‘ও গঙ্গা তুমি বইছো কেন?’

গাজায় যে হত্যাযজ্ঞ এবং জাতিগত নির্মূলের ও বাস্তুচ্যুতির অভিযান চলছে, তা আজ অতীতের সব মানবতাবিরোধী নারকীয় ঘটনার বিভৎসতার সীমা অতিক্রম করেছে। ইতিহাসের কোন পর্বে কোন দেশে এত শিশুর বোমাবর্ষণে বা গুলিতে কিংবা অনাহারে মৃত্যু ঘটেছে কিনা আমার জানা নেই। প্রশ্ন হল, এর শেষ কোথায়? আদৌ কি শেষ হবে? কীভাবে হবে? আমি জানি না। কিন্তু বিশ্বব্যবস্থার আমুল পরিবর্তন ছাড়া যে এর শেষ নেই, সেটা জানি।

২০২৫ সালের ৪ মার্চ পর্যন্ত গাজা যুদ্ধে মোট ৫০,০০০-এরও বেশি মানুষের মৃত্যুর ঘটেছে—যার মধ্যে ৪৮,৪০৫ জন ফিলিস্তিনি এবং ১,৭০৬ জন ইসরায়েলি। এছাড়া নিহতদের মধ্যে রয়েছেন ১৬৬ জন সাংবাদিক ও গণমাধ্যমকর্মী, ১২০ জন শিক্ষাবিদ এবং ২২৪ জনেরও বেশি মানবিক সহায়তাকর্মী—যার মধ্যে ১৭৯ জন ছিলেন জাতিসংঘের অন্তর্গত।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে ইসরায়েল অন্তত ১৭, ৪০০ শিশুকে হত্যা করেছে। আরও বহু শিশু ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে আছে—তাদের অধিকাংশই মৃত বলে ধারণা করা হচ্ছে।  ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী এ পর্যন্ত ১৭, ০০০ শিশু বাবা-মা বা পরিবার-পরিজন থেকে আলাদা, নিস্ব, নিঃসঙ্গ, একাকী। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত গড়ে প্রতি ৪৫ মিনিটে একজন আর প্রতিদিন ১০০ শিশুকে হত্যা করা হয়েছে।

গাজা এখন আর কোন জনপদ বা লোকালয় নয়, গাজা এখন একটি ধ্বংসস্তূপ যেন মহাপ্রলয়ের শেষ চিহ্ণ। এটা একদা ২৩ লাখ মানুষের বাসস্থান ছিল, তাঁদের অধিকাংশই আজ বাস্তুচ্যুত। এই প্রলয়ংকর হামলায় গাজায় ৩৯,৩৮৪ শিশু পিতা-মাতাদের একজনকে অথবা উভয়কে হারিয়েছে।  যেসব শিশু বেঁচে আছে, তাদের অনেকেই একাধিক যুদ্ধের মানসিক আঘাত বয়ে বেড়াচ্ছে। এদের প্রত্যেকেই জন্মের পর থেকেই ইসরায়েলি অবরোধের দমবন্ধ পরিবেশে বেড়ে উঠেছে—যেখানে তাদের জীবনের প্রতিটি দিনই নিপীড়নের ছায়ায় আচ্ছন্ন।

এই প্রেক্ষাপটে ৭ অক্টোবর ছাত্রদের নেতৃত্বে সংগঠিত হল বৈশ্বিক উদ্যোগ ‘দ্য ওয়ার্ল্ড স্টপস’, যা গাজার ফিলিস্তিনি জনগণের প্রতি গভীর আন্তর্জাতিক সংহতির প্রতিফলন, বিশেষভাবে শিশুদের ওপর বিপর্যয়কর প্রভাব তুলে ধরেছে। এই আন্দোলন শুধু ক্রমবর্ধমান মানবিক সংকটের দিকে মনোযোগ আকর্ষণই করেনি, বরং বৈশ্বিক হস্তক্ষেপের জরুরি প্রয়োজনের কথাও জোর দিয়ে বলেছে। ‘দ্য ওয়ার্ল্ড স্টপস’-এর মতো আন্দোলনের মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী যে ক্ষোভ ও প্রতিবাদ উঠে এসেছে, তা এই নৃশংসতাকে স্বাভাবিক করার প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে একটি সম্মিলিত নৈতিক অবস্থানকে প্রকাশ করে।

একই দিনে বাংলাদেশেও আমাদের ছাত্ররা পালন করল ‘দ্য ওয়ার্ল্ড স্টপ্‌স’ কর্মসূচী। একটা সময় ছিল যখন শুধু সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররাই জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ আন্দোলন-সংগ্রামে সামিল হত, কিন্তু ২০২৪-এর গণভ্যুত্থানের এই ধারণার অবসান ঘটে। জুলাই অভ্যুত্থানে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররাও সমানভাবে অংশ নেয়। আরেকটা লক্ষ্যণীয় বিষয় হল, আন্দোলনে তুলনামূলকভাবে বেশি সংখ্যায় ছাত্রীদের অংশগ্রহণ। আমাদের মেয়েরা আর শুধু সাজগোজ ব্যস্ত নিয়ে থাকে না। আমাদের মেয়েদের মাথার মধ্যে এখন দেশ-জাতি-পতাকাও থাকে — থাকে আর্তমানবতার প্রতি গভীর ভালোবাসা।

বুয়েটের ছাত্রী হোমায়রা বিনতে নাসির লিখেছে, ‘ফেইসবুক ওয়ালে প্রতিবার ফিড রিফ্রেশ করলেই গাজাবাসীর ভাগ্য নামক নির্মম বাস্তবতার কাছে হেরে যাওয়া দেখে কিছু সময়ের জন্য আমি ক্ষুব্ধ ঠিকই, কিন্তু আমার কথিত এম্প্যাথি একটা ক্রাই রি অ্যাক্ট এর মাঝেই সীমাবদ্ধ । পুরনো ডায়রিতে নিজের কিছু নোট দেখে বর্তমান ‘আমি’ কে খুব নিচ আর হীন মনে হচ্ছে।’

ইনডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশ-এর ছাত্র ইরফান মজুমদার বলছে, ‘মনে রাখতে হবে যে, মুসলমান হওয়ার জন্য ফিলিস্তিনিরা নিপীড়িত হচ্ছে না— তারা নিপীড়িত হচ্ছে কারণ তারা ফিলিস্তিনি। কোনো ধর্ম, মতবাদ, গির্জা, মসজিদ বা মন্দির মানবতার ঊর্ধ্বে নয়। মানবতা সবার উপরে। ফিলিস্তিনের নিরপরাধ মানুষদের জন্য আশীর্বাদ রইল।’

ইনডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশ-এর আরেক ছাত্রী, নোশেন ফাইজা মিছিলের মধ্যে যমুনা টিভির সাথে সাক্ষ্যাৎকারে বলছে, ‘আমরা এখানে এসেছি তীব্র প্রতিবাদ জানাতে। যেটা হচ্ছে, তা অসহনীয় এবং এটা আমরা সহ্য করব না।’ ফেইসবুকে আপলোড করা এই ভিডিওটি অসংখ্য ভিউ হয়েছে। ভিডিওটি নিচে তাঁর সহপাঠী যখন লিখেছে, ‘আই অ্যাম প্রাউড অফ ইউ।’ প্রত্যুত্তরে ফাইজা বলছে, ‘ভাই, প্রাউড হওয়ার কিছু নাই। আমি আনন্দিত যে, আমি আমার ভয়েস রেইজ করতে পেরেছি।’

সত্যিই তো। আজ গাজা যখন মৃত্যুপুরী, শত শত শিশুর কবরের দেশ, অসংখ্য দুধের শিশু পিতামাতাহীন অনাহারে কান্নারত, তখন আমরা কী ক’রে ঘরে থাকি? আশির দশকে কবি হেলাল হাফিজ অশুভ রাষ্ট্রশক্তির বিরুদ্ধে মিছিলে যাওয়ার অপরিহার্যতার কথা বলছিলেন। বলেছিলেন,  

‘এখন যৌবন যার মিছিলে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়,

এখন যৌবন যার যুদ্ধে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়।’

এমন দুঃসময়ে কিছু একটা কিছু না করতে পারলে, সারাটা জীবন অনুশোচনার আগুনে জ্বলতে হবে, তাই কবি আর এক কবিতায় সতর্কবার্তা উচ্চারণ করেছেন এভাবে:

‘মানব জন্মের নামে কলঙ্ক হবে

এরকম দুঃসময়ে আমি যদি মিছিলে না যাই,

উত্তর পুরুষে ভীরু কাপুরুষের উপমা হবো

আমার যৌবন দিয়ে এমন দুর্দিনে আজ

শুধু যদি নারীকে সাজাই।’

ইসরায়েল শিশুদের অনাহারকে যুদ্ধের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে, আর তা সমর্থন করছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। প্রশ্ন হল,  এমন নৃশংস মানুষ কীভাবে হতে পারে, তার কারণটা বোঝা দরকার। দরকার সমাজতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ। সমাজতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ হল, পুঁজির তাড়নাই সীমাহীন নৃশংসতায় রূপ নেয়। মার্কিন পুঁজিপতি অস্ত্রব্যবসায়ীরাই সরকার প্রধানকে বা সরকারকে প্ররোচিত করে যুদ্ধ বাধাতে ও জিয়িয়ে রাখতে, আগ্রাসন চালাতে ও আগ্রাসন চালাতে সহায়তা করতে। কারণ তাঁরাই নিজের ও অন্য দেশের সরকারের কাছে এবং সন্ত্রাসবাদী সংগঠনের কাছে অস্ত্র বিক্রি করে। সেই যুদ্ধ বা আগ্রাসন চালাতে গিয়ে যদি গর্ভবতী নারীকে—এমনকি শিশুকেও হত্যা করতে হয়, তাঁরা পিছ পা হবে না কারণ মুনাফার লোভে তাঁরা উন্মত্ত। গত ৭ই অক্টোবর ইসরায়েলের ওপর হামাসের হামলার প্রতিক্রিয়ার গাজায় ইসরায়েলী সেনাদের নির্বিচার আক্রমণ থেকে রক্ষা পেল না কিছুই— বসত বাটি, হাসপাতাল, নারী—এমনকি দুধের শিশুও। আর বিশ্ববাসী প্রত্যক্ষ করল পুঁজিবাদের নগ্ন চেহারা।

মনে রাখতে হবে, মৌলবাদের গায়ে ভর ক’রে পুঁজিবাদ বেড়ে ওঠে। এই তত্ত্বের উৎকৃষ্ট প্রমাণ ভারতীয় জনতা পার্টি। দলটি মৌলবাদের চূড়ান্ত রূপ উগ্র পুঁজিবাদ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। তারা কৃষকদের জমি কর্পোরেট মালিকদের হাতে তুলে দিতে চায়। সামাণ্য ঋণের টাকা শোধ করতে না পারলে কৃষককে জেলে যেতে হয়, কিন্তু ধনী ব্যবসায়ীদের হাজার কৌটি ঋণ মওকুফ করে দেয় বি.জে.পি সরকার। অতএব, মৌলবাদ দিয়ে বিশ্বের অস্ত্রব্যবসায়ী পুজিবাদী আগ্রাসনকে প্রতিহত করা যাবে না। দেশে দেশে একটি ক’রে সাম্যবাদী দলকে ক্ষমতায় আসতে হবে এবং তাহলেই সমতাভিত্তিক, ন্যায়ভিত্তিক একটি বিশ্বব্যবস্থা গড়ে ওঠবে।

বাংলাদেশে কিছু ধর্মীয় গোষ্ঠী ও কিছু ধর্মবাদী রাজনৈতিক দল গাজার ঘটনাকে মুসলমানদের ওপর নিপীড়ন হিসেবে উপস্থাপন করতে চাইছে, কিন্তু আদতে এটি জাতিগত নিপীড়ন এবং একটি মানবিক সংকট। এর বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার জন্য  মুসলমান হওয়ার দরকার নেই, দরকার একজন মানুষ হওয়ার। জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব মানুষের ব্যাপক প্রতিবাদ ছাড়া এ সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। প্রতিবাদটা হতে হবে পুঁজিবাদী সম্প্রসারণবাদের বিরুদ্ধে।

‘বিস্তির্ণ দুপাড়ে অসংখ্য মানুষের হাহাকার শুনেও নিঃশব্দে নিরবে বয়ে চলেছে’ বলে ভূপেন হাজারিকা গঙ্গাকে দোষারোপ করেছিলেন। ‘নৈতিকতার স্খলন দেখেও, মানবতার পতন দেখেও নির্লজ্জ অলসভাবে গঙ্গা বয়ে চলেছে দেখে গণমানুষের এই শিল্পী বিষ্ময় প্রকাশ করেছেন। তিনি অনুরোধ করছেন ‘সহস্র বরষার উন্মাদনার মন্ত্র দিয়ে লক্ষ জনেরে সবল সংগ্রামী, আর অগ্রগামী ক’রে তুলতে’। শিল্পী যথার্থই ব্যাখ্যা করেন, ‘ব্যক্তিকে ব্যক্তিকেন্দ্রিক হলে হবে না, আবার সমষ্টিকে ব্যক্তিত্বরহিত হলেও চলবে না।’ গাজা ইস্যুতেও আমরা মনে করি, দরকার বিশ্বব্যাপি সমষ্টির জাগরণ। কোন একক ধর্মাবলম্বী মানুষের জাগরণে ফল হবে না।  

গাজার শিশুদের হাহাকার শুনেও কিছু করতে না পারার জন্য কাকে দোষারোপ করব আমরা? কাকে অনুরোধ করব লক্ষ কোটি জনতাকে মানবতার মন্ত্রে উজ্জীবিত করে এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে বিদ্রোহে সামিল হতে? ছাত্রসমাজ পৃথিবীকেই অনুরোধ করছিল ক্ষণিকের জন্য থেমে যেতে, প্রতিবাদী হতে।

হয়তো একদিন স্বাধীন ফিলিস্তিনী ভূখণ্ড হবে, আবার ভোর হবে, নতুন সূর্য উঠবে; কিন্তু দেখতে না দেখতেই পৃথিবীর আলো যাঁদের জন্য দপ ক’রে নিভে গেল— সেই ইয়াজান, হিন্দ রজব, সাবরিন, ওয়েসাম, নাঈম, আলার মতো শিশুরা সেদিন থাকবে না। আর আমরা বেঁচে থাকব অপরাধবোধের তীব্র যন্ত্রণা নিয়ে, এবং অবশেষে একদিন আমাদেরও ‘নদীগুলোকে বুকের রেখেই চলে যেতে হবে’ ঐ শিশুদের পথে অনন্ত যাত্রায়!

————————————————————————————————————————

এন এন তরুণ অর্থনীতির অধ্যাপক, ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ। সাউথ এশিয়া জার্নালের এডিটর অ্যাট লার্জ। nntarun@gmail.com