রাজনীতির ব্যাকরণ

একটি টক শোতে বিএনপি নেত্রী ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানাকে যা বলতে শুনলাম, তার সারমর্ম এ রকম: বাংলাদেশে এখন একজন রাজনীতিকের ইমেজ হলো ক্লাস ফাইভ পাস, উঠতি লোকাল মাস্তান থেকে বড় মাস্তান, তারপর জাতীয় পর্যায়ের মাস্তান। চাঁদাবাজির রেট অনেক হাই। দুই নম্বরি ব্যবসা থেকে বিশাল টাকার মালিক। তারপর এমপি এবং একসময় হয়তো মন্ত্রী।

জানা কথা হলেও নতুন করে মন বিষণ্ন হলো। অথচ এই দেশেও একদা রাজনীতি ছিল শিক্ষিত, ত্যাগী ও মানবিক মানুষের ব্রত। কোথায়, কীভাবে হারিয়ে গেল সেই সব দিন? এমন চিন্তা থেকেই ‘রাজনীতিক’দের জন্য লিখতে ইচ্ছা হলো। জানি, প্লেটো-কাঙ্ক্ষিত ‘ফিলোসফার কিং’ আমাদের এ পোড়ার দেশে কখনোই হবে না। তবুও ভালো রাজনীতির কথা নিরন্তর বলে যেতে হবে, লিখে যেতে হবে।

বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় ও তৃতীয় দশকে মানব ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলো ঘটে, যেমন প্রথম বিশ্বযুদ্ধ, ভার্সাই চুক্তি, রুশ বিপ্লব ও সমাজতন্ত্রের সূচনা, ইতালিতে মুসোলিনির আবির্ভাব ও দুনিয়াব্যাপী ফ্যাসিজমের উত্থান, মহামন্দা, ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ক্ষয়িষ্ণু প্রবণতা যা ইন্ডিয়া অ্যাক্টে প্রতিফলিত, ব্রিটিশ রাজনীতিতে লেবার পার্টির উত্থান ও শ্রমিকের অধিকার রক্ষার দিকে মনঃসংযোগ। এরই প্রেক্ষাপটে ব্রিটিশ দার্শনিক ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানী হেরাল্ড লাস্কির চিন্তাজগতে ঘটে এক বিস্ময়কর বৈপ্লবিক পরিবর্তন। ১৯২৫ সালে লাস্কি রচিত মহাগ্রন্থ গ্রামার অব পলিটিকস এসব বৈশ্বিক ঘটনাবলির ও লাস্কি চিন্তাজগতের পরিবর্তনেরই প্রতিফলন।

লাস্কি এই গ্রন্থে রাষ্ট্র, সার্বভৌমত্ব, অধিকার, স্বাধীনতা এবং গণতন্ত্রের প্রকৃতি নিয়ে সমালোচনামূলক বিশ্লেষণ করেন। তিনি রাজনৈতিক কর্তৃত্বের একটি বহুবিধ ধারণা এবং এমন একটি সমাজতান্ত্রিক অর্থনৈতিক কাঠামোর পক্ষে যুক্তি উপস্থাপন করেন, যা সামাজিক ন্যায়বিচার ও অর্থনৈতিক সমতার ওপর গুরুত্ব দেয়।

লাস্কি রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বের প্রচলিত ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করেন। বলেন, ক্ষমতা রাষ্ট্রে কেন্দ্রীভূত না হয়ে বিভিন্ন সামাজিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে বণ্টিত হওয়া উচিত। তিনি হবস এবং অস্টিন উত্থাপিত আইনি সার্বভৌমত্বের ধারণার সমালোচনা করেন। এর পরিবর্তে তিনি সার্বভৌমত্বের একটি বহুত্ববাদী ধারণা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, রাষ্ট্রের পাশাপাশি একাধিক কর্তৃত্বের কেন্দ্র (যেমন শ্রমিক ইউনিয়ন, পেশাগত সংগঠন, স্থানীয় সরকার এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান) রাজনৈতিক জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এসব কর্তৃত্বকেন্দ্রের সহাবস্থানের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন তিনি।

তাঁর মতে, রাষ্ট্রই একমাত্র কর্তৃত্বের উৎস নয়। রাষ্ট্র বরং এমন একটি প্রতিষ্ঠান, যা অন্যদের সঙ্গে মিলেই শাসনব্যবস্থায় অংশগ্রহণ করে। লাস্কির এই বহুত্ববাদী দৃষ্টিভঙ্গি জি ডি এইচ কোল এবং লিয়ন দুগুইয়ের মতো চিন্তাবিদদের দ্বারা প্রভাবিত। তাঁরা মনে করতেন সমাজের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ক্ষমতা বণ্টন করা জরুরি, যেন স্বেচ্ছাচারিতা ও দমন-পীড়ন ঠেকানো যায়।

লাস্কি জোর দিয়ে বলেন, সরকারের কাজ শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করা নয়। সরকারের প্রধান কাজ হলো সবার জন্য কল্যাণ নিশ্চিত করা। তিনি বৈষম্য মোকাবিলায় অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ ও সামাজিক ন্যায়বিচারে রাষ্ট্রের সক্রিয় ভূমিকার পক্ষে মত দেন। লাস্কি বলেন, রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব নিরঙ্কুশ নয় এবং তা সামাজিক ও অর্থনৈতিক বিবেচনার মাধ্যমে সীমাবদ্ধ হওয়া উচিত। তিনি সতর্ক করেন, একটি অনিয়ন্ত্রিত রাষ্ট্র সার্বভৌমত্বের নামে ব্যক্তিস্বাধীনতা দমন করতে পারে। এর পরিবর্তে তিনি এমন একটি বিকেন্দ্রীকৃত শাসনব্যবস্থার কথা বলেন, যেখানে একাধিক প্রতিষ্ঠান সম্মিলিতভাবে কর্তৃত্ব ভাগ করে নেয়। তিনি অনিয়ন্ত্রিত পুঁজিবাদ তথা বাজার অর্থনীতির সমালোচনা করেন। কারণ, এটি অর্থনৈতিক বৈষম্য ও সামাজিক অন্যায্যতার সৃষ্টি করে। তাঁর মতে, সরকারের উচিত শ্রমজীবী শ্রেণির স্বার্থ রক্ষার জন্য হস্তক্ষেপ করা।

লাস্কি তাঁর বইয়ে ব্যক্তিস্বাধীনতার একটি নতুন তত্ত্ব উপস্থাপন করেন। কেবলমাত্র রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের অনুপস্থিতিই ব্যক্তিস্বাধীনতা নয়; বরং ন্যায়ভিত্তিক সমাজে ব্যক্তির সম্ভাবনা বিকাশের সামর্থ্য হিসেবে তিনি ব্যক্তিস্বাধীনতাকে সংজ্ঞায়িত করেন। তিনি অর্থনৈতিক বৈষম্যকে স্বাধীনতার জন্য একটি মৌলিক হুমকি হিসেবে দেখেন এবং বলেন, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ছাড়া রাজনৈতিক অধিকার অর্থহীন। কারণ, বৈষম্য গরিব ও শ্রমজীবী শ্রেণির জন্য সুযোগ সীমিত করে দেয়।

লাস্কি স্বাধীনতাকে দুটি ভাগে ভাগ করেন—আনুষ্ঠানিক স্বাধীনতা ও বাস্তব স্বাধীনতা। আনুষ্ঠানিক স্বাধীনতার মধ্যে রয়েছে আইনি ও রাজনৈতিক অধিকার। যেমন মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, ভোটাধিকার, ও আইনের সুরক্ষা। বাস্তব স্বাধীনতা এমন সামাজিক ও অর্থনৈতিক শর্তের কথা বলে, যা ব্যক্তিকে তাঁর অধিকারগুলো অর্থবহভাবে প্রয়োগ করতে সক্ষম করে। অর্থনৈতিক নিরাপত্তা না থাকলে আনুষ্ঠানিক স্বাধীনতা অর্থহীন হয়ে পড়ে। একটি উদাহরণ দিয়ে লাস্কি ধারণাটি ব্যাখ্যা করেন: ভোটাধিকার আছে এমন একজন দরিদ্র মানুষের যদি যথাযথ শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা বা ন্যায্য মজুরি না থাকে, তাহলে প্রকৃতপক্ষে তিনি স্বাধীন নন।

লাস্কির এই বক্তব্য বাংলাদেশের জন্য খুব প্রাসঙ্গিক। এখানে প্রত্যেক নাগরিকের ভোটাধিকার আছে। কিন্তু গরিব মানুষ নিজের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে পারেন না। সামান্য টাকার বিনিময়ে তিনি তাঁর ভোট বিক্রি করে দিতে বাধ্য হন অথবা গ্রামের মাতবর বা এলাকার প্রভাবশালী নেতার পছন্দ অনুযায়ী তিনি ভোট দিতে বাধ্য হন। কারণ, সেই মাতবর বা প্রভাবশালী নেতা তাঁকে ‘বিপদে’ রক্ষা করেন, প্রয়োজনের সময় কিছু টাকাপয়সা দেন এবং এক সময় জমি বা ভিটা লিখে নেন।

৭৫ বছর পরে এসে অমর্ত্য সেন স্বাধীনতাকে নতুনভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। নেগেটিভ ফ্রিডম, পজিটিভ ফ্রিডম। স্কুলে যাওয়ার অধিকারকে প্রফেসর সেন নেগেটিভ ফ্রিডম বলছেন। এখানে রাষ্ট্রের, সংগঠনের বা ব্যক্তির কাছে থেকে বাধা নেই, কিন্তু বাধা না থাকাই যথেষ্ট নয়। যাঁর স্কুলের বেতন দেওয়ার, বই কেনার টাকা নেই, সে এই স্বাধীনতা কী করবে? সে জন্য তিনি বলছেন, নেগেটিভ ফ্রিডম হলো প্রয়োজনীয় শর্ত; কিন্তু পর্যাপ্ত শর্ত নয়। পজিটিভ ফ্রিডমের মানে হলো আপনি যা মূল্যবান মনে করেন, তা করার বা হওয়ার বাস্তব সক্ষমতা থাকা। এটি শুধু স্বাধীনভাবে থাকতে পারার বিষয় নয়, এটি ক্ষমতায়নের বিষয়।

সেনের ক্যাপাবিলিটি অ্যাপ্রোচ তথা ক্ষমতাপদ্ধতিতে বিবৃত ‘ক্ষমতাসম্পন্ন স্বাধীনতা’র ধারণা আরও গভীর। এটা ব্যাখ্যা করতে তিনি ‘বাস্তব স্বাধীনতা’ শব্দটি ব্যবহার করেন। ব্যক্তি যে ধরনের জীবনকে মূল্যবান মনে করে, সেই জীবনযাপন করার সক্ষমতাই বাস্তব তথা কার্যকর স্বাধীনতা। তিনি জোর দিয়ে বলেন, স্বাধীনতা কেবল অধিকার থাকার বিষয় নয়; বরং সেই অধিকারগুলোকে অর্থবহভাবে ব্যবহার করার উপায় ও পরিবেশ থাকাও জরুরি। যেমন শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং সামাজিক সহায়তা।

গণতন্ত্রের দৃঢ় সমর্থক লাস্কি পুঁজিবাদী গণতন্ত্রের সমালোচনা করেন। কারণ, পুঁজিবাদী গণতন্ত্রে অর্থনৈতিক ক্ষমতা অভিজাত ও পুঁজিপতি শ্রেণির হাতে কেন্দ্রীভূত থাকে, তাঁরা সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখে আর সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ জীবনধারণের জন্য সংগ্রাম করে। এভাবে পুঁজিবাদ শ্রেণি বিভাজন সৃষ্টি করে। এ জন্যই তিনি এই ব্যবস্থাকে অন্যায্য মনে করেন এবং বিশ্বাস করেন, অর্থনৈতিক ক্ষমতার আরও ন্যায্য বণ্টন প্রয়োজন।

লাস্কির মতে, প্রকৃত গণতন্ত্র তখনই সম্ভব, যখন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতা সমানভাবে বণ্টিত হয়। গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে অংশগ্রহণমূলক এবং শ্রমজীবী শ্রেণির চাহিদার প্রতি সাড়া দেওয়ার মতো হতে হবে। তিনি সতর্ক করেন, যদি না অর্থনৈতিক ক্ষমতার গণতন্ত্রীকরণ হয়, তবে রাজনৈতিক গণতন্ত্র কার্যকর হয় না। লাস্কি এমন এক অংশগ্রহণমূলক গণতন্ত্রের পক্ষে কথা বলেন, যেখানে শ্রমিক ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় বেশি অংশগ্রহণ থাকবে। তিনি বিশ্বাস করেন যে নির্বাচনের বাইরে গণতান্ত্রিক অনুশীলনের সম্প্রসারণ দরকার এবং কর্মক্ষেত্রে গণতন্ত্র ও ট্রেড ইউনিয়নের অংশগ্রহণ একটি ন্যায়সংগত সমাজ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ।

লাস্কি এমন একটি সমাজতান্ত্রিক কাঠামোর পক্ষে যেখানে অর্থনৈতিক সম্পদ ব্যক্তিগত স্বার্থের দ্বারা নয়; বরং গণতান্ত্রিকভাবে নিয়ন্ত্রিত হয়। তিনি পুঁজিবাদকে স্বভাবতই শোষণমূলক হিসেবে দেখেন এবং ন্যায় ও সমতা নিশ্চিত করতে প্রধান শিল্পগুলোর যৌথ মালিকানার প্রয়োজনীয়তা বিশ্বাস করেন। তিনি এমন একটি বিশ্বের রূপকল্প রচনা করেন, যেখানে রাষ্ট্রগুলো আন্তর্জাতিক সংস্থার মাধ্যমে সংঘাতের সমাধানে সহযোগিতা করে। তিনি যুদ্ধ ও অর্থনৈতিক শোষণ রোধে বৈশ্বিক শাসনকাঠামোর পক্ষে সমর্থন জানান।

রবীন্দ্রনাথের মতো হেরাল্ড লাস্কিও জাতীয়তাবাদের বিপদ সম্পর্কে আমাদের সতর্ক করেন। তাঁর পর্যবেক্ষণ হলো, জাতীয়তাবাদ প্রায়ই সংঘাত ও যুদ্ধের দিকে নিয়ে যায়। তিনি এমন একটি বিশ্ব কল্পনা করেন, যেখানে রাষ্ট্রগুলো বিরোধ মীমাংসা ও অর্থনৈতিক সমতা এবং শান্তির মতো যৌথ লক্ষ্য অর্জনের জন্য পারস্পরিক সহযোগিতা করবে। তিনি এমন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাকে সমর্থন করেন, যেগুলো বাণিজ্য, শ্রমমান ও মানবাধিকারের নিয়মনীতি নির্ধারণ করবে। তাঁর মতে, শক্তিশালী দেশগুলোর অর্থনৈতিক শোষণকে আন্তর্জাতিক সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের মাধ্যমে চ্যালেঞ্জ করা প্রয়োজন।

সাম্রাজ্যবাদ-উপনিবেশবাদের কঠোর সমালোচক, প্রফেসর লাস্কি যখন বলেন ‘সাম্রাজ্যবাদ-উপনিবেশবাদ পুঁজিবাদী শোষণের সম্প্রসারিত রূপ’, তখন তার মধ্যে মার্ক্সীয় তত্ত্বের প্রতিধ্বনি শোনা যায়। উপনিবেশমুক্তি ও নিপীড়িত জাতিগুলোর আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের পক্ষে লাস্কির জোরালো অবস্থান আমাদের প্রেরণা জোগায়।

লাস্কির গ্রামার অব পলিটিকস রাজনৈতিক তত্ত্বে একটি প্রভাবশালী রচনা হিসেবে বিবেচিত, যা রাষ্ট্রক্ষমতার সমালোচনা করে, বিকেন্দ্রীকৃত ও গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার পক্ষে মত দেয়, এবং সমাজতান্ত্রিক নীতির মাধ্যমে অর্থনৈতিক ও সামাজিক ন্যায় প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানায়। তাঁর চিন্তাধারা এখনো গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র এবং রাজনৈতিক বহুত্ববাদ নিয়ে আলোচনায় আমাদের উদ্দীপ্ত করে।

  • এন এন তরুণ অর্থনীতির অধ্যাপক, ইনডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ, সাউথ এশিয়া জার্নালের এডিটর অ্যাট লার্জ nntarun@gmail.com

রাষ্ট্র কেন ব্যর্থ হয়

ডারোন আসিমোগলু এবং জেমস এ. রবিনসন তাদের বই ‘হোয়াই নেশনস ফেইল: দি অরিজিনস অফ পাওয়ার, প্রসপারিটি অ্যান্ড পোভার্টি’-এ একটি জাতির ব্যর্থতার কারণগুলো ব্যাখ্যা করেছেন। বইয়ের উপসংহার  হচ্ছে, কোনো দেশের অর্থনৈতিক সাফল্য বা ব্যর্থতা ভৌগোলিক অবস্থান, সংস্কৃতি বা প্রাকৃতিক সম্পদের দ্বারা নির্ধারিত হয় না। নির্ধারিত হয় রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে।

এই বইয়ে দু’টি বিপরীতধর্মী প্রতিষ্ঠানের আলোচনা আছে। প্রথমটি হলো অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রতিষ্ঠান, যা লেখকদের মতে, সমৃদ্ধির মূল চাবিকাঠি। কারণ, এগুলো দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও স্থিতিশীলতার ভিত্তি তৈরি করে। এই প্রতিষ্ঠানগুলো নির্ধারিত হয় নিরাপদ সম্পত্তির অধিকার দ্বারা (যেখানে রাষ্ট্র ব্যক্তির ও ব্যবসার মালিকানা ও বিনিয়োগ সুরক্ষিত রাখে), আইনের শাসনের প্রতি প্রতিশ্রুতি, ন্যায্য ও উন্মুক্ত বাজার ব্যবস্থা, রাজনীতিতে জনগণের ব্যাপক অংশগ্রহণ আর সৃষ্টিশীল ধ্বংস (সৃষ্টিশীল ধ্বংস— একটি প্রক্রিয়া যা নতুন উদ্ভাবনকে উৎসাহিত করে, যদিও এটি প্রচলিত শিল্প ও ক্ষমতাসীন অভিজাতদের জন্য চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করতে পারে)।

দ্বিতীয় ধরনের প্রতিষ্ঠান হলো শোষণমূলক প্রতিষ্ঠান, যা লেখকদের মতে দারিদ্র্যের মূল কারণ। কারণ, এসব প্রতিষ্ঠান সম্পদ ও ক্ষমতা একটি ক্ষুদ্র অভিজাত গোষ্ঠীর হাতে কেন্দ্রীভূত করে, যা সামগ্রিক সমৃদ্ধিকে বাধাগ্রস্ত করে। শোষণমূলক প্রতিষ্ঠান কয়েকটি বৈশিষ্ট্য দ্বারা চিহ্নিত হয়: দুর্বল সম্পত্তির অধিকার (যেখানে সরকার বা অভিজাতরা ইচ্ছামতো সম্পদ দখল করতে পারে), স্বৈরতান্ত্রিক শাসন (যেখানে একটি ছোট গোষ্ঠী রাজনৈতিক ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ করে এবং সাধারণ জনগণের অংশগ্রহণ বাধাগ্রস্ত হয়), সীমিত অর্থনৈতিক স্বাধীনতা (শুধুমাত্র অভিজাতদের লাভবান হওয়ার সুযোগ থাকে), উদ্ভাবনের দমন (যে কোনো নতুন প্রযুক্তি বা ব্যবসাকে বাধা দেওয়া হয় যদি তা বিদ্যমান অভিজাতদের স্বার্থের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায়)।

ইতিহাস নির্মিত হয় সংকটকালীন সন্ধিক্ষণ দ্বারা— গবেষণাধর্মী এ বইয়ের এটা হল উল্লেখযোগ্য আবিষ্কার। সংকটকালীন সন্ধিক্ষণ  যেমন গণভ্যুত্থান, যুদ্ধ, বিপ্লব ইত্যাদি, যা একটি জাতির গতিমুখ পরিবর্তন ক’রে দিতে পারে। তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, একটি দেশের বিদ্যমান প্রতিষ্ঠানগুলোই নির্ধারণ করে যে, দেশটি এসব সন্ধিক্ষণের সুযোগ কাজে লাগাতে পারবে কিনা। ফলে, সব দেশ সমানভাবে এই পরিবর্তন থেকে উপকৃত হয় না।

লেখকদ্বয় এ বিষয়ে ১৬৮৮ সালে সংঘটিত ইংল্যাণ্ডের গ্লোরিয়াস রেভল্যুশনের উদাহরণ দিয়েছেন। এই বিপ্লবের আগে ইংল্যান্ড ছিল একটি নিরঙ্কুশ রাজতন্ত্রের শাসনে পরিচালিত। কিন্তু বিপ্লবের মাধ্যমে ক্ষমতা সংসদের হাতে স্থানান্তরিত হয়, যা আরও অন্তর্ভূক্তিমূলক রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের পথ সুগম করে। এই পরিবর্তন এমন একটি পরিবেশ সৃষ্টি করেছিল যেখানে ব্যবসা ও উদ্যোক্তারা বিকাশ লাভ করতে পেরেছিলেন। এর ফলে শিল্প বিপ্লব ত্বরান্বিত হয় এবং দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জিত হয়।

বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ ছিল ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ। পশ্চিম পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে, বাঙালি জাতির সামনে একটি নতুন পথ নির্মাণের অনন্য সুযোগ এসেছিল, যা পূর্বের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বঞ্চনা থেকে মুক্তি পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি করেছিল। এই স্বাধীনতার মুহূর্তটি সমৃদ্ধি ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি বহন করেছিল। তবে, ১৬৮৮ সালের গ্লোরিয়াস রেভল্যুশনের মতো, যা ইংল্যান্ডে অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রতিষ্ঠানের ভিত্তি স্থাপন করেছিল, বাংলাদেশ একই ধরনের অগ্রগতি অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে। ‘হোয়াই নেশনস ফেইল…’ বইয়ের ভাষ্য অনুসারে—বিশেষ করে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে— শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তির অভাব  দেশের স্বাধীনতার সুফল পুরোপুরি কাজে লাগানোর ক্ষমতাকে বাধাগ্রস্ত করেছে।

গবেষণাপত্রটির যুক্তি হল, দরিদ্র দেশগুলো দারিদ্র্যের ফাঁদে আটকে থাকে কারণ শাসক শ্রেণি পরিবর্তন প্রতিহত করে এবং বিস্তৃত অর্থনৈতিক ও সামাজিক অগ্রগতির চেয়ে নিজেদের ক্ষমতাকে অগ্রাধিকার দেয়। এমনকি যখন অর্থনৈতিক সংস্কার চালু করা হয়, তখনও সেগুলো অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির পরিবর্তে অভিজাতদের স্বার্থ রক্ষার জন্য ব্যবহৃত হয়। পাকিস্তান এই প্রবণতার একটি উজ্জ্বল উদাহরণ। স্বাধীনতার পর থেকেই দেশটি এমন শোষণমূলক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলে, যা ক্ষমতাকে একটি ছোট অভিজাত গোষ্ঠীর হাতে কেন্দ্রীভূত করে। শাসকেরা বিভিন্ন ধরনের দুর্নীতি ও অভিজাতদের নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা বজায় রাখে, ফলে প্রকৃত অর্থে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার সম্ভব হয়নি। যুক্তরাষ্ট্র সরকার ও আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থাগুলোর কাছ থেকে প্রচুর পরিমাণে বৈদেশিক সহায়তা পাওয়া সত্ত্বেও, এই সম্পদ মূলত শাসক শ্রেণি ও সামরিক বাহিনীর হাতেই কেন্দ্রীভূত থেকেছে, সাধারণ নাগরিকদের উন্নয়নে বা অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে তুলতে ব্যবহার করা হয়নি।

লেখকগণ একটি সংক্ষিপ্ত কাঠামো উপস্থাপন করেছেন, যা দেখায় কীভাবে একটি দেশ সাফল্য অর্জন করতে পারে। তাদের মতে, দারিদ্র্য থেকে মুক্তি পেতে হলে শোষণমূলক প্রতিষ্ঠান থেকে অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রতিষ্ঠান-এ রূপান্তর করা একান্ত দরকার। অর্থনৈতিক উন্নয়ন তখনই টেকসই হয়, যখন তার পূর্বে কার্যকর রাজনৈতিক সংস্কার ঘটে। ক্ষমতার বিস্তৃত বণ্টন উদ্ভাবন, স্থিতিশীলতা এবং দীর্ঘমেয়াদি সমৃদ্ধিকে উৎসাহিত করে। দেশগুলো দুর্ভাগ্য বা সম্পদের অভাবের কারণে ব্যর্থ হয় না; বরং তারা এমন একটি ব্যবস্থার মধ্যে আটকে থাকে, যেখানে ক্ষমতা ও সম্পদ একটি ক্ষুদ্র গোষ্ঠীর হাতে কেন্দ্রীভূত থাকে। একমাত্র পথ হচ্ছে অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা, যা রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক জীবনে সকলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করবে এবং সবার জন্য সুযোগ সৃষ্টি করবে।

বাংলাদেশের অবস্থান ‘হোয়াই নেশনস ফেইল’ বইয়ের আলোকে বিশ্লেষণ করা দরকার, যে বই লিখে এই লেখকেরা নোবেল প্রাইজসহ বিশ্বব্যাপী স্বীকৃতি অর্জন করেছেন। লেখকদের মতে, একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হয় তার প্রতিষ্ঠানের শক্তি ও প্রকৃতির দ্বারা। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানের প্রকৃতির কারণে কি বাংলাদেশ রাষ্ট্র ব্যর্থতার ঝুঁকিতে রয়েছে? দেশটি কি জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিতকারী অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পেরেছে, নাকি শোষণমূলক প্রতিষ্ঠান দ্বারা শাসিত হচ্ছে, যেখানে ক্ষমতা ও সম্পদ একটি ক্ষুদ্র গোষ্ঠীর হাতে কেন্দ্রীভূত? দুর্ভাগ্যবশত, বাস্তবতা হতাশাজনক। বিচার বিভাগ, নির্বাচন কমিশন, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম ও মানবাধিকার কমিশনের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোকে কখনোই সত্যিকারের অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে উঠতে দেওয়া হয়নি। বরং, একের পর এক সরকার আসার সঙ্গে সঙ্গে এসব প্রতিষ্ঠানের গুণগত মান আরও অবনতি হয়েছে। শেখ হাসিনার সরকার শোষণমূলক ব্যবস্থা আরও গভীরভাবে প্রোথিত করেছে, ক্ষমতা আরও কেন্দ্রীভূত করেছে এবং গণতান্ত্রিক শাসন ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য অপরিহার্য প্রতিষ্ঠানগুলোকে ধ্বংস করে দিয়েছ।

দেশ ভবিষ্যতে সমৃদ্ধির দিকে যাবে কিনা, তার একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্ণায়ক হল, সমাজ কতটা বিভাজিত। একটি বহুবিভাজিত সমাজের পক্ষে উন্নতির পরাকাষ্ঠায় পৌঁছানো কঠিন। এখানে ‘বিভাজন’ বিষয়টা ভালো ক’রে বোঝা দরকার। ইংল্যান্ড, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, নিউজিল্যান্ড, ইউরোপ বহু অভিবাসীর দেশ।  অভিবাসীরা বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন দেশ থেকে এ সব দেশে পাড়ি জমিয়েছেন। অতএব, তাঁদের ধর্ম, বর্ণ, বিশ্বাস, মত, পথ— সব আলাদা। কিন্তু তাঁরা যখন কাঙ্ক্ষিত দেশটিতে গিয়ে উপস্থিত হন, তখন তাঁরা ঐ দেশটির দর্শন, আদর্শ, সংবিধান, জাতীয় সঙ্গীত, জাতীয় পতাকা হৃদয়ে গ্রহণ ক’রে ঐ সমাজেরই অংশ হয়ে যান। ফলে সমাজের বিভাজিত হওয়ার সুযোগ থাকে না।  

বাংলাদেশের মতো জাতিগত বিভাজনবিহীন দেশ খুবই কম আছে পৃথিবীতে। ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীভূক্ত মানুষের সংখ্যা খুবই অল্প। যাঁরা আছেন, তাঁরাও জাতীয় মূল ধারাকে গ্রহণ করেছেন। অর্থাৎ রাষ্ট্রের দর্শন, আদর্শ, সংবিধান ইত্যাদি তাঁরা মেনে নিয়েছেন। বরং মেনে নেন নি বাঙালিদেরই একটি বড় অংশ। এই অর্থেই বাংলাদেশের সমাজ একটি বহুবিভাজিত সমাজ। ধর্মীয় বা জাতিগত বিভাজনের চেয়েও ভয়ংকর ক্ষতিকর রাষ্ট্র সম্পর্কিত দর্শন ও ইতিহাস বিষয়ে মতনৈক্য। বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সৃষ্টির বিরুদ্ধে যাঁরা ছিলেন, তাঁরা স্বাধীন বাংলাদেশের দর্শন, আদর্শ, সংবিধান মানেন না। যাঁরা পক্ষে ছিলেন, তাঁরাও বহুধাবিভক্ত, যেমন জাতির পিতা, রাষ্ট্রধর্ম, স্বাধীনতা সংগ্রামে ও মুক্তিযুদ্ধে কার কী অবদান ইত্যাদি বিষয় এই মতনৈক্যের জায়গা। সংবিধান সংস্কার প্রস্তাবে রাষ্ট্রের মূলনীতি, বাংলাদেশের রাজনৈতিক নাম পরিবর্তন, জাতির পিতার বিধান বাতিল, রাষ্ট্রধর্ম বহাল রাখা ইত্যাদি সমাজে আরও বিভাজন তৈরি করবে বলে মনে হচ্ছে। আওয়ামী লীগের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বি.এন.পির প্রতিষ্ঠাতা প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রধর্ম করার বা জাতির পিতার নাম বাদ দেওয়ার চিন্তা করেন নি। দেখা যাচ্ছে,  বি.এন.পি ও বামদলগুলো সংস্কার প্রস্তাবের মূল বিষয়গুলোর সাথে দ্বিমত পোষণ করছে। তার মানে, সমাজে বিভাজন বাড়ছে।

বাংলাদেশে ঐক্যমত্য হয় না কারণ মানুষের মুক্তি আমাদের লক্ষ্য নয়। প্রত্যেকেই প্রত্যেকের নিজস্ব বিশ্বাস বা পূর্বধারণা কার্যকর দেখতে চায়। আমাদের কাছে সত্যের ওপরে বিশ্বাসের স্থান। ভারতের হিন্দু জাতীয়তাবাদীরা গান্ধীকে হত্যা করেছে, কিন্তু বি.জে.পির মতো হিন্দু জাতীয়তাবাদী দলও গান্ধীকে জাতির পিতা মানে। কংগ্রেসের পররাষ্ট্রনীতিও বিজেপি অনুসরণ করেছে। এ রকম উদাহরণ অজস্র, কিন্তু জাতি হিসেবে আমরা দূর্ভাগা। আমাদের কোন কিছুতেই ঐক্য নেই।  

দেশে উন্নয়ন ঘটলেও ধ্বংস হয়ে গেছে সব অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রতিষ্ঠান। আর আমদের বিভাজিত সমাজ। তবে কি ব্যর্থতায় পর্যবসিত হবে আমাদের সব আয়োজন?