics?

Can the student movement free us from dynastic politics?

Plato, in his magnum opus The Republic, portrays his ideal state as one that ensures justice, harmony, and the well-being of its citizens. From this, we can infer that the aim of politics is to increase the well-being of people. In Plato’s ideal state theory, a philosopher-king must be an enlightened ruler with a deep understanding of state affairs and the ability to discern absolute truth and justice.

Today, one might question the use of terms like “king” and “ruler.” Regardless of the terminology, the underlying meaning remains the same. However, when politics is dominated by family dynasties or if the state suffers from crony capitalism, the well-being of the people tends to diminish.

The historical events that have most shaped the modern world are the European Renaissance, the Industrial Revolution, the Magna Carta, the Glorious Revolution of England, the French Revolution, the Bill of Rights enacted in the US, and the Russian Revolution. The essence of these events is the empowerment of people and, in some cases, a transition from monarchy (centralized power within one family) to democracy (government of the people, by the people, for the people). This transition aimed to uphold people’s interests and maximize their well-being.
When power is concentrated within a single family, people’s well-being is rarely maximised. This is why people revolted against monarchies—to ensure that state opportunities were open to all, regardless of caste and creed, so that people could enjoy freedom of choice, freedom of enterprise, and thus maximise their well-being.

In the states in which these revolutions took place, people’s well-being significantly improved after the transitions. Amartya Sen’s capability approach to development explains that the development of individuals’ capacities is key to the overall human development. “Enhancement of capacities” means utilising the inherent potential in humans. When individuals’ capacities are enhanced, they can achieve great things. To enhance these capacities, the state must play a crucial role by addressing needs such as alleviating poverty, providing schooling, etc. But in the states in which power is concentrated to one family or where crony capitalism exists, individuals’ capacities cannot be enhanced, that is, human potentials remain unutilised.

A critical aspect here is that people do not enjoy receiving alms from others, be it from individuals or the state. They prefer to stand on their own feet, exert their own efforts, build their own enterprises, and earn their own bread. They do not wish to be objects of pity from “royal families.” This inherent aspect of human nature underscores the necessity for the “enhancement of capacities,” as proposed in Sen’s capability approach.

Family dynasties depend on a psychological phenomenon called “person worship” or a personality cult, often visible in developing countries where people who are not very educated view the family members or descendants of a “hero” as superior. Once people start to “worship” a certain individual, they continue to worship their descendants across generations.

In Bangladesh, the families of Sheikh Mujibur Rahman and Gen Ziaur Rahman are examples of such dynasties. As mentioned previously, states plagued by family dynasties generally experience lower levels of well-being, and moral issues are even more critical. Every individual, be it someone from a poor family or someone from a rich family, should be able to get to the top of the state ladder. But family dynasties create barriers in every individual’s path to such a rise—leading to the creation of a discriminatory, unfair, and unjust society. Since the recent student movement in Bangladesh is called the anti-discrimination student movement, we would expect these young individuals with modern values to advocate for the abolition of family dynasties.

This movement is a boon for Bangladesh, which should help us with a tremendous transition. Now, the students can help establish a new political party and free the country from the burden of family dynasties. Those who have already completed their studies may become members of this new political party, while others may join later. They may also invite others with knowledge, integrity, and patriotism to join them. If they pursue this path, I would issue two warnings.

First, I would advise them to consider Plato’s idea on forming ​​a new political party and building a new state. Plato advocated for a meritocratic society where individuals are assigned roles and responsibilities based on their own abilities, rather than inherited or acquired status. Education plays a leading role in shaping citizens in an ideal state, with a system focused on rigorous philosophical training, mathematics, ethics, and physical fitness to nurture intellect and moral character.

Second, I would insist that the principle of equality be the core spirit of the proposed political party. We must remember that human emancipation is not possible without social ownership of wealth, for which we must cultivate the spirit of collective life within society and also develop an education system that teaches this spirit of collective life.


Dr N N Tarun Chakravorty is visiting professor of economics at Siberian Federal University, Russia, and editor-at-large at South Asia Journal.


Views expressed in this article are the author’s own.

শুভ জন্মদিন ‘গাছপাথর’

ইংরেজি সাহিত্যের অধ্যাপক, সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী পত্রিকায় কলাম লিখতেন নিশ্চয়ই বিবেকের তাড়না থেকে, সমাজ পরিনর্তনের আকাঙ্ক্ষা থেকেই— এটা বোঝা যায়। বস্তুত, ৮০ ও ৯০-এর দশকে আমার মতে তিন শীর্ষ কলাম লেখকদের একজন অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী যিনি গাছপাথর ছদ্মনামে ‘সময় বহিয়া যায়’ শিরোনামে সেই সময়ের বহুল প্রচারিত ‘সংবাদে’ দীর্ঘকাল একটানা লিখেছেন। অন্য দুইজন হলেন আবুল কালাম শামসুদ্দিন, অল্পদর্শী নামে ‘বৈহাসিকের পার্শ্বচিন্তা’ শিরোনামে আর সন্তোষ গুপ্ত লিখতেন অনিরুদ্ধ ছদ্মনামে। সেই স্কুল জীবনেই চাতক পক্ষীর মতো অপেক্ষায় থাকতাম এঁদের কলাম পড়ার জন্য। অনেকেই ‘সংবাদ’ রাখতেন শুধু এঁদের কলাম পড়ার জন্য।  

জাতস্য হি ধ্রুবঃ মৃত্যুঃ অর্থাৎ জন্ম হলে মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী। অতএব, মৃত্যুর কথা বলায় দোষের কিছু নেই। সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীরও নিশ্চয়ই একদিন মৃত্যু হবে। ২৩ জুন তাঁর জন্মদিনে আজ যে নিবন্ধটি আমি লিখছি, তা অনেক আগেই লিখে রেখেছি। ভেবেছিলাম, তাঁর যে দিন মৃত্যু হবে ঠিক তার পর দিনই পত্রিকার পাতায় নিবন্ধটি ছাপা হবে কিন্তু অন্য শিরোনামে— ‘আসামান্য অবদান রেখে বিদায় নিলেন প্রফেসার সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী।’ কিন্তু আজ মনে হল, তাঁর অন্তত একজন ভক্ত তাঁর মৃত্যুর পর পত্রিকার পাতায় কী শিরোনামে কী লিখবে, তা তিনি জীবৎকালেই দেখে যান। আমি চাই, জীবনের এই অপরাহ্ণ বেলায় তাঁর চোখে আজ কিছু অশ্রু ঝরুক। সে অশ্রু আনন্দের। ‘পৃথিবীকে কিছু দিতে পেরেছি’—এ অশ্রু সেই অনুভূতির। ঠিক রবীন্দ্রনাথের কবিতার মতো:

ধরনীর তলে গগনের গায়
সাগরের জলে অরণ্যছায়
আরেকটুখানি নবীন আভায়
রঙীন করিয়া দিব।
সংসার-মাঝে কয়েকটি সুর
রেখে দিয়ে যাব করিয়া মধুর
দু-একটি কাঁটা করি দিব দূর---
তারপর ছুটি নিব

কিছু ব্যক্তিগত স্মৃতি চারণ করতে চাই। এতে মানুষ জানতে পারবে শিক্ষক হিসেবে, গুরু হিসেবে ও মানুষ হিসেবে তিনি কেমন। বলার অপেক্ষা রাখে না, তাঁর লেখা নিয়মিত কলাম ‘সময় বহিয়া যায়’ অনেক অল্প বয়স থেকেই পড়ে পড়ে আমি তাঁর ভক্ত হয়ে উঠেছি। বস্তুত, আমি যে সমাজবাদী, ইহজাগতিক, সাম্যনিষ্ঠ, মানবিক মননের অধিকারী হতে পেরেছি— এর পেছনে যাঁর অবদান সবচে বেশি, তিনি হলেন প্রফেসার সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী। আমার কলেজ জীবনের শিক্ষক লিওনার্ড শেখর গোমেজ একদিন আমাকে তাঁর নিজের মটর বাইকে চড়িয়ে নিয়ে গিয়ে তাঁর শিক্ষক এই গাছপাথরের সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন আর বলেছিলেন, ‘স্যার, ও আপনার একজন ভক্ত। আপনার কাছে মাঝে মাঝে আসবে। ওকে একটু সময় দিয়েন !’ সেই যে সম্পর্ক তৈরি হল, যে সম্পর্ক গভীর থেকে গভীরতর হয়েছে।

কত কিছু যে শিখেছি তাঁর কাছে তা শেষ বলে শেষ করা যাবে না। তিনি সাদা দলের নেতা, উপাচার্য হওয়ার জন্য মনোনীত হয়েছিলেন— এই রকম একজন মানুষ কলা ভবনে দেখা হলেই টিচার্স লাউঞ্জে নিয়ে গিয়ে খাওয়াতেন আর গল্প করতেন। তাঁর বাড়িতে গেলে বিপত্মীক তিনি নিজ হাতে কফি বানিয়ে খাইয়েছেন। স্যারকে আমি ফোন করেও মাঝে মাঝে এটা, ওটা জানতে চেয়েছি। একদিন আমি হুমায়ূন আজাদের ‘সব কিছু নষ্টদের অধিকারে যাবে’ অনুবাদ করতে গিয়ে ‘নষ্টদের’ ইংরেজি অনুবাদ কী হবে বুঝতে পারছিলাম না। স্যারকে ফোন করে জানতে চাইতেই বললেন, ‘দ্য স্পয়েল্ট’। বিশ্বরাজনীতি নিয়েও টেলিফোনে অনেক সময় ধরে কথা বলেছি। কখনো বিরক্ত হন নি। সে জন্যেই বলি, তাঁর কাছে আমার ঋণের পরিমাণটা একটু বেশিই। একদিন বড় হয়ে পত্রিকায় কলাম লিখব, জনগণের মানস গঠনে ভূমিকা রাখব— এই স্বপ্নটা সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর কাছ থেকেই পাওয়া। আমার গদ্যের মধ্যেও, কান পাতলে, পাঠক শুনতে পাবে ছন্দের রিনিঝিনি— এর দীক্ষাগুরুও তিনি। 

অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক ২০০৩ সালের দিকে আমাকে একদিন বলেছিলেন, ‘হুমায়ূন আহম্মদের বই যেমন এখন বিক্রি হয়, সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর লেখা যে কোন বই পুরো আশি ও নব্বই দশক জুড়ে এভাবে বিক্রি হয়েছে।’ বস্তুত, সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর কলাম ও বই আমার আগের প্রজন্ম, আমার প্রজন্ম ও পরের প্রজন্মের মনন গঠনে বিরাট ভূমিকা পালন করেছে। অনেকেই হয়তো তাঁর আরাধ্য সমাজতন্ত্রকে জীবনের আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করে নি কিন্তু শ্রেয়বোধ, কল্যাণচেতনা ও সমণ্বিত জীবনচেতনা প্রথিত করেছে তাঁর লেখা, এই তিন প্রজন্মের একটা বড় অংশের মধ্যে। আমি নিজে মার্ক্সবাদের সংস্পর্শে আসি স্কুল জীবনেই পারিবারিক আবহে কিন্তু সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর কলাম ও বই আমার মার্ক্সীয় চেতনাকে দৃঢ ও শানিত করেছে, আজও করছে।      

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর সাহিত্য সমালোচনা আর দশ জনের চেয়ের আলাদা কারণ এই কঠিন কাজটি তিনি করেন ইতিহাস ও সমাজতত্ত্বের আলোকে। ইতিহাসচেতনার ও সমাজতত্ত্বের জ্ঞান ছাড়া যে সাহিত্য সমালোচনা, তা যথার্থ সাহিত্য সমালোচনা  নয়। একটি উদাহরণ দিই। বঙ্কিমচন্দ্র  সম্পর্কে তিনি লিখেছেন: ‘বঙ্কিমচন্দ্র নায়ক খুঁজতে গিয়ে দেখতে পেলেন পরাধীন দেশে নায়ক পাওয়া কঠিন। নায়কের খোঁজে তিনি ইতিহাসের কাছে গেলেন, গেলেন জমিদার বাড়িতে, দেখলেন নায়করা সবাই রিপুর সেবক, আরো দেখলেন মেয়েরা এই পরাধীনদের ঘরে পরাধীন; দেখলেন, বন্দি মেয়েরা অনেক সময় পুরুষকে হারিয়ে দেয়; দেখলেন, পুরুষরা যথার্থ পুরুষ নয়। নবকুমার আশ্রয় দিতে পারে না কপালকুণ্ডলাকে; দেখলেন, উদার সৌন্দর্যকে স্থান করে দেবে এমন আশ্রয় নেই তাঁর নায়কদের গৃহে। কুন্দনন্দিনী তাই আত্মহত্যা করে; দেখলেন, মানুষগুলো সব আবদ্ধ একটি বৃহৎ কারাগারে। তারই ভেতর তাদের ওঠাবসা, যুদ্ধ ও প্রেম।’

এক অগ্রজ কবি আমাকে অনেক কাল আগে বলেছিলেন, “সাহিত্য সমালোচনা কী জিনিস, তা সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর ‘কুমুর বন্ধন’ না পড়লে বুঝতে পারবে না। বস্তুত রবীন্দ্রনাথের উপন্যাস, যোগাযোগ ও কুমুর চরিত্র আর কেউ এমনভাবে ব্যাখ্যা করেতে পারেন নি।” এ কথা শুনেই আমি বইটি সংগ্রহ করি এবং একটানা পড়ে ফেলি। এটি পড়ে এক দিকে আমি সাহিত্য পাঠের আনন্দ লাভ করি, আবার অন্যদিকে, পড়তে পড়তে কোথায় যেন হারিয়ে যাই।

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর সমাজবাদী চেতনা ও তার অনুশীলন আর কর্তব্যপরায়ণতা বিষ্ময়কর। ঢাকা শহরে আমাদের বাসায় প্রতি বছর ৩-৪ বার অনুষ্ঠান করতাম যেখানে শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের আয়োজন থাকত। জাতীয় পর্যায়ের অনেক বুদ্ধজীবী আমার অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছেন। কিন্তু প্রফেসর সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী কখনও আসেন নি। না যাওয়ার জন্য অনুযোগ করতেই একদিন তিনি বললেন, ‘কোন অনুষ্ঠান যদি সামাজিক-রাজনৈতিকভাবে সমষ্টির উদ্যোগে হয়, একমাত্র তাহলেই আমি যেতে পারি। উদ্দেশ্য যদি হয় দাওয়াত খাওয়া, আমি যাই না।’ আমার আর কোন অনুযোগ থাকল না এবং তাঁর প্রতি আমার শ্রদ্ধা বেড়ে গেল বহুগুণ।  যে দিন তাঁর স্ত্রীর মৃত্যু হয়, তিনি সেদিনও এসেছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাশ নিতে। বক্তৃতা করলেন পুরোটা সময় এবং তাঁর সেই চিরচেনা স্বভাবসুলভ আলোচনামুখরতায় কোন ছন্দপতন লক্ষ্য করা যায় নি। এ ঘটনাটি আমার জানা ছিল না। আমাকে বলেছিলেন, অধ্যাপক আনিসুজ্জামান। মহাত্মা গান্ধী বলেছিলেন, ‘বি দ্য চেইঞ্জ দ্যট ইউ উইশ টু সি ইন দ্য ওয়ার্ল্ড।’ সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী গান্ধীবাদী নন কিন্তু গান্ধীর এই উক্তিটির এমন অনুশীলন সারাটা জীবন করে গেছেন। সমাজতন্ত্রের আদর্শকে সারা জীবন হৃদয়ে ধারণ করেছেন, চর্চা করেছেন ও প্রচার করেছেন। কোন দিন এতটুকুও বিচ্যুত হন নি।

অত্যন্ত কঠিন বিষয় সহজবোধ্য করে লিখতে পারার যাদুকরী ক্ষমতা সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর লেখার প্রধান বৈশিষ্ট্য। তাঁর লেখার মধ্যে ঘুরে ফিরে পুঁজিবাদের অশুভ ও সর্বগ্রাসী চারিত্র্য এবং সমাজতন্ত্রের কল্যাণকর দিকগুলো বার বার আসে কিন্তু তা পাঠকের মধ্যে একঘেয়েমি সৃষ্টি করে না। কারণ যে সব ঘটনা সাধারণ মানুষের জীবনকে স্পর্শ করে, তিনি সুকৌশলে সে সব ঘটনার অবতারণা করেন এবং তা ব্যখ্যা করেন তত্ত্বের আলোকে উপমার মধ্য দিয়ে। তিনি একবার লিখলেন, ‘মোটর সাইকেলের মধ্যে একটা উদ্ধত ভাব আছে কিন্তু বাইসাইকেলের মধ্যে আছে বিনয়।’  

তাঁর লেখার আরেকটা বৈশিষ্ট্য হল, গদ্যের মধ্যেও একটি ছন্দ আছে, যা পাঠক খুব সহজেই অনুভব করেন। তাঁর সদ্য প্রয়াত স্ত্রীকে নিয়ে লেখা ‘বন্ধুর মুখচ্ছবি’ সাপ্তাহিক বিচিত্রায় ছাপা হয়েছিল। ‘বন্ধুর মুখচ্ছবি’র মর্মস্পর্শী ভাষা পাঠককুলকে ভীষণভাবে নাড়া দেয়। বাজার থেকে সব কপি উধাও হয়ে গেলে আমরা একে অপরকে বেদনাবিধুর এই গল্পটি ফটোকপি বিলি করেছি। একদিন তাঁর ধানমন্ডির বাড়িতে গিয়ে হাজির হলাম। ঘটনা খুলে বললাম। ‘নাজমা জেসমিন চৌধুরী স্মারকগ্রন্থের’ একটাই কপি স্যারের কাছে ছিল। তিনি সেটাই আমাকে দিয়ে দিলেন। এক পর্যায়ে আমি তাঁকে বললাম ‘স্যার, আপনি লেখেন গদ্য, কিন্তু পড়লে মনে হয় আমি কবিতা পাঠ করছি। আপনি কবিতা লেখেন না কেন?’ তিনি হাসলেন আর বললেন, ‘বর্তমানে যাঁরা কবিতা লিখছেন, তাঁদের চেয়ে ভালো যেদিন লিখতে পারব, একমাত্র সেদিনই তা প্রকাশ করব। আবর্জনা লিখে পাঠকের সামনে হাজির করতে চাই না।’

পিতার মৃত্যু ও স্ত্রীর মৃত্যু ভীষনভাবে আঘাত করেছিল এই স্থিতপ্রজ্ঞ মানুষটিকেও। প্রথম মৃত্যুটি ঘটে তাঁর ইংল্যাণ্ডের প্রবাস জীবনে। আগেই বলেছি, ‘বন্ধুর মুখচ্ছবি’র মর্মস্পর্শী ভাষা পাঠককে অশ্রুসিক্ত করে। তিনি লিখেছেন, ‘ঐ বিদেশ বিভূঁইয়ে, পিতার মৃত্যুর খবর নিয়ে, তুমি ছাড়া, বলো নাজমা, আর কার কাছে যাব?’। এর পর তিনি লিখছেন, ‘আমার কি জন্ম হয়েছিল, নাজমা, তোমার সঙ্গে পরিচয়ের আগে? আমি জানি না; কিন্তু পিতার মৃত্যুর সেই অন্ধকারে আরেকটি জন্মের ঘটনা ঘটেছিল, সেটা জানি।’ স্ত্রীর মৃত্যুর পর তিনি লিখছেন, ‘…অন্ধকার আর এক রকমের হয়, রোমান্টিক ধারণার মতো। সেই অন্ধকার খুব প্রিয় ছিল তোমার, যে অন্ধকারে আকাশে তারা জ্বলে মিটি মিটি কিংবা গুচ্ছ গুচ্ছ…।’ কত ভালো হত নিজের মৃত্যুর পারে গিয়ে যদি প্রিয়তমা স্ত্রীর সাথে আবার দেখা হত! কিন্তু হায় ! মৃত্যুই যে জীবনের সীমারেখা। নাজমা জেসমিন চৌধুরী, তাঁর সেই প্রিয়তমা স্ত্রী যিনি একদা অন্ধকার আকাশের মিটি মিটি তারার মধ্যে হারিয়ে গিয়েছিলেন, তাঁর সাথে আসলে কি আর দেখা হবে? হবে না!